ডেস্ক রিপোর্ট
১৩ নভেম্বর ২০২১, ১১:১৪ অপরাহ্ণ
আবু নাসের অনীক::
১১ নভেম্বর ২০২১ দেশের আলোচিত রেইনট্রি হোটেলে দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলার রায় হয়েছে। বিচারক সকল আসামীকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। দেশের মানুষ মামামলাটিকে ‘আলোচিত’ উল্লেখ করলেও বিচারক বলেছেন,‘আপনারা বলছেন-এটি একটি আলোচিত মামলা, কিন্তু আমার কাছে তা মনে হচ্ছে না’।
তাঁর কাছে মনে হবে না সেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ ওনার সেই বোধ থাকলে মামলার রায় ভিন্ন হতে পারতো। এইতো গত কয়েকদিন আগেই পরিমণীর মামলায় অহেতুক রিমান্ড মঞ্জুর করায় দুই বিচারক উচ্চ আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। অভিযুক্তের প্রতি অবিচার করে ক্ষমা চাওয়া কিছু বিচারকের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতা কেন্দ্রীক প্রভাবিত হচ্ছে বিচারকরা ঘটনাগুলি সেটারই ইঙ্গিত করে।
মামলার পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন,‘এখন থেকে ধর্ষণের ৭২ ঘন্টার পর যদি কেউ মামলা করতে যায়, তা না নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি’। কী সাংঘাতিক, মারাত্বক ও অসাংবিধানিক একটি কথা অবলিলাক্রমে তিনি বলে দিলেন। একবারের জন্যও বিবেচনায় নিলেন না তার এই বক্তব্য কী ধরনের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে! এই কথার সারমর্ম দাঁড়ায়, ধর্ষক ধর্ষণ করে ভিকটিমকে ৭২ ঘন্টা আটকে রাখতে পারলেই আর বিচারের মুখোমুখী হওয়া লাগবে না। কারণ তিনি পুলিশকে ভিকটিমের অভিযোগ গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্যে মনে হবে ধর্ষণ মামলার একমাত্র এভিডেন্স মেডিক্যাল রিপোর্ট। অথচ অন্য অনেকগুলি এভিডেন্সের মধ্যে এটি একটি, একমাত্র নয়।
২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ খুলনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণের মামলায় আপিলের রায়ে বলেন,‘স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও সাক্ষ্য বিবেচনায় এখন থেকে ধর্ষণ মামলায় সাজা দেওয়া যাবে। এখানে ধর্ষণ প্রমাণে মেডিকেল রিপোর্ট মুখ্য নয়। পাশাপাশি কোন ভুক্তভোগী দেরিতে মামলা করলে সেটিকে মিথ্য বলা যাবে না। শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়ার কারণে ধর্ষণ প্রমাণ হয়নি বা আপিলকারী ধর্ষণ করেনি এই অজুহাতে আসামি খালাস পেতে পারে না’। সেক্ষেত্রে রেইন্ট্রি হোটেলের ধর্ষণ মামলার রায়ে বিচারক যে পর্যক্ষেণ দিয়েছেন সেটি হাইকোর্টের এই রায়ের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। যা উচ্চ আদালত অবমাননার সামিল।
আলোচিত মামলার রায়টি আসামি পক্ষ দ্বারা প্রভাবিত এটা ভাবার জন্য বিচারকের বিভিন্ন অসঙ্গতিপূর্ণ ও অবিচারিকসূলভ পর্যবেক্ষণই যথেষ্ঠ। কতোটা ডেসপারেট হলে লোয়ার কোর্ট থেকে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক দেওয়া রায়ের বিপরিতে অবজারভেশন দেওয়া সম্ভব!! এই মামলাটি যখন হয় তখনই জনমনে ধারনা হয়েছিলো, আসামী তার প্রভাব খাটিয়ে মামলা থেকে মুক্ত হবে। সেটিই ঘটেছে।
মানীয় বিচারক বলেছেন,‘মামলার দুই ভিকটিম বিশ্বাসযোগ্য নয়। ভিকটিম দুজনই আগে থেকেই সেক্সুয়াল কাজে অভ্যস্ত’। বিস্ময়রেও সীমা ছাড়িয়ে যায় এধরনের বক্তব্য শোনার পর, সেটা যদি আবার হয় ধর্ষণ মামলায় বিচারকাজ পরিচালনায় নিযুক্ত বিচারকের!! তাঁর এই বক্তব্যের সারমর্ম দাঁড়ায় এখন থেকে যৌনকর্মী, বিবাহিত নারী এরা কেউই ধর্ষণের স্বাীকার হলে বিচার চাইতে পারবেনা। তাদের অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য হবে না কারণ তারা যৌন কাজে অভ্যস্ত!! এই ধরনের বক্তব্য যে বিচারক দিতে পারে তার মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে!
প্রকৃত অর্থে আমরা একটি লুটেরা সমাজে বসবাস করছি। সমাজের অধিকাংশ জায়গা পঁচে-গলে নষ্ট হয়ে গেছে। নিম্ন আদালতও তার বাইরে নয়। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ যে এখনো পৃথক হতে পারেনি এ সমস্ত রায় আর পর্যবেক্ষণ দেখলেই সেটা বোঝা যায়।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ভিকটিম অধিকাংশ সময়েই ঘটনা প্রকাশ করে না। কারণ সবসময় দেখা যায় ধর্ষক ভিকটিমের চাইতে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে অধিক শক্তিশালী। ভিকটিমের লোক-লজ্জার ভয়, পরিবার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসহযোগীতা, ধর্ষণ আইনের দূর্বলতা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এ ধরনের আরো নানা কারণে ঘটনাগুলি প্রকাশ হয়না। এই সকল বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য এবং সাহস সঞ্চয় করে আলেচিত মামলার ভিকটিমদ্বয় সুবিচারের প্রত্যাশায় মামলা করেন। সেই মামলার পরিণতি কী হলো আমরা দেখতে পেলাম। আমাদের কাছে আবারো সেই বাস্তবতায় ফুটে উঠলো কেনো ধর্ষণের মামলায় মাত্র ৩% অভিযুক্ত সাজা প্রাপ্ত হয়, মোট ঘটনার মধ্যে মাত্র ৫% মামলা হিসাবে নথিভূক্ত হয়!!
যখন কেউ মন্তব্য করে-লেখে সেটি তার চিন্তার প্রকাশ। মামলার পর্যবেক্ষণে যেসমস্ত কথা বলা হয়েছে সেটি প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তার বর্হিপ্রকাশ সে বিষয়ে সন্দেহ থাকার কোন অবকাশ নেই। ধর্ষণ আইনকে ভূক্তভোগীবান্ধব করা এখন সময়ের দাবী সেখানে তিনি তাঁর পর্যক্ষেণে বিষয়টিকে আরো বেশি মাত্রায় ধর্ষকবান্ধব করার নির্দেশনা দিয়েছেন। এধরনের ব্যক্তিরা যখন বিচারকার্য পরিচালনা করেন তখন সাধারণ মানুষের সমগ্র বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়। যা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে।
সর্বোপরি বিষয়টি রাজনৈতিক। হ্যাঁ, অতি অবশ্যই রাজনৈতিক। কারণ বিচার ব্যবস্থা কিভাবে পরিচালিত হবে সেটি নির্ভর করে রাজনৈতিক চিন্তার উপর। স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন করতে পারবে না পারবেনা সেটাও নির্ভর করে রাজনীতির গতিপথের উপর ভিত্তি করে। কী ধরনের মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি বিচারক হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হবেন সেটা নির্ধারণেও রাজনৈতিক মতাদর্শ ভুমিকা রাখে।
যে সমাজ-রাষ্ট্র ব্যবস্থা শ্রেণি চরিত্রের দিক থেকে লুটেরা তার বিচার ব্যবস্থা একরকম, আবার যেখানে গণতান্ত্রিক তার বিচার ব্যবস্থা হবে অন্যরকম। রেইন্ট্রি হোটেলের ধর্ষণ মামলার রায়ে যে বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে সেটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে শতভাগ সাংঘর্ষিক। কিন্তু ব্যবস্থার সংকটকে আড়াল করে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি বিচারকের আমরা সমালোচনা করছি। এমন একজন বিচারক অপসারণ হলেও বর্তমান ব্যবস্থা এধরনের হাজার হাজার বিচারক তৈরি করবে যারা রায়ে এমন অন্যায্য পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করবে, অপ্রয়োজনে রিমান্ড দিবে এবং সময়ে সময়ে ক্ষমাও চেয়ে নিবে।
ধর্ষণের সঙ্গে যৌন লালসার সম্পর্ক নেই, যা আছে সেটি হলো নিয়ন্ত্রণ করা এবং দাবিয়ে রাখা। সমাজ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন এর প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। সমাজের সুস্থতা-অসুস্থতা নির্ভর করে রাজনীতির উপর! আমাদেরকে সেই পথে হাঁটতে হবে যে পথে হাটলে বিচারহীনতাকে রুখে দেওয়া যায়। সেই পথ হতে পারে, যে ব্যবস্থা বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থার আওতায় ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখছে তাকে উচ্ছেদ করে।
লেখক: উন্নয়ন কর্মী