ডেস্ক রিপোর্ট

২১ ডিসেম্বর ২০২১, ৮:৪৮ অপরাহ্ণ

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী: অস্তমিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা!

আপডেট টাইম : ডিসেম্বর ২১, ২০২১ ৮:৪৮ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক::

১৬ ডিসেম্বর,২০২১ আমাদের প্রাণপ্রিয় স্বদেশভূমির বিজয় অজর্নের সুবর্ণজয়ন্তী । হৃদয়ের অন্তস্থলে রয়েছে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। আমাদের চরম দুর্ভাগ্য একই সাথে বলতে হয়, ‘বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে, মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ। এই রক্তমাখা মাটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো। জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আধাঁর, আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়। এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননী, স্বাধীনতা-একি হবে নষ্ট জন্ম?’ বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে কবিতার পংক্তিগুলি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিমের শাসকগোষ্ঠী যে নিপীড়ন জারি রেখেছিলো, বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তির লগ্নে গণমানুষ সেই একই নিপীড়নের স্বীকার হচ্ছে।

একটি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খায় ১৯৭১ সালে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে একটি পতাকা ও নির্দিষ্ট একটি ভূখন্ড অর্জিত হয়েছে, কিন্তু এই ৫০ বছরে এখনো পর্যন্ত সেই কাঙ্খিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অধরাই থেকে গেছে। যে চেতনায় শানিত হয়ে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় অর্জন করে একটি দেশ পেলাম সেই চেতনার বিজয় আমরা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছি।

’৭১ পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় এক কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা। সেই শাসন ব্যবস্থার সাথে তৎকালীন পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থার মৌলিক কোন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। অদ্যাবধি সেই কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থায় চলমান। বরং বলা চলে গত ১৫ বছরে এটি এতোটাই সুসংহত হয়েছে যে, নুন্যতম প্রতিবাদের, কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্মকালীন ইতিহাস নির্মোহভাবে পর্যালোচনা করলেই এই কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার উৎসমুখ খুঁজে পাওয়া যাবে। একই সাথে ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রের বিকাশের শর্তাবলী যে এখানে বিদ্যমান সেটিও বোঝা যাবে।

’৭১ পূর্ববর্তী সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবসায়ী-ভূস্বামীদের সাথে দ্বন্দ্ব ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানী ব্যবসায়ী-ভূস্বামী শ্রেণীর। সেই সময়ে সমগ্র পাকিস্তানের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করতো ২২ পরিবার। এই ২২ পরিবারের মধ্যে ২ পরিবারের অবস্থান ছিলো পূর্ব পাকিস্তানে। পশ্চিম পাকিস্তানের এই ২০ পরিবার কর্তৃক এই দুই পরিবার চরমভাবে কোনঠাসা হয়ে থাকতো।

পশ্চিমের ব্যবসায়ীগোষ্ঠী কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কোনঠাসা থাকতো। অর্থনৈতিক সকল কর্মকান্ড কেন্দ্রীভূত ছিলো পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক। ফলশ্রুতিতে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণও চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বীকার হতো। এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও অধিনস্ত ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে। পশ্চিমের শাসক গোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য শোষণের এই মাত্রা পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের উপরেও চাপিয়ে দিয়েছিলো। এ দেশের সাধারণ জনগণ এই কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি ছিলো ভীষণভাবে ক্ষুদ্ধ। তারা প্রতিনিয়তো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার হতে বঞ্চিত হতো। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে শোষণের এই নিগড় থেকে বের হবার তীব্র আকাঙ্খা তৈরি হয়।

এ ধরণের একটি প্রেক্ষাপটে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছিলো একটি অনিবার্য বিষয়। কার্যত এই যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ ছিলো না। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্ব বরণ আর মা-বোনেদের সম্ভ্রম বিষর্জনের মধ্যে দিয়েই বাংলাদেশের জন্ম। জনগণের চোখে স্বপ্নের ঝলকানি। কিন্তু প্রথমেই হোঁচট খেতে হলো! দেশকে ঘোষণা করা হলো ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’। এর একটি সংবিধান রচনা করা হলো একজন রাজার কথা মাথায় রেখে! ’৭১ পূর্ববর্তী সময়ে জনগণ ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের প্রজা আর পরবর্তীতেও সেই প্রজা, তবে এবার যেটি ঘটলো, যে দেশ সে তার নিজের রক্তের বিনিময়ে অর্জন করলো সে দেশেই হয়ে গেলো প্রজা!! দেশের মালিক হয়ে ওঠা আর হলো না।

এখনও পর্যন্ত জনগণ প্রজা হয়েই রয়েছে। রাস্ট্রের মূলনীতি হিসাবে ঘোষণা করা হলো ধর্মনিরেপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ। পুরো ৬০-৭০ এর দশক জুড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত হতে থাকে। এই সমস্ত সংগ্রামের নেতৃত্বে ছিলো বিভিন্ন দেশের শ্রমিক শেণীর পার্টি সমূহ। সমগ্র বিশ্বে তখন সমাজতন্ত্র খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বুর্জোয়া শাসক গোষ্ঠীর হাত থেকে মুক্ত হয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।

এ ধরনের একটি প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে এগুলো যুক্ত হয়। কিন্তু মতাদর্শ বাস্তবায়নের জন্য তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন শ্রেণীর রাজনৈতিক দল ব্যতীত সেটির চর্চা বা বাস্তবায়ন হওয়া অসম্ভব। ঘটেছেও ঠিক তাই। আওয়ামীলীগ যে শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল তার পক্ষে বাংলাদেশ সৃষ্টির সাথে যে চারটি মূলনীতি যুক্ত করা হয়েছিলো তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বরং দলটি ধীরে ধীরে লুটেরা ধনীক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। এটা যে সম্ভব নয় সেটি দলটিও জানতো। প্রশ্ন হতে পারে তাহলে কেনো তারা মূলনীতিতে এই শব্দগুলো যুক্ত করেছিলো? কারণ তৎকালীন বাস্তবতায় এই শব্দগুলো এড়িয়ে জনগণকে সংগঠিত করার কোন সুযোগ ছিলোনা। এবং সেই লড়াইয়ে বামপন্থি শক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিলো।

’৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশ সামরিক কর্তৃত্ববাদের খপ্পরে পড়ে। সেখানেও নির্বাসিত থাকে গণতন্ত্র। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের ভেতর দিয়ে সামরিক কর্তৃত্ববাদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে লুটেরা ধনীক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
’৯০ পরবর্তী তথাকথিত সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা হলেও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় একজন ব্যক্তির করায়ত্বে। যা স্বাধীনতার চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিপরিতে প্রতিষ্ঠিত হয় তথাকথিত নির্বাচনে নির্বাচিত রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রের। লুটেরা ধনীক শ্রেণীর দলগুলির পরস্পর পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে নির্বাচন ব্যবস্থাপনাকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব ঘটলেও বর্তমান সরকার ‘ক্ষমতাতন্ত্রের-লুটপাটতন্ত্রের’ চীরস্থায়ী বন্দোবস্ত স্বরুপ এই ব্যবস্থাকে বাতিল করে। আগে শাসক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভগি করে লুটপাট করলেও বর্তমান সরকার এখন আর ভাগাভাগি তত্ত্বে বিশ্বাসী না!

বর্তমান সরকার নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বাহক দাবী করলেও তাদের সকল ব্যবহারিক কর্মকান্ড ফ্যাসিস্ট সরকারের আচরণের ন্যায়। এমনকি স্বাধীন মতামত প্রকাশ করাকেও এই সরকার বল ও আইন প্রয়োগ করে দমন করছে।

রাষ্ট্র, সরকার, দল তারা সব একাকার করে ফেলেছে। এ কারণেই সরকারের সমালোচনা করলেই তা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে অভিযোগ উত্থাপন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইন প্রয়োগ করছে। রাজনৈতিক মত প্রকাশের সকল পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। তাদের একচেটিয়া ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে নিজেদের পকেটে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে। সংবিধানে ‘ইসলাম’ কে রাষ্ট্র ধর্ম হিসাবে ফিরিয়ে এনেছে।

স্বাধীনতার পূর্বে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গুন্ডামি করতো এনএসএফ। এখন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়(দাবী করে) লালিত সংগঠন ছাত্রলীগ। দুর্বৃাত্তায়িত রাজনীতির প্রভাবে অবলীলাক্রমে তার সহপাঠীকে হত্যা করছে বিনা ক্লেশে।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে এ বিষয়ে কোন বির্তক নেই। প্রশ্নটি হচ্ছে এই উন্নয়নের সুফল ভোগকারী কারা? দেশের সংখ্যা লঘিষ্ঠ অংশ। সমতাভিত্তিক, শোষণ-বঞ্চনাহীণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের বিপরিতে একটি চরম বৈষম্যমূলক সমাজের উত্থান ঘটেছে। যা প্রমাণ করে, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় এনে দিয়েছে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের জন্য!

আসকের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে গুম হয়েছে ৬০৪ জন। গুম হওয়া ব্যক্তিদের প্রত্যেকটি পরিবার এর জন্য অভিযুক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। অথচ তারা এ বিষয়ে নির্বিকার। একটি স্বাধীন দেশে একজন নাগরিকেরও যদি সন্ধান পাওয়া না যায় তার সন্ধান দেওয়ার সাংবিধানিক দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। ৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী গুম করার সূচনা করেছিলো আর স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী সেই ধারাবহিকতা এখনো বজায় রেখেছে। কী বুঝলেন!!

চলছে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড। আজকের এই দিনে বিশেষভাবে স্মরণ করছি কমরেড মোফাখখার চৌধুরীকে। ২০০৪ সালে ১৬ ডিসেম্বর ক্রসফায়ারের নামে তাকে হত্যা করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছেন, তাঁরা কী এই বাংলাদেশ চেয়েছিলেন?? তাঁরা কী মনে করতেন, পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা উন্নয়নশীল দেশের প্রস্তাবনা গ্রহণই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বার্থকতা!! ’৭১ সালে তৎকালীন শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলার অপরাধে হত্যা করা হয়েছিলো, সরকার বিরোধীতার কারণে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়েছিলো, এর কী কোন পরিবর্তন ঘটেছে? না কোন পরিবর্তন ঘটেনি।
নির্লজ্জ আমাদের শাসক গোষ্ঠী! এই শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই আশু কর্তব্য। ‘প্রতিরোধ’ ই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় সকল স্বৈরশাসকই গণপ্রতিরোধে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। জনগণের প্রতিরোধ গড়ে উঠবেই, কারণ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মই হয়েছে ‘প্রতিরোধ’ করার মধ্যে দিয়েই!!

বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা!!

শেয়ার করুন