ডেস্ক রিপোর্ট

২০ জুন ২০২১, ১১:৫০ অপরাহ্ণ

বাবা দিবসে রক্তিম ভালোবাসা

আপডেট টাইম : জুন ২০, ২০২১ ১১:৫০ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

লেখক: রাশেদ ইসলাম

কোভিড-১৯ এর কারনে বাবা দিবসে অনেক সন্তানেরাই বাড়িতে থেকে বাবা দিবস পালন করছেন।বাবা মানে বটবৃক্ষের ছায়া। বাবা মানে নির্ভরতা ও পরম আশ্রয়ের চরম ছায়া। তিনি আগলে রাখেন আমাদের। সকল কষ্টকে নিজের সহ্যের সীমার মধ্যে নিয়ে ভালোবাসা ও স্নেহের কোনো কমতিই উপলব্ধি করতে দেন না আমাদের। শত কষ্টের মাঝেও তিনি আমাদের সুখে রাখেন।

শাস্ত্রে বলা হয়-‘পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম পিতাহী পরমং তপঃ। পিতরী প্রিতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্ব দেবতা।’ এর অর্থ-‘পিতাই ধর্ম, পিতাই স্বর্গ, পিতাই পরম তপস্যা।

সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসা চিরকালের।’ বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের প্রতিদিন হলেও ২০ জুন তারিখ টি অন্যতম। প্রতিবছর জুনের তৃতীয় রোববার বিশ্বব্যাপী বাবা দিবস উদ্যাপিত হয়।

বিশ্বের সব বাবার প্রতি ভালোবাসা জানাচ্ছেন সন্তানরা। ভালোবেসে উপহারও দেবেন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম সহ সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওয়ালগুলো ভরে গেছে প্রিয় বাবার ছবিতে। যাদের বাবা বেঁচে আছেন তারা আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ছবি আপলোড করতেছেন। আর যাদের বাবা নেই, তারা বাবার ছবি পোস্ট করে বাবাকে নিয়ে লিখে স্মৃতিচারণ করবছেন।

করোনায় পৃথিবীর অনেক বাবা কঠিক সংকটে দিনাতিপাত করছেন নিজে ও পরিবারের বাঁচাতে কঠোর পরিশ্রমে সময় কাটাচ্ছেন। কেউ কাজ হারিয়ে মানবতার জীবন- যাপন করছেন। দারিদ্র্যতায় সন্তানকে নিয়ে যাচ্ছেন শিশু শ্রমে। আবার কেউবা রেখেছেন বাবাকে বিদ্যাশ্রমে।

মা- বাবা আর দাদিকে নিয়ে ছয় সদস্য আমাদের পরিবার। বাবা কৃষকনেতা, ছোট থেকে দেখে আসতেছি তিনি লাল পতাকা নিয়ে কৃষক, শ্রমিক ও হতদরিদ্র মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথে মিছিল করেন।

মাকে প্রশ্ন করতাম বাবা যে মিছিল করে তাতে লাভ কি? খানিকক্ষণ মা চুপ থেকে রেগে বলতো তোর বাবাই ভালো জানে। গ্রামে সবাই বলতো এই দল কোন দিন ক্ষমতায় যেতে পারবে না করে কি লাভ। শুধু সংসার টা ধ্বংস করা ছাড়া আর কিছুই না।

গ্রীষ্মকালে গরমে গাছের ছায়ায় নিচে বসে বাবা প্রতিনিয়ত বই পড়তেন। মাক্সবাদ কেন জানব, ছোটদের রাজনীতি, অর্থনীতি, মানব সৃষ্টির ইতিহাস প্রগতিশীল বা বাম চিন্তা ধারার বই গুলোতে তিনি বেশি সময় দিতেন। মায়ের ইচ্ছে এভাবে সময় নষ্ট না করে সংসারে কাজে সারাক্ষণ সময় দিলেই মা খুশি।

গ্রামে কৃষকদের নিয়ে উঠান বৈঠক করতেন। কৃষকেরা সমাজের দেবতা অথচ কৃষকেরাই শোষিত হয় বেশি।কৃষক যা উৎপাদন করেন তার ন্যায্য মূল্য নেই। কৃষকের উৎপাদিত ফসল যখন বড় বড় চাতাল মালিকের কাছে পৌঁছে তখন মূল্য বেড়ে যায়। এ আবার কেমন পদ্ধতি? একই পণ্য হাতের অদলবদলে বাজার মূল্য পরিবর্তন।

সন্ধ্যায় বাজারে কৃষি পণ্যের ন্যায্য দাবিতে কৃষকদের নিয়ে মিছিল করেন।স্লোগান দিতেন, কেউ খাবে কেউ খাবে না তা হবে না তা হবে। কৃষি বাঁচাও দেশ বাঁচাও!

রংপুর জেলা সমন্বয়ক কমরেড আব্দুল কুদ্দুস। আমাদের বাড়িতে আসতেন। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষের সংকট কি?সেই সংকটে দাবি কিকি ভালো করে বুঝায় দিতে বলতে তিনি বাবার রাজনৈতিক শিক্ষক।

রাজনৈতিক পাঠচক্রে বাবা তিন দিনের জন্য ঢাকায় গিয়েছিলেন।কবে আসবেন কি করছে এমন তথ্য জানার জন্য মা বাবাকে ফোন দিতেন। তিনি ফোন রিসিভ করতেন না।পরিবারের সবাই আমরা খুবেই চিন্তিত থাকতাম। দাদি বলে, অপরিচিত লোকের সাথে ঢাকায় যাওয়া উচিত হয়নি।কালো অন্ধকারে ঘন মেঘ যেন নেমে আসে হতাশার ছায়া। দুদিন পর রাতে ফোন যোগাযোগ হয়। তখন বাড়ির সবাই চিন্তা মুক্ত অবস্থায় শান্তিতে থাকি।

বাবা রাজনীতি করার কারনে সংসার করবেন না এমন হুশিয়ারী সংকেত দিতেন।তিনি একটুও সহ্য করতে পারে না বাবার রাজনীতি করা।তাই বলে তো তার সন্তানকে ছেড়ে কি আর যেতে পারেন। তবুও বাবা ওনার মতোই আদর্শিক পড়াশুনা আর সংগঠনকে কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাও যায় সেই চিন্তায় ব্যস্ত থাকতেন।

তোমার আব্বার পার্টি তো কোনো দিন ক্ষমতায় যাবে না, এমন পার্টি করে কী লাভ? এমন অনেক প্রশ্ন শুনতে পেতাম।বাবাকে আমিও তাই প্রায়ই জিজ্ঞাসা করতাম, পার্টি করে কী লাভ? হাসিমুখে শুধু বলতেন- লাভের জন্য তো পার্টি করি না, মানুষের জন্য করি।
এমন উত্তরে সন্তুষ্ট না হলেও আর বেশি মাথা ঘামাতাম না। তবে বাবার এই ‘পার্টি করার’ কারণে শৈশবে আমার কিছু আবছা স্মৃতি তৈরি হয়েছে, যা অজান্তেই আমার মনে বামপন্থী রাজনীতির প্রতি ভালোবাসার জাল তৈরী হয়েছে।

আরেকটা কারণে আমার বাবার পার্টি করা নিয়ে আত্মীয়-পরিজনের তিরস্কার শুনতে হয়েছে। তা হলো, এই পার্টি করার কারণে নাকি আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বর কোনো কিছু বিশ্বাস করেন না। আমার শৈশবে আশপাশে খুব নিষ্ঠাবান ধার্মিক পরিবার খুব চোখে পড়েনি আমার। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে দেখতাম সাধারণত পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের। বাবার বয়সী পুরুষদের ধর্মচর্চা সাধারণত শুক্রবার জুম্মার নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

বাবা করতেন না বলে মা দুঃখ করতেন প্রায়ই। এ নিয়ে প্রশ্ন করলে বাবা যথারীতি হাসিমুখে উত্তর, তোর মা পড়ুক না নামাজ, আমি কি তাকে নিষেধ করছি? ধর্ম একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।

বাবাই আমাকে পথ দেখায় যে সমাজের মধ্যে কত ধরনের মানুষ তার অধিকার থেকে বঞ্চিত কত মানুষ নির্বিকার জীবন যাপন করে। কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। ধনী গরিবের বৈষম্য গাণিতিক হারে বাড়তেছে। দুই বুর্জুয়া শ্রেণির দলে বাইরে মানুষের মুক্তি হিসাবে বাসদের ও বামজোটের মই মার্কায় প্রতিক নিয়ে আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহন করা। কিন্তু পৃথিবীর নজিরবিহীন এক প্রহসনের নির্বাচন দেখেছি।

পৃথিবীর সকল লয় থেকে একমাত্র রক্ষা কবচ। যে রক্ষা কবচ আছে বলেই আজ মানব সন্তান এত লালিত পালিত হয়ে ধরণী জুড়ে প্রাণচঞ্চল হয়ে পদচিহ্ন ফেলছে। যার দরাজ কন্ঠের ডাকে দরজায় পাশে দাঁড়িয়ে উঁকি দেয় সকল মানবসন্তান। যিনি কোনো প্রতিদানের জন্য ভালোবাসেন না। ভালোবাসেন আত্মার টানে, ভালোবাসার স্নেহের আবেশে, ভালোবাসেন কর্তব্যের চেয়ে অধিকারের পরশে, ভালোবাসেন অভিভাকত্বের সুরে। তিনি হচ্ছেন একমাত্র বাবা। করোনা মহামারী থেকে রক্ষা পেতে প্রত্যেক সন্তানের বাবার মতই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাকেই দিয়ে সুস্থ রাখা। বাবা দিবসে বিশ্বে সকল বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

শেয়ার করুন