ডেস্ক রিপোর্ট

১৯ জুলাই ২০২৫, ৫:২৬ অপরাহ্ণ

জুলাই কি হারিয়ে যাবে?

আপডেট টাইম : জুলাই ১৯, ২০২৫ ৫:২৬ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

রাজেকুজ্জামান রতন::

জুলাই ২০২৪। জুলাই ছিল সাহসের, জুলাই ছিল প্রতিরোধের। বাংলাদেশের লড়াকু জনগণ যেকোনো অন্যায়, জবরদস্তি, দুঃশাসন মেনে নেয় না, কোনো স্বৈরাচারকেই ক্ষমতায় থাকতে দেয় না, বুকের রক্তে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, জীবন দিয়ে জীবনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে তা আবার প্রমাণ করেছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে। দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচার ও স্বেচ্ছাচার বিরোধী সংগ্রাম যেন কেন্দ্রীভূত হয়েছিল জুলাই মাসে। পুলিশ, আর্মি, গোয়েন্দা সংস্থা আর দলীয় অস্ত্রধারীদের দিয়ে দমন করা যায়নি প্রতিবাদী ছাত্র-জনতাকে। পুলিশ বলেছে একটা গুলি করি একটাই মরে, কিন্তু কেউ সরে না। এত সাহস দেশের মানুষ দেখে নাই বহুদিন। কাফফিউ দিয়ে, হেলিকপ্টার উড়িয়ে, জীবন দিয়েছে হাজারের বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে ছিল ছাত্র, শ্রমিক, নারী, শিশু, পথচারী আর আহত হয়েছে ২০ হাজারের বেশি। যাদের অনেকেই কোনো দিন চোখে দেখবে না, নিজের পায়ে হাঁটবে না, কারও ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গিয়েছে পেটের ভেতরের অংশ, স্বাভাবিকভাবে মলমূত্র ত্যাগ করতে পারবে না অনেকেই। মৃতরা হারিয়ে গেছে জীবন থেকে আর আহতদের হারিয়ে গেছে জীবনের ছন্দ।

কিন্তু মৃত্যু যে জীবনের শেষ নয়, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে এ দেশে। সব গণআন্দোলন রক্তের বিনিময়ে বিজয় অর্জন করে। জনগণ দাবি নিয়ে আন্দোলন করে আবার আন্দোলনের পথে সেই দাবিগুলো নতুন নতুন মাত্রা পায়। উত্থাপিত নতুন দাবি পুরনো দাবিকে আরও শানিত করে, আন্দোলনে জনসম্পৃক্তি ঘটায়। সব আন্দোলনেই কোনো কোনো মৃত্যু আন্দোলনকে গতি দেয়। যেমন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে আসাদ এবং মতিয়ুর প্রেরণা ও সাহসের নাম। ’৯০-এর অভ্যুত্থানে নুর হোসেন, জিহাদ এবং ডা. মিলন স্বৈরাচারের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছে। গত ১৫ বছর আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে একের পর এক আন্দোলনে অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছে। কোটা সংস্কার থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নানা পর্যায়ে আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু ১৬ জুলাই সাঈদের জীবনদান অসংখ্য জীবনকে জাগিয়ে তুলেছিল, ভয়ের শাসনকে উচ্ছেদের শক্তি দিয়েছিল বরং শাসকদের মনেই ভয়ের কাঁপন জাগিয়ে তুলেছিল। এই ভূখণ্ডের প্রতিটি লড়াই ছিল মানুষের অধিকার ও মর্যাদার জন্য। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল স্বাধীনতার জন্য, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচারের জন্য। কিন্তু ব্রিটিশ গেছে স্বাধীনতা আসে নাই, জনগণকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করা হয়েছে, ভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, শিক্ষার অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। বাইরের এই আক্রমণের অন্তরালে শক্তিশালী হয়েছে শোষণ। ফলে শোষণ মুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতার আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। পাকিস্তান ছিল ২২ পরিবারের শোষণ, সামরিক শাসন, ধর্মীয় নিপীড়ন আর সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা রাষ্ট্র। এই শোষণের তীব্র রূপ প্রত্যক্ষ করেছে বাংলার মানুষ। ফলে ৬ দফা এবং ১১ দফা জনগণের আন্দোলনের দাবিনামায় রূপান্তরিত হয়েছিল। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০ সালের নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর ৫৩ বছরে দেশের জিডিপি বেড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, বাজেট ৭৮৬ কোটি টাকা থেকে ৭ লাখ ৯০ টাকায় উন্নীত হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১১০ ডলার থেকে ২৮৪০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে ২ জন থেকে দেড় লাখ হয়েছে। কিন্তু কমেছে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, মানুষের মর্যাদা। শিক্ষার খরচ, চিকিৎসার খরচ, দ্রব্যমূল্য সবই বাড়ছে, সবচেয়ে বেড়েছে বৈষম্য। এই বৈষম্য যেমন আয় বৈষম্য, তেমনি অধিকারের বৈষম্য, সুযোগের বৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য, জাতিগত বৈষম্য সব ক্ষেত্রেই। পুঁজিবাদী সমাজে সবই পণ্য। এখানে টাকা যার শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনের সব অধিকার তার। স্বাধীনতার পর থেকেই ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, টাকা পাচার তো ছিলই গত ১৫ বছরে তা সীমাহীন রূপ নিয়েছিল। নারীর নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের জীবন ও জমি সবই বিপন্ন, বেকারত্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, পুলিশের গ্রেপ্তার বাণিজ্য, বিচারবহির্ভূত হত্যা-গুম-খুন মিলে দেশে এক দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০১৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে একদলীয় নির্বাচন, ২০১৮ সালে রাতের ভোটের নির্বাচন, ২০২৪ সালে আমি ডামির নির্বাচন নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। নির্বাচনে পুলিশ, প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনকে ন্যক্কারজনকভাবে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন অপকৌশলের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিয়েছিল। ফলে এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করলে কোনো দিনই হারবে না, ক্ষমতা ছাড়বে না। শুধু ক্ষমতা কুক্ষিগত করাই নয়, ক্ষমতার দাপটে বিরোধী দল ও মতের ওপর চূড়ান্ত নিপীড়ন চালিয়েছিল। দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া, বিদেশিদের সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করা আর নতজানু পররাষ্ট্র নীতি দেশের সম্পদ ও সম্মান দুটোই ধ্বংস করছিল। এসবের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে লাখ লাখ ছাত্র, শ্রমিক, নারীকে রাজপথে নামিয়ে এনেছিল। ছাত্র শ্রমিক জনতার এই বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ ও দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার। সফল হয়েছিল অভ্যুত্থান। অভ্যুত্থান বাইরে থেকে দেখলে আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনা। কিন্তু যেকোনো বড় আন্দোলন অনেক আন্দোলনের যোগফল। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল। স্বাধীনতার পর পুঁজিপতিদের স্বার্থে দেশ পরিচালনার কারণে মুক্তিযুদ্ধের অপূর্ণ আকাক্সক্ষা মানুষকে বারবার আন্দোলনে পথে নামিয়েছে। একদলীয় শাসন, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই মূলত মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। এদেশের মানুষ অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে নাই বলে ’৯০ ও ’২৪ সালে অভ্যুত্থান করেছে।

কিন্তু দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হলো এই যে, জনগণ জীবন ও রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচারকে পরাজিত করে আর পরবর্তী সময় শাসকরা তাদের পথই অনুসরণ করে। এক দখলবাজের পরিবর্তে আরেক দখলবাজ, এক দুর্নীতিবাজের পরিবর্তে আরেকজন ক্ষমতায় আসিন হয়। তাই অভ্যুত্থানের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা বারবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়, কিন্তু ফ্যাসিবাদী পদ্ধতি থেকেই যায়। অতীতের এই বেদনাময় অভিজ্ঞতা থেকেই প্রত্যাশা ছিল অভ্যুত্থানের পর পুরনো পথে যেন ফিরে না যায় দেশ। সংস্কার কথাটা যত উচ্চারিত হচ্ছে ততটা সংস্কার কি রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে? গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত সবার মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ইনক্লুসিভ শব্দটার যত ব্যবহার হয়েছে যে মানুষ তার ততটা প্রতিফলন দেখতে না পেয়ে হতাশ। ১৬ জুলাই সাঈদের মা বলেছেন, ‘দেশে শান্তি আসেনি। সব আগের মতোই রয়েছে। কারণে-অকারণে মানুষকে জীবন দিতে হচ্ছে। আমার মতো এখনো অনেক মায়ের বুক খালি হচ্ছে।’ রংপুরের পীরগঞ্জের বাবনপুর গ্রামের বাড়িতে বসে এই কথাগুলো বলেছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম। এ শুধু কথা নয়, এ যেন বেদনামাখা আক্ষেপ মনোয়ারা বেগমের কণ্ঠে। তিনি বলেছেন, ‘আবু সাঈদের জীবন দিয়ে কি হলো? ছ্যালেটা হামার থাকাই ভালো আছিল। দেশ তো গঠন হলো না। আগে যে রকম ছিল, ঠিক সে রকমই আছে।’ কখনো একজনের কথা অসংখ্য মানুষের মনের কথা হিসেবে প্রকাশিত হয়। সাঈদের মা কি তেমনি আজ সন্তানহারা সব মায়ের আকুতি প্রকাশ করেছেন।

কেন এমন হলো, এই প্রশ্ন সবার। অভ্যুত্থানের এক বছর যেতে না যেতেই আকাক্সক্ষা ও চেতনাকে পদদলিত করা শুরু হয়েছে। সারা দেশে জোরপূর্বক চাঁদাবাজি, মব সৃষ্টি করে হামলা ও হত্যা, নারীর সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ, ধর্ষণ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা দখল, দুর্নীতির নানা খবরে দেশের মানুষ বেদনাহত ও ক্ষুব্ধ। অন্তর্বর্তী সরকারের নানা পদক্ষেপ জনগণের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ^াসের জন্ম দিচ্ছে। স্বৈরাচার অবসানে এমনটা হবে মানুষ সেটা চায়নি। একটা ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের পর গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ঘটবে, এটাই তো স্বাভাবিক। অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা এবং দায়হীন ক্ষমতা গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। কারণ ক্ষমতা এবং দুর্নীতি এমনভাবে জড়িত হয়ে থাকে যে, জবাবদিহিতা ছাড়া দুর্নীতি রোধের আর কোনো পথ নেই। কালো টাকার সমান্তরাল অর্থনীতির যে কথা বলা হয় তার দৃশ্যমান রূপ দেখছে বাংলাদেশের মানুষ। নির্বাচনকে দেখেছে কালো টাকা, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং পুলিশ ও প্রশাসনকে দলীয় কাজে ব্যবহার করার ঘৃণ্য উদাহরণ। এর অবসান ও বিকল্প দৃষ্টান্ত দেখতে চায় জনগণ। কিন্তু যেভাবে টাকা ও পেশিশক্তির সন্নিবেশ ঘটানো আর প্রয়োগ শুরু হয়েছে তা উদ্বেগজনক। শ্রমিক কৃষকের বুকের কান্না যেন ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতা প্রত্যাশীদের স্পর্শ করছে না। যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে তা তো অতীতের ধারাবাহিকতা মাত্র। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, ব্যাংক কি গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থায় পরিবর্তিত হয়েছে? যেভাবে চলছে, তাতে পুরনো আমলের চেয়ে কি পার্থক্য ঘটল? এই প্রশ্ন কি অমূলক হবে? আজকের যুগে ক্ষমতায় থাকলে স্বেচ্ছাচারী আর ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণতন্ত্রের কথা বলা এই নীতির কি পরিবর্তন হবে না? বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্রদের লড়াই শত-সহস্র মানুষকে পথে নামিয়েছিল। মানুষ ভুলতে চেয়েছিল নারী-পুরুষ, ধর্মীয় পার্থক্য, আদিবাসীর অবহেলা। প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল মানবিক মর্যাদা, দূর করতে চেয়েছিল বৈষম্যের বেদনা। কিন্তু সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন ও উন্মাদনা, নারীর লাঞ্ছনা, আদিবাসীর ভীতি, নির্বাচনবিহীন ও দায়হীন রাষ্ট্র পরিচালনা কি জুলাইকে ভুলিয়ে দিচ্ছে না? জুলাই কি শুধু দিবস উদযাপনে পর্যবসিত হবে? জুলাই কি তার স্বপ্ন হারিয়ে ফেলবে? এত রক্ত, অশ্রু, কান্না পুঁজিবাদী শোষণ আর সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠন চক্রান্তে যেন হারিয়ে না যায় সেটাই জনগণের অন্তরের চাওয়া।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন