ডেস্ক রিপোর্ট
৯ অক্টোবর ২০২৩, ১১:২৭ অপরাহ্ণ
আবু নাসের অনীক: বাংলাদেশ সৃষ্টির পূর্বেই আর্থসামাজিক পেক্ষাপট ছিলো সামন্ততান্ত্রিক। কারো কারো মতে, বর্তমানে আধা-সামন্ততান্ত্রিক বা সামন্ত-অবশেষ; উৎপাদন সম্পর্কের জায়গা থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনও পুরোটাই সামন্ততান্ত্রিক রয়ে গেছে। যা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রতিনিয়ত ফুটে উঠে।
গত ৬ অক্টোবর গণভবনে অনুষ্ঠিত একটি সংবাদ সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘আমাকে বেশি কথা বললে সব বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকব। ইলেকশনের পরে, যদি আসতে পারি, আবার করব। তারপর দেখি কে সাহস পায় নিতে…ক্ষমতা।’ তাঁর এই বক্তব্যটি সামন্তীয় সংস্কৃতির প্রকৃষ্ট প্রতিচ্ছবি।
অর্থাত সেন্স এই দেশটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। উনি এখানকার রাজা এবং আমরা সবাই প্রজা! উনার দয়াতে আমরা এই দেশটাতে বাস করছি। বস্তুত আপনি সেটা মিন করলেও বিষয়টি কিন্তু এমন নয় আদৌও। যে অর্থের মাধ্যমে আপনি বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছেন এর মালিকানা কার? আপনার?
এইসব উন্নয়ন কাজের যে ফিরিস্তি আপনি এবং আপনার তোষামোদকারীরা দিয়ে থাকেন, এই অর্থের যোগান কে যোগায়? সবটাই এই দেশের নাগরিকের অর্থে বাস্তবায়ন হয়ে থাকে। বিভিন্ন সোর্স থেকে যে লোন গ্রহণ করেন সেটি পরিশোধের অর্থও দেশের নাগরিক যোগায়।
কী অদ্ভুত ব্যাপার দেশের নাগরিক এই সমস্ত বিষয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবেনা, কোন সমালোচনা করতে পারবেনা! সেটি করলেই আপনি এমন বক্তব্য প্রদান করবেন যে, এই দেশটির মালিকানা নিয়ে বসে আছেন।
সরকারকে নাগরিক নির্বাচিত করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে। মালিকানাটি কিন্তু নাগরিকের হাতেই থাকে! কিন্তু আপনাদের আচারণ হয়ে যায় নাগরিকদের আপনারা দয়া করছেন!!আসুন দেখি, সরকার ও জনগণের মধ্যে সম্পর্কের জায়গাটা কী?
স্মার্ট সিটি জার্নালে বলা হয়েছে,‘The proper relationship between government and the people is a complex and multifaceted issue that can vary depending on the political and cultural context. However, some key principles that are often considered to be important in the relationship between government and the people are:
1.Representation: The government should represent the interests and needs of the people it serves, and the people should have a meaningful say in who governs them and how they are governed.
2.Transparency: The government should be open and transparent in its actions and decisions, and the people should have access to information about how their government works.
3.Accountability: The government should be held accountable to the people for its actions and decisions, and the people should have the means to hold their government accountable.
4.Protection of rights: The government should protect and respect the rights of its citizens, including civil rights and civil liberties, such as freedom of speech, freedom of assembly, and freedom of religion.
5.Providing public goods and services: The government should provide public goods and services such as healthcare, education, infrastructure, and security, that are essential for the well-being of its citizens.
6.Promoting the common good: The government should work to promote the common good, which means that it should work to advance the well-being of all citizens, rather than just a select few.
7.Responsiveness to citizens’ needs: The government should be responsive to the needs of the citizens and should be open to feedback and suggestions from the public.
8.Fairness: The government should be fair in its policies and actions, and should not discriminate against any group of citizens.’
সরকারের কাছ থেকে যথাযথভাবে সেবা না পেলে নাগরিক প্রশ্ন করবে, সমালোচনা করবে, জবাবদিহিতা চাইবে; সেটি তার সাংবিধানিক অধিকার। আর নাগরিকের এই সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং সমালোচনা গ্রহণ করা আপনার সাংবিধানিক দায়িত্ব। সরকার যখন জনগণের ম্যানডেট গ্রহণ না করে সরকার পরিচালনা করে তখন তার মধ্যে ব্যাক্তিমালিকানা এই ভাব প্রকট হয়ে ওঠে।
গত ১ লা অক্টোবর ২০২৩,টিআইবি ‘পার্লামেন্টওয়াচ : একাদশ জাতীয় সংসদ—প্রথম থেকে ২২তম অধিবেশন (জানুয়ারি ২০১৯-এপ্রিল ২০২৩)’ শীর্ষক প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদে সরকার ও সরকারপ্রধানের প্রশংসায় ৬১ ঘণ্টা ২৬ মিনিট ব্যয় হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১০০ কোটি ৩৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭০৪ টাকা। আর সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত সময়ে না আসায় সংসদের ২২টি অধিবেশনে কোরাম সংকটের কারণে সংসদ কার্যক্রম শুরু হতে দেরি হওয়ায় সংসদের ব্যয় হয়েছে ৫৪ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট। এর অর্থমূল্য প্রায় ৮৯ কোটি ২৮ লাখ আট হাজার ৭৭৯ টাকা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই টাকার যোগান কে দেয়? দেশের নাগরিকরা দেয়। আপনার আর সরকারের তোষামোদী করার জন্য তো নাগরিকরা এই টাকার যোগান দিতে বাধ্য নয়। তারা সেসব নিয়ে প্রশ্ন করলেই আপনি বলবেন,‘সব বন্ধ করে দেব’। এটাই হলো সামন্ততান্ত্রিকতা! এই যে তোষামোদী করা এটাই সামন্ততান্ত্রিকতা!
কারগারে রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,“ খবরের কাগজে পড়বার মতো কিছু থাকে না। একঘেয়ে সংবাদ। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব কী বললেন, কী করলেন, কোথায় গেলেন, কার সাথে দেখা করলেন, দেশের উন্নতি, অগ্রগতি, গুদাম ভরা খাদ্য, অভাব নাই, বিরাট বিরাট প্রজেক্ট গ্রহন করা হয়েছে, কাজ শুরু হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কেহ কেহ মুরব্বিয়ানাচালে দেশপ্রেমিকের সার্টীফিকেটও দিয়ে থাকেন। দুনিয়ায় নাকি পাকিস্তানের সম্মান এতো বেড়ে গেছে যে আসমান প্রায় ধরে ফেলেছে। নানা বেহুদা প্রশংসা,তবুও তাই পড়তে হবে।”
তৎকালীন সময়ের এই সামন্ততান্ত্রীকতা থেকে কী আমরা বের হয়ে আসতে পেরেছি? আইয়ুব এর জায়গায় অন্য একটি নাম বসিয়ে নেন,স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৩ বছর পরের চিত্র বঙ্গবন্ধুর উপরিউক্ত বক্তব্যের একটি অংশেরও পরিবর্তন ঘটেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সম্পর্কিত বিষয়ে বলেন,“সে এভারকেয়ার, বাংলাদেশের সবথেকে দামি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। আর রোজই শুনি এই মরে মরে, এই যায় যায়। বয়সতো আশির ওপর। মৃত্যুর সময় তো হয়ে গেছে। তার মধ্যে অসুস্থ। এখানে এত কান্নাকাটি করে লাভ নাই।”
অনেকেই বলছেন, তাঁর এই ধরনের কথা বলা উচিত হয়নি! অনেকেই এটাকে রাজনীতির দৈন্যতা বা রুচিহীনতা মনে করছেন। আমি বলবো, এটা তাঁর সামন্তীয় আচারণের অংশ। এমনধরণের বক্তব্য এর আগেও তিনি বহুবার প্রদান করেছেন।
একইসাথে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের সকল লুটেরা ধনীক শ্রেণির রাজনৈতিক দল যেমন এই সামন্তীয় কালচারে অভ্যস্ত অন্যদিকে এখানকার অনেক বামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বও এই কালচারে অভ্যস্ত।
প্রশ্ন কেন এমন ঘটে? এমনটি ঘটার একটি অন্যতম কারণ জনগণের রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ না ঘটা। আর সেই শক্তির বিকাশের অনুপস্থিতিতে এখানে তীব্র গণসংগ্রাম গড়ে না ওঠা। ফলশ্রুতিতে শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দলসমূহ কোন ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় না।
স্বাধীনতার পর থেকে যারাই যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছেন তখনই তাঁরা নিজেরা রাজা আর নাগরিকগণকে তাদের প্রজা হিসাবে ট্রিট করেছেন। এই অচলায়তন ভাঙার একমাত্র উপায় জনগণের রাজনৈতিক সংগ্রাম সংগঠিত করা!