ডেস্ক রিপোর্ট
১৪ আগস্ট ২০২১, ৪:৪৩ অপরাহ্ণ
রাজেকুজ্জামান রতন::
রূপগঞ্জে হাসেম ফুডসের সেজান জুসের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা এবং সাদা কাপড়ে মোড়ানো ৪৯টি কয়লা হয়ে যাওয়া মানুষের দেহ আর ৩টি থেঁতলে যাওয়া মানুষের শরীর ঘিরে কান্নার দৃশ্য ভুলে যাওয়ার কথা নয়। কফিনে থাকা হাড়গোড়ের অঙ্গার দেখে বোঝা যাবে না এরা যখন জীবিত ছিল তখন কারও বয়স ছিল ১৪, কারও ১৬ কিংবা কারও ২৬। ডিএনএ পরীক্ষা থেকে শনাক্ত হয়েছে তাদের মা-বাবা কিংবা স্বজনের পরিচয় আর তাদের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে তাদের নাম এবং বয়স। অভাবের তাড়নায় কাজ করতে এসে জীবনের শুরুতেই জীবন হারাল শিশু, কিশোরসহ কারখানা শ্রমিকরা। কিন্তু যাদের কারণে এই নির্মম হত্যাকান্ড ঘটল তারা এখন জামিন পেয়ে মুক্ত পরিবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্যদিকে নিহতদের স্বজনদের হাতে পুরনো ছবি, চোখে কান্না আর তারা বসে থাকছেন নতুন কবরের পাশে।
করোনায় মৃত্যুর সংখ্যায় বাংলাদেশ এখন পৃথিবীতে নবম স্থানে। গত ৭ জুলাই থেকে কয়েক দিন বাদ দিলে প্রতিদিন মৃত্যু ২০০-এর নিচে নামছে না। দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা সরকারের ঘোষণার চেয়ে বেশি এটা প্রায় সবাই মনে করেন। হাসপাতালে ঠাঁই নেই, অক্সিজেনের জন্য হাহাকার, বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানে টাকার শ্রাদ্ধ তা জেনেও উপায়হীন মানুষ যাচ্ছে সেখানে। ‘করোনা দারিদ্র্যের’ শিকার হয়ে নতুন এক জনগোষ্ঠীর বিস্তার ঘটছে দ্রুত গতিতে। বেকারত্ব বেড়েছে, যাদের কাজ আছে তাদের আয় কমেছে, পুষ্টি গ্রহণের পরিমাণ ও মান কমে যাচ্ছে। সবচেয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন।
দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ আসে গার্মেন্টস খাত থেকে। উৎপাদন, রপ্তানি এবং মুনাফা অব্যাহত রাখতে জীবনের ঝুঁকি, যাতায়াতের কষ্ট ও অতিরিক্ত খরচ করে কঠোর লকডাউনের মধ্যেও কর্মস্থলে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল শ্রমিকদের। ৩৫ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক গড়ে ২ হাজার টাকা খরচ করে থাকলে তাদের পকেট থেকে বেরিয়ে গেল ৭০০ কোটি টাকা। চাকরি রক্ষার জন্য তাদের এই ধারদেনা করে আসা, সরকারের কঠোর লকডাউনের সিদ্ধান্ত আর মালিকদের কাজে যোগদানের কড়া নির্দেশের ফলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের এই অবর্ণনীয় দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে।
মোটা চাল, ডাল, তেলসহ শ্রমজীবীদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম বাড়ছে। বোরো ধানের বাম্পার ফলন, এর আগে আমন ধানের ফলন হয়েছে এবং বর্তমানে আউশ ধান কাটা শুরু হবে। কিন্তু চালের দাম বেড়েই চলেছে। সরকার ভারত থেকে ৫ লাখ টন চাল আমদানি করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে আর বেসরকারিভাবে ১০ লাখ টন চাল আমদানি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একদিকে বাম্পার ফলনের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে চালের দামে শ্রমজীবীদের নাভিশ্বাস। উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ নিয়ে এই চালবাজি চলছেই, করোনাতেও তা থামেনি।
প্রকল্পের দেশে পরিণত হয়েছে এখন বাংলাদেশ। ছোট প্রকল্প, বড় প্রকল্প, মেগা প্রকল্প বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু আতঙ্কের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, সময় বৃদ্ধি দুটোই যেন পাল্লা দিয়ে চলছে। সময় বৃদ্ধির কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে জনগণকে আর ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ট্যাক্সের টাকা দিতে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও বহুভাবে তা দিতে হবে। দুর্নীতির জন্য জনগণ দায়ী না হলেও খেসারত জনগণকেই দিতে হচ্ছে। রেল, সড়ক, সেতু নির্মাণ, মেরামত ও চালু রাখার জন্য ব্যয় বৃদ্ধি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
রেলওয়েতে এখন ৪১টি প্রকল্প চলমান যেখানে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯১ হাজার কোটি টাকার সংস্থান হবে বিদেশি ঋণ থেকে। কিন্তু এই প্রকল্পগুলো শেষ হচ্ছে না। চলছে মোটামুটি একই চক্রে। এর একটা নিয়ম আছে তা হলো প্রথমে প্রকল্প গ্রহণ, তারপর মাঝপথে গিয়ে প্রকল্প সংশোধন, নির্দিষ্ট সময়ে শেষ না করে বাস্তবায়নের সময় বৃদ্ধি, সময় বেড়ে গিয়েছে বলে ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেষে রেলের মহাপরিকল্পনা এলোমেলো করে ফেলা। এই প্রকল্পচক্রের ফলে লাভবান হচ্ছে দেশি-বিদেশি ঠিকাদার, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট রেলের কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী তদবিরকারী চক্র। ক্ষতিগ্রস্ত কি কেউ হচ্ছে না? শেষ পর্যন্ত ক্ষতির দায় বহন করে জনগণ।
রেলওয়েতে ইঞ্জিন সংকট প্রকট, তা নিরসনের উদ্দেশ্যে এক দশক আগে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল তবে বাস্তবায়ন বা শেষ হয়নি। যেমন, ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনার প্রকল্প। ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে এই প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল ২০১১ সালের জুলাই মাসে। এখন পর্যন্ত বেতন-ভাতা, টেবিল-চেয়ার, গাড়ির জ্বালানি খরচ আর স্টেশনারি কেনার কাজে ৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু কোনো ইঞ্জিন আসেনি। ইঞ্জিন না চললেও ফাইল চলেছে এবং ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা।
চট্টগ্রামের দোহাজারি থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং কক্সবাজার থেকে মিয়ানমারের ঘুমধুম পর্যন্ত মিটারগেজ রেললাইন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছিল ২০১০ সালে। কথা ছিল কাজ শেষ হবে ২০১৩ সালে। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালের এপ্রিলে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তারপর আবার পরিকল্পনা সংশোধন। মিটারগেজ রেলপথ নয় মিশ্র গেজ রেলপথ করতে হবে। এসব করতে করতে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয় সাত বছর পর। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা।
জাপানি সংস্থা জাইকার ঋণে যমুনা নদীর ওপর ৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলসেতু নির্মাণের জন্য ২০১৬ সালে প্রকল্প নেওয়া হয়। ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। যমুনা সেতুর পাশে এই সেতু হবে ফলে নদী শাসন করা আছে। জমি অধিগ্রহণও কম হবে। কিন্তু তাই বলে ব্যয় তো থেমে থাকতে পারে না। কাজ শুরুর আগেই ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা।
দেশের সবচেয়ে বড় সড়ক নেটওয়ার্ক স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)। উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়ক এ তিন ক্যাটাগরিতে সংস্থাটির পাকা সড়কের পরিমাণ ১ লাখ ১৭ হাজার কিলোমিটার। এ সড়কের ৫৩ শতাংশই খারাপ বলে চিহ্নিত করেছে এলজিইডি। বিশেষজ্ঞরা এলজিইডির সড়কের বেহাল দশার কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে বন্যা, নিম্নমানের কাজ ও নির্মাণ উপকরণ, অনিয়ম-দুর্নীতি, অদক্ষ ঠিকাদার, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নকশার ত্রুটি ও অপ্রতুল বরাদ্দ।
২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী বিআরটিসির বিভিন্ন ধরনের বাসের সংখ্যা ১ হাজার ৪৫৪টি। এর মধ্যে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ৫২৪টি। নতুন এক হাজার বাস সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। কিন্তু বিআরটিসির বাস এত দ্রুত নষ্ট হয় কেন? এত গাড়ি থাকার পরও বিআরটিসির কেন লোকসান হয়, এর কারণ জানা গেলেও তা দূর করা হচ্ছে না। কারণ কি তাহলে এই যে, লোকসান কারও কারও জন্য লাভজনক। সাবেক অর্থমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী মেগা প্রকল্প মানে মেগা দুর্নীতি কিন্তু সাধারণ প্রকল্পও কি এর বাইরে? নির্ধারিত প্রাক্কলিত ব্যয় ও সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার কোনো দৃষ্টান্ত কি দেশে আছে? অতীতে বঙ্গবন্ধু সেতু, চট্টগ্রাম সার কারখানা, তিস্তা ব্যারাজ ইত্যাদি কোনো প্রকল্পই নির্ধারিত ব্যয় ও সময়ে শেষ করা যায়নি। বঙ্গবন্ধু সেতুটি ৪২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় নির্ধারণ করে শেষ করা হয় ৯৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। জিয়া সার কারখানা ৬৯ কোটি টাকার প্রকল্প ছিল, শেষ করা হয় ১০৫০ কোটি টাকায়। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি ৬৫০ কোটি টাকায় শেষ করার কথা থাকলেও ১৬৫০ কোটি টাকায় শেষ করা হয়। স্ব-অর্থায়নে বলে গর্ব করা পদ্মা সেতু ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকায় শুরু হলেও ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকাতেও শেষ হবে কি না অনিশ্চিত। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্প ২ হাজার ১৬৮ কোটি টাকায় শেষ করার কথা থাকলেও এখন তার ব্যয় ৩ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। অতীত ও বর্তমানের এমন শত শত প্রকল্প আছে যেগুলোর ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি ঘটেছে। বড়দের কাছ থেকে ছোটরা শিক্ষা নিয়ে মেগা প্রকল্পের পথেই সব প্রকল্প হাঁটছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী বলে থাকলেও সাধারণ মানুষ এখন এটাই বিশ্বাস করে যে, প্রকল্প মানেই দুর্নীতি।
স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি তো করোনাকাল জুড়েই প্রধান আলোচনার বিষয়। টিআইবির প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কেনাকাটা, নিয়োগ, সেবাদানের ক্ষেত্রে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের এক বছর তিন মাস পার হলেও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে আইসিইউ, ভেন্টিলেটর ইত্যাদি চিকিৎসা সুবিধার সম্প্রসারণ করা হয়নি। বরং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে ফেলে রাখা হয়েছে। ৩০০ আইসিইউ শয্যা, ১৬৬টি ভেন্টিলেটর এবং ৩৩৫টি হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ব্যবহার হচ্ছে না। এর মধ্যেই গণটিকার নামে গণহয়রানি ঘটল দেশে।
এত সমস্যার দেশে সমস্যা থেকে দৃষ্টি ফেরানোর তৎপরতাও কম নয়। কিছুদিন পরপর চাঞ্চল্যকর ঘটনার উন্মোচন এবং সেটা সমাপ্ত না করে নতুন ঘটনার আবির্ভাব ঘটানো সরকারের পক্ষ থেকে ঘটেই চলেছে। এখন যেমন নায়িকা, মডেল, মাদক নিয়ে চলছে তোলপাড়। কেন, কারা, কীভাবে এসব এত দিন ধরে ঘটাতে পারছে সে প্রশ্নের উত্তর নেই। মানুষের সামনে যা আসে তা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সব সময় যা গুরুত্বপূর্ণ তা সামনে থাকে না, আসে না বা আনা হয় না। সামনে যা দেখে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়, ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়তো আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। ফলে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, আড়াল করার জন্যই কিছু দেখানো হচ্ছে না তো?
লেখক: সভাপতি, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট ও কলামনিস্ট