ডেস্ক রিপোর্ট

৯ অক্টোবর ২০২১, ৩:০০ অপরাহ্ণ

নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচন বিতর্ক

আপডেট টাইম : অক্টোবর ৯, ২০২১ ৩:০০ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

রাজেকুজ্জামান রতন::

নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করবে। তবে যখন বলা হয় নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, তখন সবচেয়ে নিরাপদ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা যেতে পারে মুচকি হেসে। যে নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন, দেশের সেই অতি সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা সুখকর তো নয়ই বরং বিব্রতকর। ২০১৪ সালে নির্বাচনের পর বলা হয়েছিল এটি অনেকটা নিয়মরক্ষার নির্বাচন। কিন্তু তাতে নিয়মরক্ষা হয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল আমাদের ওপর ভরসা রাখুন একটি ভালো নির্বাচন হবে। কিন্তু ভরসারা খুন হয়ে গেছে। এবার বলা হচ্ছে নির্বাচনে কোনো রকম প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ হবে না। এ কথায় সরকারে থাকা দল ছাড়া বাকিরা কি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারবে? মনে হয় না।

নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আছে ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আর যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে তাহলে আগামী ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। অর্থাৎ নির্বাচনের আরও দুই বছর দুই মাস বাকি। কিন্তু নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য বা অংশগ্রহণমূলক হবে, নির্বাচনের পূর্বশর্ত যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তা কীভাবে সৃষ্টি হবে এসব আলোচনা সরিয়ে রেখে নির্বাচনী ঢোল বাজানো শুরু হয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠান করাটাকেই যারা গণতন্ত্র বলে মনে করেন এবং মানুষকে সেটাই বিশ্বাস করাতে চান তারা খুবই তৎপর যেভাবেই হোক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য। তাদের কারণে খারাপ নির্বাচনও আইনি বৈধতা পেয়ে যায়। তাদের যুক্তি হলো নির্বাচন না হওয়ার চেয়ে খারাপ নির্বাচন ভালো। তাই মানুষ ভোট দিল বা না দিল পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন করার নিয়মমাফিক কাজ করতেই তাদের সব মনোযোগ কেন্দ্রীভূত থাকে। নিয়মের সঙ্গে নৈতিকতা যে গুরুত্বপূর্ণ সেটাকে বিবেচনায় আনা হচ্ছে না। বিরোধী দল যদি নিয়ম মেনে অনৈতিক নির্বাচনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় তখন বিজয়ী পক্ষ বলতে থাকে আপনারা তো পারেননি কিছু করতে। অর্থাৎ নির্বাচনী জালিয়াতি বা ডাকাতি যাই বলেন না কেন ঠেকাতে তো পারেননি, কারণ জনগণ আপনাদের সঙ্গে নেই। সোজা ভাষায় বললে, ডাকাতি যেহেতু ঠেকাতে পারো নাই, তাই মেনে নাও ডাকাতের হাতে সর্বস্ব তুলে দিয়ে জীবনটা কোনো মতে বাঁচিয়ে রাখো। এভাবে জীবন বাঁচলেও তা যে মরার মতো বেঁচে থাকা সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না।

মতপ্রকাশ, মতপ্রচার ও মতের আদান-প্রদানের মাধ্যমে মতামত যাচাই করা যে গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত তার চর্চা মানুষ যেন ভুলে যেতে বসেছে। মতপ্রকাশ এবং প্রচারের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং মত যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু নির্বাচন। দুটোর কোনোটাই আছে বলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বাইরে আর কোনো রাজনৈতিক দল মনে করে না। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের জোট ১৪-দলীয় জোটের শরিকরাও নানান সময়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে এমন কথা প্রকারান্তরে বলছেন। এমন কথা তো এখন প্রচলিত যে, আগের মতো আর কিছুই নেই। এমনকি নির্বাচনও আগের মতো হয় না। আগে মানুষ ভোট দিত দিনের আলোয়, গণনা হতো সন্ধ্যায় এবং তারপর থেকে কেন্দ্রে ও কেন্দ্রীয়ভাবে ফলাফল ঘোষণা হতো। এখন পরিকল্পনা হয় দিনে, ভোট হয় রাতে, গণনার তেমন গুরুত্ব নেই, ফল ঘোষণা হলেই সব ঠিক হয়ে যায়। এর ফলে নির্বাচন নামক কর্মযজ্ঞ হারিয়ে ফেলেছে তার গ্রহণযোগ্যতা আর বিজয়ী বলে যাদের ঘোষণা করা হয় তাদেরও থাকে না জনগণের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা।

উন্নয়নের চমকে মোহাবিষ্ট এবং নির্বাচনী গমকে আকৃষ্ট করে মানুষকে ব্যস্ত রাখার কৌশল বাংলাদেশে বেশ কার্যকর বলে বিদেশি বা দেশি, সামরিক শাসক বা নির্বাচিত শাসক সবাই তাদের শাসনামলে কত দালান-কোঠা, রাস্তাঘাট বানিয়েছেন তার দীর্ঘ ফিরিস্তি দিতে পছন্দ করেন। ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতি করা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার বিষয়ে যত অভিযোগ থাকুক না কেন, তা নিয়ে কোনো লজ্জা বা ক্ষমা প্রার্থনার কোনো নজির নেই। বরং কে কার চেয়ে বেশি দুর্নীতিবাজ ও অত্যাচারী তা প্রমাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকছে সারাক্ষণ।

কাজ করতে করতেই মানুষ দক্ষ হয়, এ কথা সব শিক্ষক বলেন। এ ব্যাপারে পড়ার টেবিলের শিক্ষক বা মাঠের খেলার প্রশিক্ষক সবাই একমত এবং শিক্ষার্থীদের তারা নিয়মিত চর্চা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে এই চর্চার ফলাফল যে নিম্নগামী তা গত ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেখলে আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হবে না। স্বাধীনতার পর অনেক অর্জনের দৃষ্টান্ত জনগণ দেখেছে। কিন্তু অর্জনগুলোর পেছনে কাদের অবদান এবং কারা সুফলভোগী তা দেখলে যুগপৎ বিক্ষোভ এবং হতাশা সৃষ্টি না হয়ে পারে না। স্বাধীনতার পর ৫০ বছর পার হয়েছে, ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে কিন্তু দেশে এখনো সংবিধানের বিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন করা হয় নাই। সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে আছে, বাংলাদেশে একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন। ৫০ বছর পার হলো, নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন হলো না! সার্চ কমিটির মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়ার যে পদ্ধতি চালু হয়েছে তার ফলাফল সুখকর নয়, এমনকি মর্যাদাপূর্ণও নয়।

নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ এ কথা কেউ অস্বীকার করেন না। কিন্তু অন্য অঙ্গগুলোকে দুর্বল করে বা অস্বীকার করে শুধু নির্বাচনে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আবার এটা সবাই স্বীকার করবেন যে নির্বাচনে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের সবচেয়ে নিচের ধাপ এবং সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, জমজমাট নির্বাচন হয়ে থাকে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচন। এবার সেখানেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার হিড়িক পড়েছে যেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক মনোনীত মানেই নির্বাচিত।

নির্বাচনী ব্যবস্থা তিনটি এম দ্বারা প্রভাবিত এ কথা সবাই জানেন। মানি, মাসল এবং মিডিয়া মানিপুলেশন এই তিনটির মধ্যে টাকার প্রভাব যে সবচেয়ে বেশি তা নির্বাচন প্রক্রিয়া, নির্বাচনে মনোনয়ন দান এবং নির্বাচিতদের দেখলেই বোঝা যায়। ফলে যারা জনগণের জন্য লড়ছেন তাদের নির্বাচনে প্রচণ্ড অসম যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ফলাফল টাকাওয়ালারাই বিজয়ী এবং বিজয়ী হয়ে আরও টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না এই টাকা শোষণমূলক রাষ্ট্রেরও নিয়ম মেনে অর্জিত নয়। ফলে ক্ষমতা ও অর্থের এই আকর্ষণের কাছে চাপা পড়ে যাচ্ছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। এখন অবশ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও জটিল ও দুষ্টচক্রে বাধা পড়েছে। পয়সা, পেশি, প্রচারণা, প্রতীক, পুলিশ ও প্রশাসনের মেলবন্ধনে পর্যুদস্ত হচ্ছে প্রতিপক্ষ।

রাতের ভোট কথাটি এখন বহুল প্রচলিত। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে এটি বহুল প্রচারিত শব্দ। বাম গণতান্ত্রিক জোট জাতীয় প্রেস ক্লাবে নির্বাচন-পরবর্তী এক গণশুনানির আয়োজন করেছিল। সেখানে প্রার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলেন। নির্বাচন কমিশন প্রথমে এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার ২০১৯ সালের মার্চ মাসে বলেছিলেন, আগামী দিনে ভোটে ইভিএম শুরু করে দেব, তাহলে সেখানে আর রাতে বাক্স ভর্তি করার সুযোগ থাকবে না।

আগ্রহ বা রুচি নষ্ট হয়ে যাওয়াটা মানুষের জন্য ভালো লক্ষণ নয়। যেমন খাবারে আগ্রহ বা রুচি নষ্ট হয়ে যাওয়ার দুটো অর্থ হয়। প্রথমত, কোনো কিছু খেতে ইচ্ছে করে না, দ্বিতীয়ত, বাজে খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া। কিন্তু মানুষের জীবন ধারণের জন্য খাওয়া খুবই প্রয়োজনীয় হলেও অন্যান্য বিষয়ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং সেসব ক্ষেত্রেও আগ্রহ এবং রুচি খুবই দরকারি ব্যাপার। বিভিন্ন সময় শব্দ দুটো একইভাবে বলা হলেও সব সময় তা একই অর্থ বহন করে না। গান শোনার আগ্রহ কমেছে বা গান শোনার আগ্রহ নেই এর চেয়ে আশঙ্কার বিষয় গানের রুচি নষ্ট হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ নিম্নমানের গানে আসক্ত হয়ে যাওয়া গান না শোনার চেয়েও বিপজ্জনক।

বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ রাজনীতিতে ভীষণ কৌতূহলী। তারা রাজনৈতিক আলোচনা করতে ভালোবাসেন, শুনতে ভালোবাসেন। সেটা ঘরে, বাজারের চায়ের দোকানে বা রাজনৈতিক সমাবেশে কিংবা টেলিভিশনের টকশোতে, যেখানেই হোক না কেন। আর নির্বাচনটাকে অনেকটা উৎসবমুখর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলতে তাদের জুরি নেই। কিন্তু সেই মানুষরা যদি ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তাহলে বুঝতে হবে নির্বাচন তাদের আগ্রহ এবং আস্থা কোনোটাই ধরে রাখতে পারছে না। শুধু তা-ই নয়, প্রতিটি নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন, নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পরিচালনা, ভোট প্রদান এবং বিজয়ী হওয়ার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে মানুষের নির্বাচনী রুচির মান একটু একটু করে নিচে নেমে যেতে থাকে। আর এর প্রভাব পড়ছে সমাজের সবস্তরেই। নির্বাচনের একটা বড় বিষয় জবাবদিহি। গায়ের জোরে বা নৈশকালীন কৌশলে ক্ষমতায় থাকার সংস্কৃতি দুর্নীতির বিস্তার ঘটিয়েছে যেমন, তেমনি দায়হীন মানসিকতার জন্ম দিচ্ছে। তাই গণতান্ত্রিক চেতনা রক্ষা আর মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন যেমন দরকার, তেমনি দরকার ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। কারণ ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে তা যে সুষ্ঠু হয়নি এ কথা তো দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। এ ধরনের নির্বাচন ক্ষমতায় থাকার জন্য কার্যকর হলেও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক। নির্বাচন নিয়ে যেকোনো আলোচনায় এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

লেখক : সভাপতি সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট ও কলামনিস্ট

শেয়ার করুন