ডেস্ক রিপোর্ট
৯ এপ্রিল ২০২৩, ৮:৫২ অপরাহ্ণ
আবু নাসের অনীক::
র্যাব নিয়ে ডয়চেভেলের ও নেত্রা নিউজের একটি যৌথ প্রতিবেদন আবারো তাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষকরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বিষয়ে। অবশ্য বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড নতুন কোন বিষয় না। ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে সভাপতি করে জাতীয় মিলিশিয়ার কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠন করা হয়।
এই বোর্ডের সদস্য ছিলেন আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, এএইচএম কামরুজ্জামান, মনোরঞ্জন ধর, মনি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, গাজী গোলাম মোস্তফা, রফিক উদ্দিন ভূইয়া, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক ও সুজাত আলী সরকার। এই বোর্ডে সেই সময়ে প্রকাশ্যে রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারী সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছিলো।
জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনীর কনসেপ্ট ছিলো ৬ দফায় উল্লেখিত দাবীর বাস্তবায়ন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে প্রত্যাবর্তনের পর জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী বিলুপ্ত করে ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী অর্ডার ১৯৭২’ গেজেট প্রকাশিত হয়। পুলিশসহ অন্য বাহিনীগুলি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেও রক্ষীবাহিনী ছিলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে।
এই বাহিনী স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের সূচনা ঘটায়। হাজার হাজার বামপন্থী ও ভিন্নমতালম্বি বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হন। মূলত যারা সরকারের নানাবিধ সমালোচনা করতেন,ভিন্নমত প্রকাশ করতেন তারাই ছিলো রক্ষীবাহিনীর প্রধান টার্গেট।
১৯৭৪ সালে রক্ষীবাহিনী আইনের দুটি সংশোধনী আনা হয়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের দায়মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে। ৮(ক)‘রক্ষীবাহিনীর যে কোনো সদস্য বা অফিসার ৮নং অনুচ্ছেদবলে বিনা ওয়ারেন্টে আইনের পরিপন্থী কাজে লিপ্ত সন্দেহবশত যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবে। এছাড়া যে কোনো ব্যক্তি, স্থান, যানবাহন, নৌযান ইত্যাদি তল্লাশি বা আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে-এমন যে কোনো সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করতে পারবেন। যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার এবং তার সম্পত্তি হস্তগত করার পর একটি রিপোর্টসহ নিকটতম থানা হেফাজতে পাঠিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’
১৬(ক)‘রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা তাদের যে কোনো কাজ সরল বিশ্বাসে করেছেন বলে গণ্য করা হবে এবং এ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের, অভিযোগ পেশ কিংবা আইনগত কোনো পদক্ষেপ নেয়া যাবে না।’
১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এধরণের কোন বাহিনী না থাকলেও সামরিক বিচারের নামে কোন ধরনের আত্মপক্ষের সুযোগ না দিয়ে হাজার হাজার সেনাকর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। বিচারের নামে এটাও একধরণের বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডই ছিলো।
১৯৯১ সালে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে জেলহাজতে আটক লোকদের মৃত্যু এক নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। তখন বলা হতো, এভাবে মৃত্যুর কারণ আটক ব্যক্তির হার্টঅ্যাটাক! অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে হৃযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়েই তাদের মৃত্যু হয়েছিল!! সেই একই কাহিনী দেখা গেল ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে!
২০০২ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়ে, ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারী পর্যন্ত সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে অপরাপর বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত ‘যৌথবাহিনীর’ মাধ্যমে সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে।
‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ যৌথ অভিযানে ৫৭ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজার হাজার পরিবার। এই সকল হত্যাকান্ড সম্পর্কে গল্প প্রচার করা হতো, ‘জিজ্ঞাসাবাদের সময় বা অস্ত্র উদ্ধারের সময় বা ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় ‘হার্ট অ্যাটাক’ এ মৃত্যু হয়েছে’।
পরবর্তীতে ২০০৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন-২০০৩’ আইনটি পাশ করে জোট সরকার সেই সময়ে ঘটা সকল হত্যাকান্ড ও নির্যাতনের দায় থেকে যৌথবাহিনীকে মুক্তি দেয়। অভিযানের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিলো সরকার দলীয় বেশকিছু সন্ত্রাসী তাদের প্রচারিত তথাকথিত ‘হার্ট অ্যাটাক’ এ মৃত্যুবরণ করে। এই বিষয়টিকে অনেকেই অভিযানের ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন!
২৬ মার্চ ২০০৪ র্যাব গঠন করে বিএনপি-জামাত জোট সরকার। ২৪ জুন র্যাবের ক্রসফায়ারে প্রথম মৃত্যু সংঘঠিত হয়। ১৮ অক্টোবর ২০০৪ থেকে র্যাব দেশব্যাপী অপারেশন শুরু করে এবং ক্রসফায়ারের একের পর এক ঘটনা সংঘটিত হয়, সাথে চিরাচরিত সেই একই গল্প। ১৯ বছর পরেও যা এখনও চলমান।
তৎকালীন সময়ে আইনমন্ত্রী প্রয়াত মওদুদ আহমেদ র্যাবের ক্রসফায়ার সম্পর্কে বলেন,‘ আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। সন্ত্রাসীদের সাথে এটি র্যাবের যুদ্ধ। ফলে ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার ঘটনা কোনভাবেই মানবাধিকারের সাথে সম্পর্কিত নয়’(৭ জানুয়ারী ২০০৫- দৈনিক আমার দেশ)।
তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী প্রয়াত নাজমুল হুদা বলেন,‘আল্লাহর বিচারেই ক্রসফায়ারে মৃত্যু হচ্ছে। র্যাব ভালো কাজ করছে। র্যাব সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। ক্রসফায়ারে নিরীহ কেউ মারা গেলে এক্সিডেন্ট বলতে হবে।’ (২৭ অক্টোবর ২০০৪, দৈনিক সংবাদ)।
তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বলেছিলেন,‘সন্ত্রাস দমনে র্যাব ও পুলিশবাহিনীর সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। র্যাব কোন নিরীহ মানুষ হত্যা করেনি, র্যাব প্রয়োজনে আরো কঠোর হবে।’(৩ ডিসেম্বর ২০০৪, যুগান্তর)। অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির ক্ষমতার মেয়াদ ২০০৬ সালে শেষ হওয়া পর্যন্ত র্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধে ৩৮০ জন নিহত হয়।
তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী র্যাবকে মানুষ খুনের লাইসেন্স দিয়েছেন’ (২৩ জুলাই ২০০৪- দৈনিক সংবাদ) ।
সাবেক আইনমন্ত্রী প্রয়াত মওদুদ সাহেব ২০১৬ সালের ২৬ জুনে এসে বলেছিলেন, ‘আজকে একদিকে গুম-হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার চলছে; ক্ষমতায় গেলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করা হবে। সরকার কাউকে গুম করবেনা এবং বিনা বিচারে কাউকে আটকও রাখা হবে না’।
আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইস্তেহারে এ ধরনের হত্যাকান্ড বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সুশাসন প্রতিষ্ঠার অনুচ্ছেদে ৫.২ নং অঙ্গীকারে বলা হয়েছিলো,‘বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরেপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করা হবে’।
দুইটি অঙ্গীকারের একটিও আলোর মুখ দেখেনি। একপক্ষ ‘সন্ত্রাস দমন’ অন্যপক্ষ ‘মাদক নির্মূল’ এর নামে বাংলাদেশের জন্মকালীন সময় থেকে অদ্যাবধি বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এবং আওয়ামীলীগ পরবর্তীতে তার দুটি নির্বাচনী ইস্তেহারে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড’ সম্পর্কে নিশ্চুপ থেকেছে।
আসক এর হিসাব অনুযায়ী, আওয়ামীলীগ সরকারের প্রথম বছরেই ২০০ জনের বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হন। ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে মারা গেছেন আড়াই হাজারের বেশি মানুষ।
বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন,‘বিচার বহির্ভূত হত্যা তো আমরা করিনা। আমাদের উপর এটাক হলে কাউন্টার এটাক করি’(৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৯-দৈনিক প্রথমআলো)।
শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের প্রত্যেকের বক্তব্য এক ও অভিন্ন। ক্ষমতায় থাকলে একরকম আর বাইরে থাকলে অন্যরকম,পার্থক্য শুধু এটুকু। কারণ এরা সকলেই র্যাবকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে এবং এখনও করছে।
ক্ষমতাসীনদের মাঠ পর্যায়ে ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র বাস্তবায়নকারীদের (বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনী) একটি অংশ একসময় আনুগত্য প্রকাশ না করে নিজেরাই গড ফাদার হয়ে উঠতে চায়; তখনই ক্ষমতাসীনদের সেইসব অংশকে দমন করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
সেই প্রয়োজন মেটায় ক্রসফায়ার-এনকাউন্টার-ফায়ার লাইন যে নামে ডাকি! একটি উদাহরণ দিলে আরো পরিস্কার হবে। পিচ্চি হান্নান ক্রসফায়ারে মারা যাবার পর তার মেয়ে বলেন,‘এমপির নির্দেশে বাবাকে মারা হয়েছে, কিন্তু নির্বাচনে আমার বাবা এমপির পক্ষে অনেক কাজ করেছে’(৮ আগষ্ট ২০০৪-প্রথমআলো)।
সরকার যখন অনৈতিকভাবে র্যাব-পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতা পোক্ত, বিভিন্ন স্বার্থ হাসিল করে; তখন ঐ সমস্ত বাহিনীর সদস্যরাও নিজেরা অনৈতিক কর্মকান্ড করার বৈধতা পেয়ে যায়। সেকারণে বাহিনীর নিজস্ব ‘ক্রসফায়ার’ জাতীয় কর্মকান্ড সরকার হজম করতে বাধ্য হয়।
র্যাবসহ অন্যবাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের আইনগত বৈধতা দেয় আমাদের সংবিধান, ঔপনেবেশিক আমলের পেনাল কোড ও দন্ডবিধি।
সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অংশে বলা হচ্ছে,‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ অর্থাৎ আইনানুসারে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটি আইনানুসারে এবং কোনটি নয় সেটি কিভাবে নির্ধারিত হবে? এটি প্রচলিতভাবে নির্ধারণ করে সরকারের বাহিনীসমূহ।
সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদের দায়মুক্তি বিধানের ক্ষমতা অংশে বলা হচ্ছে,‘এই ভাগের পূর্ববর্ণিত বিধানবলীতে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্বেও প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোন ব্যক্তি বা অন্য কোন ব্যক্তি জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রয়োজনে কিংবা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমার মধ্যে যে কোন অঞ্চলে শৃঙ্খলা রক্ষা বা পূর্ণবহালের প্রয়োজনে কোন কার্য করিয়া থাকিলে সংসদ আইনের দ্বারা সেই ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করিতে পারিবেন কিংবা ঐ অঞ্চলে প্রদত্ত কোন দন্ডাদেশ,দন্ড বা বাজেয়াপ্তির আদেশকে কিংবা অন্য কোন কার্যকে বৈধ করিয়া লইতে পারিবেন’।
THE CODE OF CRIMINAL PROCEDURE, 1898- PART III CHAPTER V (OF ARREST, ESCAPE AND RETAKING) এর Resisting endeavor to arrest- 46(3), `Nothing in this section gives a right to cause the death of a person who is not accused of an offence punishable with death or with transportation for life.’’ অর্থাৎ মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হতে পারে এমন মামলার আসামী ধরার জন্য প্রয়োজনে তাকে মেরে ফেলার বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।
পেনাল কোডের ১০০ ধারায় দেহের ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার অধিকারঃ ‘পেনাল কোড আইনের ৯৯ ধারার শর্ত সাপেক্ষে ১০০ ধারা মোতাবেক নিজের দেহ এবং অপরের দেহ আক্রমনকারীর আক্রমনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নিম্নবর্ণিত ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগ করা যায়।
১। এমন আঘাত মৃত্যুই যার পরিনতি ২। এমন আঘাত গুরতর জখমই যার পরিনতি।’ এখন আঘাতটি কেমন ছিলো বা আদৌও আঘাতের মত পরিস্থিতি ছিলো কিনা এটাও কিন্তু নির্ধারণ করে ঐ বাহিনীর সদস্যরাই।
৭৬ ধারায় বলা হচ্ছে,‘সরকারী কর্মচারী নিজেকে আইনবলে বাধ্য মনে করে বা ভুল ধারনা বশতঃ কোন কাজ করতে গিয়ে অপরাধ হয়ে গেলেও তাহা অপরাধ হিসাবে গণ্য হবেনা’।
সুতরাং এই ধারাবলে বাহিনীর সদস্য যেকোন একটি অপরাধ (হত্যাকান্ডও হতে পারে) করে বলতেই পারে তার ভুল হয়ে গেছে। তখন এই ধারা তার রক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ি, ২০০১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন তিন হাজার ৩৬৪ জন। বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে এ ধরনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছিলো ২০০৫-০৬ সালে। ২০০৫ সালে ৩৭৭ জন এবং ২০০৬ সালে ৩৬২ জন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারী করে। ফলশ্রুতিতে এধরনের হত্যাকান্ড কমে আসে। আমরা পূর্বেও দেখেছি, যখন নির্দিষ্টভাবে কোন একটি হত্যাকান্ড নিয়ে এর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয় তখন সাময়িকভাবে এটি বন্ধ থাকে, কমে আসে; অল্প কিছুদিন পরেই আবার সেটি শুরু হয়ে যায়।
এই যে কমে আসার বিষয়টি,এটাকে একটু ভিন্নভাবে দেখলেই বোঝা যাবে অধিকাংশ বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড আসলে পূর্বপরিকল্পিত। যদি সেটা নাই হতো তাহলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সাথে সাথে ঘটনা কমে আসার বাস্তবিক কোন সুযোগ থাকতোনা, র্যাব ক্রসফায়ারের যে বর্ণনা দিয়ে থাকে সেঅনুযায়ি।
কারণ ক্রসফায়ারে যারা নিহত হয় তারা নিশ্চয়ই এটা ভেবে বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ করে দেয়না যে, এখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আছে এজন্য তারা আর র্যাবের উপর আক্রমণ করবেনা। তারা না করলে র্যাবও করবেনা!! ক্রসফায়ারের ঘটনাও ঘটবেনা। কী হাসক্যর বিষয়! এটা দিয়েই বোঝা যায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডগুলি ঘটে খুবই পরিকল্পিতভাবে।
প্রশ্ন, আইন কোথায়? আদালত কোথায়? শুধুমাত্র র্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিচার দাবী করলে তা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের’ ব্যবস্থাপনাকে টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করবে। বর্তমানের এই ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন ছাড়া দেশে আপামর জনগণের বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
কারণ বর্তমান সংবিধান, ফৌজদারি কার্যবিধি আর দন্ডবিধি বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখবে র্যাবের মতো বিভিন্ন বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডকে। নাহলে একটি দুটি ঘটনার বিচার হলেও বিনা বিচারে হত্যাকান্ড চলতেই থাকবে!
#বিচারবহির্ভূতহত্যাকান্ড