ডেস্ক রিপোর্ট
১৬ আগস্ট ২০২২, ১১:২৩ অপরাহ্ণ
আবু নাসের অনীক::
সরকারের মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ গত কয়েকদিন ধরে যে ভাষায় কথা বলছেন, তাতে মনে হচ্ছে দেশটি পরিচালনা করছে একদল অপ্রকৃতস্থ মানুষ। যাদের সবধরণের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছে বলেই মনে হয়। কারণ একজন স্বাভাবিক বিবেকবোধসম্পন্ন মানুষের পক্ষে এই ভাষায় কথা বলা সম্ভব নয়।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে কেউ মারা যায়নি।’ তথ্যমন্ত্রী বলেছেন,‘দেশের প্রত্যেকটি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। কাউকে খালি পায়ে দেখা যায় না। দেশে ছেঁড়া কাপড় পরা মানুষ নেই’। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন,‘আমরা বেহেস্তে আছি’। তাঁর এই বক্তব্য জাস্টিফাই করতে যেয়ে তিনি আবার বলেছেন, যা বলেছেন তা অন্য দেশের অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কথা তুলনা করতে যেয়ে বলেছেন।
তিনি আরো বলেছেন, তাকে নিয়ে টুইস্ট করা হচ্ছে। মাননীয় মন্ত্রী, আপনার কাছে জানতে মন চায়, এই বেহেস্তের এতো আরাম-আয়েশ সুখ বিসর্জন দিয়ে আপনার পাঁচ সন্তানের মধ্যে প্রত্যেকেই আমেরিকার নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানে কেনো স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন?? বেহেস্তের শান্তি রেখে কেউ কী দোজখে যায়? আপনার সন্তানেরা বোধহয় যায়, নাকি বলেন?
সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্য হিসাবে, এ ধরনের অসত্য, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য গণমাধ্যমে দেওয়ার মাধ্যমে দেশের জনগণকে চুড়ান্তভাবে অপমান করেছেন আপনারা। আপনাদের তৈরিকৃত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার ইত্যাদি অংশের ধারা ২৯(১) এ বলা হয়েছে,‘যদি কোন ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোন ইলেকট্রিক বিন্যাসে Panal Code(Act XLV of 1860) এর section 499 এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তজন্ন তিনি অনধিক ৩ (তিন) বছর কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন’।
আমাদের মন্ত্রীদের এ ধরণের বালখিল্য বক্তব্য, অবশ্যই দেশের জনগণের জন্য মানহানিকর। তার ধারাবাহিকতায় এই আইনের আওতায় (যদিও কোন বিচারই এই কালো আইনের আওতায় হওয়া উচিত নয় বলে নীতিগতভাবে মনে করি) বিচার হওয়া উচিত। উচ্চ আদালতের উচিত স্বতপ্রণোদিত আদেশ জারি করে এসব মন্ত্রীদেরকে বিচারের আওতায় আনা। অবশ্য সরকার ইতিমধ্যেই এই বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। একারণেই সে আর স্বাধীনভাবে ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির দোহায় দিয়ে দেশে অস্বাভাবিক হারে মূল্য বৃদ্ধি করেছে। এই মূল্য বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে, জ্বালানি সচিব এর দায় অস্বীকার করে বলেছেন,‘তেলের মতো স্পর্শকাতর পণ্যের দর বাড়ানোর ক্ষমতা আমলাদের নেই। সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধি হয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে’।
অর্থাত বিষয়টি পরিস্কার। সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে এমন একটি দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়ে বেহেস্তের সুখ-শান্তির কথা বলছে, নির্লজ্জতার একটা সীমা থাকা উচিত! জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি আইনগতভাবে বিইআরসি’র হলেও মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বিপিসি। অবশ্য বিপিসি বলছে, সিদ্ধান্ত সরকারের। অর্থাত মূল্য বৃদ্ধির মূল প্রক্রিয়াটিই আইনসিদ্ধ নয়। অন্য সকল ঘটনার ন্যায় এ বিষয়েও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে।
প্রকৃতঅর্থে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার বিদ্যমান আইনকে তোয়াক্কা করেনা। সে তার নিজস্ব কর্তৃত্ববলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং অসাংবিধানিকভাবে সেটি বাস্তবায়নও করে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি তেমনি একটি বিষয়।
উন্নয়নের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে আমরা নানা ধরনের রঙিন ফানুস উড়িয়েছি। সেই ফানুসগুলোর একটি অন্যতম ফানুস হচ্ছে বিদ্যুৎ। দেশ এখন লোডশেডিং এ নিমজ্জিত। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণেই এমনটি হচ্ছে বলে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। আসলেই কী বিষয়টি এমন!
পিডিবি’র চেয়ারম্যান বলেছেন,‘২০২০ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছিল ৫০ হাজার কোটি টাকা। ক্যাপাসিটি চার্জ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এই খাতে ১১ হাজার কোটি টাকা ভূর্তুকী দিতে হয়েছে’। পাঠক, এবার আপনারা বিবেচনা করুন বিষয়টি কী দাঁড়ালো! বিদ্যুত নামের উন্নয়নের রঙিন ফানুস হঠাৎ করেই কেনো বিবর্ণ হয়ে গেলো বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই। এভাবে আর যাই হোক টেকসই উন্নয়ন হয়না কখনও।
গরুকে খুব অল্প সময়ে পরিপুষ্ট করার জন্য অসৎ ব্যবসায়ীরা মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট খাওয়ায়। আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ঠিক এমনই ট্যাবলেট খাইয়েছে। স্বল্প সময়ে অতি মুনাফার আশায় গরু-ছাগলকে এসব ট্যাবলেট খাইয়ে এই প্রাণীর যেমন ক্ষতি করা হয়, তার ভোক্তাকেউ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
লুটপাটকে সামনে রেখে একইরকমভাবে বড় বড় মেগাপ্রজেক্ট গ্রহণ করে দেশকে এক অস্বাস্থ্যকর, অস্বাভাবিক উন্নয়নের বাতাবরনে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; একইরকমভাবে আমরা যারা এই দেশের সাধারণ নাগরিক তাদের জীবনকে ঝঁকিপূর্ণ করে তোলা হচ্ছে।
যারা এসব করছে, তারা তাদের সন্তানদেরকে এই বেহেস্তে (বাংলাদেশ) পড়াশোনা করান না। নিজেরা এখানকার চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন না। কানাডা-মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরে অঢেল সম্পদ গড়ে তোলেন। দেশের মানুষের লক্ষ-হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত রাখেন।
তাদের কাছে দেশ ও দেশের জনগণ ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্রের একটি মাধ্যম মাত্র। দেশের স্বার্থ তাদের কাছে অতি গৌণ একটি বিষয়। যা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর দেশটি এই লুটেরা গোষ্ঠীর খপ্পরে পড়ে। গত ৫১ বছর ধরে তাদের খপ্পরেই আছে। স্বাধীনতা পরবর্তী প্রত্যেকটা সরকার এই লুটেরাদের স্বার্থ রক্ষা করেই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে।
পূর্বে এই লুটেরাগোষ্ঠী রাজনৈতিক দল ও সরকারের বাইরে থেকে প্রভাব বিস্তার করতো। কিন্তু বর্তমানে এই চিত্র পাল্টে গেছে। এই লুটেরাগোষ্ঠী শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দলে সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্টিয়ারিং স্বয়ং তারা গ্রহণ করেছে। সক্রিয়ভাবে সরকার পরিচালনা করছে।
বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের শ্রেণী চরিত্র সম্পূর্ণরুপে পাল্টে লুটেরা চরিত্রে পরিবর্তিত হয়েছে। এক দুজন নেতৃত্ব মুখে মুখে দেশ প্রেমের ফেনা তুলে ফেল্লেও তারা নিজেরাও জানে এটা স্রেফ লোক দেখানো। নিজেদের অস্তিত্বটুকু ধরে রাখার জন্যই তাদের এই প্রচেষ্টা। কিন্তু তারা এটাও জানে এখন লাটাইয়ের সুতা অন্যজনের হাতে।
গত ১২ আগষ্ট ২০২২ জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের প্রতিবাদের মিছিলে পুলিশী হামলার প্রতিবাদে একটি নাগরিক সংহতি সমাবেশে অংশগ্রহণ করলাম। বক্তারা বল্লেন, গণ আদালত গঠন করে যারা জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির জন্য দায়ী তাদের বিচার করতে হবে। যারা লুটপাট করছে তাদের বিচার করতে হবে গণআদালতে! জণগণের সামনে তাদেরকে এক্সপোজ করতে হবে!
তাতে লাভটা কী ? গণআদালতের ইতিহাস আমাদের দেশে নতুন নয়! এমন বিচার আমরা আগেও করেছি। ফলাফল কী? উল্লেখ করার মতো তেমন কোন ফলাফল নেই! আজকের ক্ষমতাসীন সরকার কোন কোন সময়ে এই গণআদালতের সাথে যুক্তও থেকেছে, কিন্তু তাতে কী কোন পরিবর্তন সূচীত হয়েছে! হইনি তো!
হবার কথাও নয়। কারণ বিষয়টি ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কযুক্ত। একজন বক্তাও এই বিষয়টি কিন্তু উচ্চারণ করেননি। কেউই বলেননি এই লুটেরা ব্যবস্থাপনা উচ্ছেদ ব্যতীত এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। সবাই এই বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সমাধানের পথ খুঁজেছেন। অর্থাত তারা এই ব্যবস্থাপনাকে টিকিয়ে রেখে সমাধান চেয়েছেন।
কিন্তু এটাই বাস্তবতা যে, এই ব্যবস্থাপনাকে টিকিয়ে রেখে যদি পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা হয় সেটি একটি মিথ্যা স্বপ্ন। বর্তমানের এই লুটেরা ব্যবস্থাপনা উচ্ছেদ ব্যতীত জনগণের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব নয়। লুটপাট বন্ধ সম্ভব নয়! আমাদেরকে আওয়াজ তুলতে হবে এই ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনের জন্য। তবেই পরিবর্তন আনা সম্ভব!
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা