ডেস্ক রিপোর্ট

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৫:১২ অপরাহ্ণ

বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে শহীদের রক্ত কি বৃথা?

আপডেট টাইম : সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১ ৫:১২ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

রাশেদুজ্জামান রাশেদ ::

করোনা মহামারিতে সারা দেশের মানুষ বিপর্যস্ত। আমাদের দেশে সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থীদের জীবন হুমকীর মুখে। করোনার শুরু থেকেই হাট- বাজার, অফিস-আদালত, পরিবহন ও কল কারখানা সবকিছু খোলা ছিল কিন্তু নজিরবিহীনভাবে পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় দীর্ঘতম সময় ধরে বন্ধ রেখে, গত ১২ সেপ্টেম্বর স্কুল ও কলেজ খুলে দেওয়া হয়েছে। এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাসের দাবিতে আন্দোলন করছে। আজ থেকে ৫৯ বছর আগে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক শাসক আইয়ুব খানের চাপিয়ে দেওয়া ‘শরীফ কমিশনে’র শিক্ষানীতি প্রতিহত করতে গড়ে উঠেছিল ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন। সর্বপ্রথম স্নাতক শ্রেণীর ছাত্ররা বিক্ষোভ শুরু করে শরিফ কমিশনের বিরুদ্ধে। কারণ স্নাতক কোর্সকে ১ বছর বাড়িয়ে ৩ বছর করা হয়, এবং পাস করার ও প্রথম শ্রেণি পাওয়ার ন্যূনতম নম্বর বাড়িয়ে যথাক্রমে ৫০% ও ৭০% করা হয়। ক্রমান্বয়ে এ আন্দোলনে সাধারণ ছাত্ররা যোগ দেয় ও জনসাধারণ এতে সমর্থন যোগায়। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানি শাসন, শোষণ ও শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হন ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, বাবুলসহ নাম না জানা অনেকে। বাঙালি জাতির জন্য নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয় ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস। তবে শিক্ষার সংকট নিরসনের এখনও আন্দোলন চলছে। শিক্ষা দিবস সম্পর্কে আমাদের শিক্ষার্থীরা তেমন কিছুই জানে না। যে, “শিক্ষা দিবস” বলে একটি দিন আছে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের গণবিরোধী শিক্ষা সংকোচনমূলক নীতির প্রতিবাদে এবং একটি গণমুখী শিক্ষানীতি প্রবর্তনের দাবিতে ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতিবিজড়িত দিন এটি। শিক্ষা দিবসের ইতিহাস কেন প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠ্যপুস্তকে তুলে ধরা হয় না? যারা শিক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে রাজপথে রক্ত ঝরালেন তাদের রক্তের কি মূল্য নেই? শিক্ষা দিবস পালন করতে গিয়ে কেন পুলিশী আক্রমণের শিকার হতে হয়? স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আমাদের দেশে যতগুলো সরকার ক্ষমতায় এসেছে তাদের ছাত্রসংগঠন শিক্ষা দিবস পালনের বাধা দিয়েছে।

দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম করে আমরা পেয়েছি একটি মানচিত্র, স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি লাল-সবুজের পতাকা। পেয়েছি একটি শিক্ষা দিবস। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ দিবসটি এখন বাম প্রগতিশীলরা ছাড়া কেউ মনে রাখে না। এমন কি রাষ্ট্রীয় ভাবে দিবস টি পালন করা হয় না। যে জাতির শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যে যত বেশি দূর্বল সেই জাতি শিক্ষায় তত বেশি অনুন্নত। তাই একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিলেই হয়। আমাদের জাতিকে সেই পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি না তো?

স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আটটি শিক্ষা কমিশন বা কমিটি তার প্রতিবেদন পেশ করে। ১৯৭৪ সালে ড. কুদরাত-ই-খুদা কমিশন, ১৯৭৯ সালে কাজী জাফর অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষানীতি, ১৯৮২-৮৩ সালে ড. মজিদ খানের শিক্ষানীতি, ১৯৮৭ সালে মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট, ২০০০ সালে জাতীয় শিক্ষা নীতি, ২০০৩ সালে ড. মনিরুজ্জামান মিয়ার জাতীয় শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদন, ২০১০ সালে আবার জাতীয় শিক্ষা নীতি ঘোষিত হয়।

২০১০ সালে যে জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রণীত হয়েছিল এখনকার সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় সে নীতির সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু এ শিক্ষানীতিতেও ১৯৬৯ সালে প্রণীত ছাত্র সমাজের ১১ দফা, ১৯৮৩ ও ১৯৮৭ সালের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১০ দফা, ১৯৯০ সালের সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ১০ দফার মৌলিক দাবি আজও পূরণ হয়নি। ‘টাকা যার শিক্ষা তার’ এ মূলমন্ত্রকে ধারণ করে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগে প্রায় ১৭ শতাংশ ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষের আগে প্রায় ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। এর পেছনে অন্যতম কারণ দারিদ্র্য ও বাল্যবিয়ে। কিন্তু করোনার কারণে এসব পরিবারে দারিদ্র্য আগের চেয়েও বেড়েছে এমনকি নতুন করে অনেক পরিবার দরিদ্র হয়েছে। ফলে ঝরে পড়ার হার আরো বাড়বে এমন বিষয় আলোচনায় এসেছে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে, তা কতটা উদ্বেগজনক বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রাথমিক-মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণ ঘটেছে। মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত একই পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে বাংলাদেশের সকল নাগরিককে একই চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার সর্বজনীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বদলে মাদ্রাসা আরবি মাধ্যম, সাধারণ বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ইত্যাদি বিভিন্ন ধারার বৈষম্যমূলক শিক্ষার অপ্রতিহত প্রসার ঘটছে। এ সব বৈষম্য দূর করার বদলে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের তোয়াজ করার নীতি গ্রহণ করে বাংলা মূলধারার সাধারণ শিক্ষায় ধর্মীয় উপাদান যোগ করতে গিয়ে একে অবৈজ্ঞানিক কুসংস্করাচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িক পাঠ্যে রূপান্তর করা হচ্ছে। ফলে বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য যুক্তিবাদী শিক্ষা পাঠ্যক্রম গড়ে তোলার বদলে ধর্মীয় গোঁড়ামী ও উগ্রবাদীদের উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ারে পরিণত হয়ে শিক্ষা পাঠ্যক্রম।

মানুষ গড়ার কারখানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানেই যদি শিক্ষকেরা শিশুদের নৃশংসভাবে মারধর করেন তাহলে সেসব শিশু কি সত্যিই একদিন জাতির জন্য ভালো ভবিষ্যত হবে? মাদ্রাসায় আর কোনো শিশুকে যাতে বলাৎকার করা হয় না সেই ব্যবস্থা করতে হবে। করোনায় কত শিক্ষার্থী ঝড়ে গেল? কেন ঝড়ে গেল? তাদের বিদ্যালয়ে ফেরাতে করণীয় কি? যে শিশুরা ঝরে গেল, সে কি আর ফিরবে? যার পেটে ক্ষুধার জ্বালা পথে পথে ঘুরে তাদের জন্য রাষ্ট্রের ব্যবস্থা কি? শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। যেখানে ইউনেস্কো বলেছেন মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়তে হলে অবশ্যই দেশের বাজেটের ২৫% ও জিডিপির ৬ ভাগ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাঞ্ছনীয়। শিক্ষা দিবসের চেতনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সর্বজনীন গণমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যহীন শিক্ষানীতি চালু করতে হবে। শিক্ষা দিবস কে রাষ্ট্রীয় পালনের উদ্যোগ নিতে হবে। এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে শিশু শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে মাস্ক দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাসে প্রবেশ করে পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। দূর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে ছুটির দিনে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করা,বাল্যবিবাহ রোধে প্রশাসনের নজরদারি করা, গরিব পরিবার গুলোকে আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা দিয়ে ড্রপআউট ও শিশু অপুষ্টি দূর করতে হবে। বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-ফি মওকুফ করতে হবে। আগামী দশকে বাংলাদেশকে বিশ্বমানে পৌঁছাতে হলে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসাবে রাষ্ট্রকে বাস্তবায়ন করতে হবে।

শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ।

শেয়ার করুন