ডেস্ক রিপোর্ট

১৬ এপ্রিল ২০২১, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

করোনা: সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আইনের প্রয়োগ

আপডেট টাইম : এপ্রিল ১৬, ২০২১ ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক::

করোনা সংক্রমণ যখন চীন থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে, ব্যাপক হারে মানুষের সংক্রমণ ও মৃত্যু হতে থাকে তখন তা প্রতিরোধের জন্য স্বাস্থ্যবিধি পালন, লকডাউন, টিকা এই বিষয়গুলি সামনে আসে। বিশ্বে একে ‘বায়োালজিক্যাল ওয়ার’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়। করোনার আগ্রাসন মোকাবেলাকে যুদ্ধ হিসাবে অভিহিত করা হয়।

যুদ্ধে থাকে শত্রু-মিত্র। গ্লোবালি এই ‘বায়োলজিক্যাল ওয়ার’ এর শত্রু করোনা। এই বিধ্বংসী শত্রু থেকে মানুষকে রক্ষা করাই প্রধান উদ্দেশ্য। শত্রুর উদ্দেশ্য মানুষকে সংক্রমিত করে মৃত্যু নিশ্চিত করা, সর্বপোরি তার (করোনা) বেঁচে থাকা। কারণ মানুষের শরীরে আস্রয় গ্রহণ করেই এই ভারইরাস বেঁচে থাকে, তার মিউটেশন ঘটায়। এই যুদ্ধে বিজয় অর্জনে আমাদের অস্ত্র স্বাস্থ্যবিধি পালন, টেস্ট, ট্রেসিং, কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, টিকা সর্বশেষ লকডাউন। এই অস্ত্রটি তখনই প্রয়োগযোগ্য হয়ে উঠছে যখন অন্য অস্ত্রগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে না পারা বা প্রয়োগে ব্যর্থ হলে যে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে সেটিকে তাৎক্ষনিকভাবে মোকাবেলা করতে। কারণ তখন সামনে আর কোন বিকল্প থাকে না।

এই যুদ্ধে মারণাস্ত্রর ব্যবহার না থাকলেও এই না যে, সে ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতির সাথে বর্তমান এই ‘বায়োলজিক্যাল ওয়ার’ এর ফারাক আছে। যুদ্ধ মানেই ‘যুদ্ধ’ সেটার ধরণ যেমনই হোক না কেনো! যুদ্ধাবস্থায় মানুষের স্বাভাবিক জীবন, অর্থনীতি সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সময়ে একটি দেশের প্রধান লক্ষ্য হয় মানুষের জীবন রক্ষা করা। শত্রুর কাছ থেকে কিভাবে জীবন রক্ষা করবে সেটাই হয় তার প্রধান বিবেচ্য বিষয়, ব্যবসা বা অন্য কিছু নয়। আমরা যে তেমনি একটি যুদ্ধাবস্থার মধ্যে আছি সেটি বুঝতে আমাদের সরকার যেমন অপারগ একি রকম ভাবে জনগণও।

গতকাল শুরু হয়েছে সর্বাত্বক লকডাউন। যদিও দেশের একটি বড় অংশের মানুষের অংশগ্রহণের জায়গা গার্মেন্টস ও কলকারখানা খোলা রয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি আর সর্বাত্বক থাকলো না। জনস্বাস্থ্যবিদরা সাবধান বাণী উচ্চারণ করে যেটি বল্লেন, সরকার পূর্বের ন্যায় আবারো সেটি ইগনোর করলো। অর্থাৎ অস্ত্র যথাযথভাবে প্রয়োগের আগেই তার কার্যক্ষমতা নিজেরাই দূর্বল করে ফেল্লো। পরিণতিতে বিজয় অর্জন করার সম্ভাবনা অনেকাংশেই কমে গেল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: বে-নজির আহমেদ বলেন,‘আধা লকডাউনে ফল পাওয়া যাবে অর্ধেক, পুরোটা নয়। কঠোর স্বাস্থ্যবিধি দিয়ে স্বাস্থ্যের সদ্য বিদায়ী সচিবসহ স্বাস্থ্য বিভাগের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন, আর সেখানে পোষাক কারখানায় কীভাবে চিন্তা করা যায় যে, গার্মেন্টসে স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনার সংক্রমণ রোধ করা যাবে? এটা বিশ্বাস করা যায়? তাদের মধ্যে সংক্রমণ হবে এটা ঠেকানো যাবে না’।
আজকে অনেক গণমাধ্যম কর্মী গার্মেন্টস কারখানার স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের বিষয়টি তুলে ধরার জন্য কারখানার ভিতরে প্রবেশ করতে চেয়েছেন, তখন তাদেরকে বাঁধা প্রদান করা হয়েছে। সাংবাদিক বন্ধুগণ ভিতরে প্রবেশ করতে পারেননি। এই বাাঁধা দেওয়াই বলে দেয় তারা সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। পূর্বেই বর্তমান পরিস্থিতিকে যুদ্ধাবস্থার সাথে তুলনা করেছিলাম, যদি বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ হতো, শত্রু কামান-মেশিনগান দিয়ে গুলি করতো আমি জানি না তখনও এদেশের গার্মেন্টস মালিকরা কারখানা খুলে রাখতো কী না!! একজন গার্মেন্টস মালিক মহান বাণী দিয়েছেন,‘জীবনের আগে ব্যবসাকে সমর্থন করে আমি অবশ্যই ভুল করছি না’। ওনাদের মতো গার্মেন্টস মালিকদের মহামারীর মধ্যে ব্যবসার খায়েশ মেটানোর জন্য সরকার লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন কে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। কী নিষ্ঠুর আমাদের এই শাষকগোষ্ঠী!

এবারও লকডাউন শুরুর দুদিন আগেই হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। সরকার চাইলেই একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হলো সেটি এড়িয়ে যেতে পারতো। কিন্তু তাদের কোন পরিকল্পনা ছিলো না। গতকাল ছুটি থাকার কারণে লকডাউনের যে চিত্র ছিলো আজ আর সেটা নেই। প্রধান সড়কগুলোতে যেমন মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে, একই সাথে মহল্লার মধ্যে মানুষের মুভমেন্ট দেখে বোঝার উপায় নেই লকডাউন চলছে। কারণ এই লকডাউন বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা নেই, ফলশ্রুতিতে জনগণের অংশগ্রহণ নেই।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে অযৌক্তিক কারণে রিক্সা ওয়ালাদের নাজেহাল করা হচ্ছে, এতে রাষ্ট্রের শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গির বহিপ্রকাশ ঘটছে। আমাকে যদি টিকা গ্রহণ করতে অথবা অন্য জরুরি কাজে বের হতে হয়, আমার তো ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল বা বাইসাইকেল কোনটাই নাই, আমি যাবো কোন বাহনে? আমার একমাত্র বাহন হয় রিক্সা নয়তো সিএনজি। সুতরাং তাকে বাধাগ্রস্ত করা মানে তো সেই স্ববিরোধিতা! যার থেকে সরকার কোনভাবেই বের হতে পারছে না। লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে করার প্রয়োজনীয়তা ছিলো সরকার সেটা গ্রহণ না করেই মাঠে নেমেছে।
সংক্রমণের শুরু থেকেই প্রকৃত তথ্য গোপন করা হচ্ছে, ম্যাকানিজম করে আর্টিফিসিয়াল তথ্য তৈরি করা হয়েছে। এক পর্যায়ে সরাসরি ব্রিফিং এ গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশ্ন নেওয়া বন্ধ হয়েছে, তারপর ব্রিফিংই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তথ্য হাইড করে এবং কৃত্রিম তথ্য তৈরি করে করোনা নিয়ন্ত্রণের সফলতা প্রচার করে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের ইমেজ তৈরি হলেও এর শেষ রক্ষা হয়নি! জনগণ কে স্বাস্থ্যবিধি মানানো যাচ্ছে না তার একটি অন্যতম কারণ সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র তার সামনে অনুপস্থিত।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে বারে বারে স্ক্রিনিং টেস্ট কে মোট টেস্ট থেকে আলাদা করে দেখানোর কথা বলা হলেও সরকার সেটা করছে না। ফলশ্রুতিতে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাচ্ছে না। সরকারী হিসাবে ১৪ টি বেসরকারী হাসপাতালে করোনা রোগীর ভর্তি, সুস্থতা ও মৃত্যুর তথ্য থাকলেও এর বাইরে আরো ১১ টি বেসরকারি উল্লেখযোগ্য হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা দেয়া হলেও সেখানকার দৈনন্দিন তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। অথচ এই ১১ টি হাসপাতাল প্রতিদিনই তাদের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রেরণ করছে। বরং তাদের কে এই মর্মে সাবধান করা হয়েছে যে, তারা যেন গণমাধ্যমের কাছে কোনভাবেই তথ্য প্রকাশ না করে।

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন,‘সব হাসপাতালে রোগীর তথ্য না আসায় সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাচ্ছে না। শুরু থেকেই বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়নি। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পেলে ভবিষ্যতে রোগী ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য পরিকল্পনায় বিশাল সমস্যা হবে’। প্রতিদিন যে তথ্য ঘোষণা করা হয় তারে সাথে আরো ১১ টি হাসপাতালের তথ্য যোগ করলে বোঝা যেতো পরিস্থিতি আরো কতোটা নাজুক! কিন্তু সরকার জনগণকে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুঝতে দিতে চায় না।

‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন,২০১২’ নামে একটি আইন বিদ্যমান। এই আইনের সংজ্ঞা (২)এর (১১) তে বলা হচ্ছে,‘ ‘‘দুর্যোগ” অর্থ প্রকৃতি বা মনুষ্য সৃষ্ট অথবা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট নিম্নবর্ণিত যে কোন ঘটনা, যাহার ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা আক্রান্ত এলাকার গবাদি পশু, পাখি ও মাছসহ জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, সম্পদ, সম্পত্তি ও পরিবেশে এরুপ ক্ষতি সাধন করে অথবা এইরুপ মাত্রায় ভোগান্তির সৃষ্টি করে, যাহা মোকাবেলায় ঐ জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সম্পদ, সামর্থ্য ও সক্ষমতা যথেষ্ঠ নয় এবং যাহা মোকাবেলার জন্য ত্রান এবং বাহিরের যেকোন প্রকারের সহায়তা প্রয়োজন হয়, যথা-(ই) মহামারী সৃষ্টিকারী ব্যাধী’।

অর্থাৎ এই আইননুসারে আমরা একটা দুর্যোগের মধ্যে আছি। এই আইনের ২২(১) ধারায় বলা হচ্ছে,‘রাষ্ট্রপতি স্বীয় বিবেচনায় বা ক্ষেত্র মত, উপধারা (৩) এর অধীন সুপারিশ প্রাপ্তির পর, যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, দেশের কোন অঞ্চলে দুর্যোগের ঘটনা ঘটিয়াছে যাহা মোকাবিলায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং অধিকতর ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয় রোধে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করা জরুরি ও আবশ্যক, তাহা হইলে সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা হিসাবে ঘোষণা করিতে পারিবেন’।

একই রকম ভাবে এই আইনের আওতায় দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ১৪(১) ধারা অনুযায়ি জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় গ্রুপ গঠন (সকল মন্ত্রণালয়,সব বাহিনীর প্রধান) করে মোকাবেলা করার কথা বলা হয়েছে। আইনের ১৪(২) ধারা অনুসারে প্রয়োজনে যেকোন ব্যক্তিকে উক্ত গ্রুপের সদস্য হিসাবে কো-অপ্ট করতে পারবেন। সে মোতাবেক সকল রাজনৈতিক দলের সদস্যদের সমন্বয়ে দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য একটি জাতীয় কমিটি করা যেতে পারে। সমস্যা হচ্ছে সরকার আইনের প্রয়োগ ঘটাচ্ছে না, এটা এক প্রকার সংবিধান বিরুদ্ধ কাজ। তাদের একটি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেই যত আগ্রহ ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’।

দেশে সংক্রমক রোগ (প্রতিরোধ,নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন,২০১৮ অনুসারে ৫(১) এর (গ) তে বলা হচ্ছে,‘জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলা এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাসকরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ’। তার ধারাবাহিকতায় সরকার লকডাউন বাস্তবায়ন করছে। প্রশ্ন হচ্ছে যেখানে লকডাউন বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেই এলাকার মধ্যে অবস্থিত শিল্পকারখানা সব কিছুই বন্ধ থাকবে। আর যদি খোলা থাকে তবে আইন অনুসারে উক্ত এলাকাকে ঝুঁকিমুক্ত এলাকা হিসাবে ঘোষণা করতে হবে। সরকার সেটি করেনি। সরকার আইনের এই ধারা স্পষ্টতই লঙ্ঘন করছে। একই সাথে আইনের প্রয়োগ সাংবিধানিকভাবে সবার জন্য সমান। এখানেও শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গির বহিপ্রকাশ!!

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিদ্যমান যে আইন আছে সেটির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করুন, জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করুন তবেই বিজয় অর্জন হওয়ার সম্ভবনা তৈরি হতে পারে! লকডাউন সফলভাবে কার্যকর করার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শ্রমজীবী মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করুন।

লেখক : সাবেক সভাপতি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যুব পরিষদ

 

শেয়ার করুন