ডেস্ক রিপোর্ট

৩ নভেম্বর ২০২১, ৯:০১ অপরাহ্ণ

ক্ষমতাতন্ত্র: হাঁড় নেই, চাপ দিবেন না

আপডেট টাইম : নভেম্বর ৩, ২০২১ ৯:০১ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক::

‘হাঁড় নেই, চাপ দিবেন না’ এই বাক্যটিসহ একটি ছবি গত কয়েক দিন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে একজন রোগী হাসপাতালের আইসিইউ শয্যায় মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে শুয়ে আছে। মাথার ব্যান্ডেজে আলোচিত বাক্যটি লেখা। গত ২৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তার জেরে পরদিন ৩০ অক্টোবর কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এক পক্ষের অনুসারী ছাত্রলীগের কর্মী মাহাদী’র উপর হামলা করা হয়। বর্তমানে মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে তার আশ্রয় হয়েছে।

দেশের মেধাবী ছাত্ররাই সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলিতে ভর্তির সুযোগ পেয়ে থাকে। সে হিসাবে আহত মাহাদী এবং তাকে যারা কুপিয়েছে তারা সকলেই সেই মেধাবী গোত্রের। উভয়েই একই ছাত্র সংগঠনের কর্মী। সে অনুযায়ী তাদের মতাদর্শ-রাজনীতি অভিন্ন হওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত। পারস্পরিক বৈরিমূলক দ্বন্দ্বের কোন সুযোগ নেই।

বাস্তবতা কিন্তু সেটা বলছে না। তাদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এতোটাই প্রকট যে, এক পক্ষ অপর পক্ষকে হত্যা করার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। বাস্তবতা এটাই বলছে যে, তাদের মধ্যে আদর্শিক মতাদর্শ ও রাজনীতির কোন অস্তিত্ব নেই। কিন্তু তাহলে কী তারা কোন মতাদর্শ-রাজনীতি ধারণ করে না?

অবশ্যই তাদের একটি মতাদর্শ-রাজনীতি আছে। বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর যে রাজনৈতিক মতাদর্শ তারা সেটি দ্বারাই চালিত হচ্ছে। ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রই তাদের মতাদর্শ আর রাজনীতির চালিকা শক্তি। এর বাইরে তাদের অবস্থান হবে না সেটাই স্বাভাবিক।

ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানা গেছে দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের কারণ চাাঁদাবাজি। হাসপাতালের পাশের ২৫ টি দোকান থেকে মাসে চাঁদা উত্তোলিত হয় ২ লাখ টাকা। এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া থেকে আসে মাসে আরো ৭০ হাজার টাকা। দ্বন্দ্বটি এখানেই, ২লাখ ৭০ হাজার টাকার ভাগ কাদের পকেটস্থ হবে, আহত মাহাদী পক্ষের নাকি যারা মাহাদীকে আহত করলো তাদের!! এর বাইরেও আছে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে চাাঁবাজির অর্থের উৎস।

এটা দিবালোকের মত পরিস্কার, যারা এই ছাত্র সংগঠনটি করছে তার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আদর্শিক মতাদর্শের জায়গা থেকে সেটি করছে না। এক অংশের কাছে বিবেচ্য চাঁদাবজিসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন। এটার জন্য প্রয়োজন হয় আধিপত্য বিস্তার করা, গুন্ডাতন্ত্র কায়েম করা, তার ধারাবাহিকতায় সন্ত্রাস সৃষ্টি করা। অন্য অংশটি প্রথম অংশের প্রভাব বলয়ের কারণে হলে একটি সিট পাবার জন্য, কলেজ ক্যাম্পসে নিরাপদে চলাচলের জন্য বাধ্য হয়ে ক্ষতাসীন ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকে। এই দুই অংশের বাইরে ক্ষুদ্র একটি অংশ মতাদর্শিকভাবে সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়, যাদের সংগঠনের অভ্যন্তরে বিন্দুমাত্র কোন গুরুত্ব থাকে না। যেখানেই অবৈধভাবে বৈষয়িক লাভালাভ সেখানেই গ্রুপিং!

কলেজ ছাত্রলীগ বিভক্ত দুই সরকারী দলের নেতার ছত্রছায়ায়। পূর্বেই উল্লেখ করেছি আদর্শিক মতাদর্শ দ্বারা রাজনীতি পরিচালিত হলে বৈরিমূলক দ্বন্দ্বের কোন সুযোগ থাকে না। সারা দেশের অন্যান্য জায়গায় যেমন হচ্ছে এখানেও দুই নেতা তাদের ক্ষমতাতন্ত্র নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই স্ব-স্ব স্বার্থে ছাত্রদের ব্যবহার করছে।

উভয় নেতাই যদি স্ব-স্ব অবস্থান থেকে চাঁদাবজির বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতেন তবে হাসপাতালের আশপাশের এলাকায় চাঁদাবজি হওয়া সম্ভব ছিলো না। দুই নেতার মধ্যে একজন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সভাপতি এবং উপমন্ত্রী, অন্যজন সাবেক মেয়র। যারা অনায়াসেই প্রশাসনকে বাধ্য করতে পারেন চাঁদাবজি বন্ধে। কিন্তু তারা কঠোর হননা। কারণ হাসপাতালকে কেন্দ্র করে যে দালালচক্র গড়ে উঠেছে, যারা চাঁদা উঠায়, যে ছাত্ররা এই চাঁদার ভাগ নেয় তাদের সকলকেই এই সমস্ত নেতাদের প্রয়োজন হয় তাদের ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র টিকিয়ে রাখার স্বার্থে।

একটি গণবিরোধী সরকার ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র স্থায়ীভাবে জারী রাখার স্বার্থে গুন্ডাতন্ত্রকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অর্থাৎ সমাজের সকল স্তরে ছড়িয়ে দেয়। একইসাথে চলে লুটপাটতন্ত্রের সম্প্রসারণ। পাওয়ারকে এবসুলুট করার জন্য তারা লুটপাটতন্ত্র- গুন্ডাতন্ত্রের একটি চেইন তৈরি করে। ফলশ্রুতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সকল জায়গায় এর অবারিত চর্চা হয়। এই চর্চা ব্যতীত এ ধরনের গণবিরোধী সরকারের পক্ষে শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব হয় না।

মেডিক্যালের একজন ছাত্র ভবিষ্যতের একজন চিকিৎসক, যার উপর নির্ভর করে একজন অসুস্থ মানুষের জীবন। চিন্তা করুন, আগামী দিনের এই চিকিৎসক চাঁদাবাজির টাকার ভাগ খাওয়ার জন্য তার সতির্থকে কুপিয়ে হত্য করতে যায়, সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, আপনার ভবিষ্যতের চিকিৎসকের অবয়ব চিন্তা করলে এননিতেই হার্টের ক্রিয়া বন্ধ হবার কথা নয় কী??

আমরা প্রায়শই পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে দেখে থাকি, ‘চিকিৎসকের গাফিলতিতে রোগীর মৃত্যু’, ‘রোগীর স্বজনদের সাথে চিকিৎসকের মারামারি’ অথবা ‘ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’। কেনো এমন সংবাদ তৈরি হয় নিশ্চয়ই এটা বুঝিয়ে বলার আর প্রয়োজন নেই!

ছাত্র জীবনে চাপাতি হাতে দৌড়ে বেড়াবে চাঁদাবাজির ভাগ নেবার জন্য আর চিকিৎসক হয়ে আদর্শ ডাক্তারের সেবা প্রদান করবে এটা নিশ্চয়ই আশা করা কোনভাবেই সঙ্গত নয়। এই যে, সেরা মেধাবী ছাত্র যারা সরকারী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয় তাদের পরিবার কিন্তু সন্ত্রাসী-খুনী হিসাবে তৈরি করে এখানে পাঠায় না। আহত মাহাদী’র পিতা একজন আদর্শ স্কুল শিক্ষক। কিন্তু ভোগবাদী সমাজের প্রভাবে মাহাদী’রা প্রভাবিত হচ্ছে। ভোগের নেশায় এতোটাই উন্মত্ত হয়ে উঠছে যে সর্তীথ’র প্রাণ কেড়ে নেবার জন্য একবারও হাত কাঁপছে না। ক্ষমতাতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য শাসকগোষ্ঠীর ক্রিড়ানক হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে।

সারাদেশে এই মুহুর্তে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন চলছে। অংশগ্রহণকারী ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল। মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরে ধারবাহিকভাবে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। বিষয়বস্তু কিন্ত এক ও অভিন্ন। আদর্শিক মতাদর্শ নিয়ে রাজনীতি করছে না। মতাদর্শ যেনতন কায়দায় ক্ষমতাতন্ত্র টিকিয়ে রাখা, অভিপ্রায় লুটপাট আর বাস্তবায়নের পথ গুন্ডাতন্ত্র। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি নতুন সেটা ভাববার কারণ নেই! সময় যতো পার হচ্ছে এই অবস্থা ক্রমশই অবনতিশীল হচ্ছে। জনগণের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ না ঘটার কারণেই এদেশের মানুষকে এই বাস্তবতা হজম করতে হচ্ছে।

ভোগ সর্বস্ব রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থায় ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র টিকিয়ে রেখে একটি সুস্থ সমাজ পাওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন গণ প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তাহলেই গণমানুষের একটি সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব।

শেয়ার করুন