ডেস্ক রিপোর্ট
২১ জানুয়ারি ২০২৪, ১১:২৩ অপরাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক: সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠার ৪ দশক পূর্তি উপলক্ষে বছরব্যাপী আয়োজনের উদ্বোধনী কর্মসচির অংশ হিসেবে আজ ২১ জানুয়ারি ২০২৪, রবিবার, সকাল ১১:৩০টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ এর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিনের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তৃতা রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ। আরও বক্তব্য রাখেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি সুস্মিতা মরিয়ম, সাংগঠনিক সম্পাদক সম্পাদক সুহাইল আহমেদ শুভ, দপ্তর সম্পাদক অনিক কুমার দাস, অর্থ সম্পাদক সুলতানা আক্তার, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হারুন-অর-রশিদ।
সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, আজ ২১ জানুয়ারি ২০২৪ ছাত্র সমাজের অগ্রবর্তী চিন্তার পথিকৃৎ সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠার চার দশক। আজ থেকে ৪০ বছর আগে সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক সেক্যুলার বৈষম্যহীন একই পদ্ধতির গণতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের সংগ্রামের প্রত্যয় ঘোষণা করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট যাত্রা শুরু করে। নানা চড়াই উত্তাই পেরিয়ে সংগ্রামমুখর ৪০ বছর অতিক্রম করছে আমাদের প্রাণপ্রিয় এই সংগঠন। এ সংগ্রামে যারা সহযাত্রী ছিলেন এবং যারা নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন, সংগঠনের প্রতিষ্ঠা দিবসের শুভলগ্নে সকলকে জানাই সংগ্রামী শুভেচ্ছা ও বিপ্লবী অভিনন্দন।
আমরা যখন সংগঠনের চল্লিশ বছর পালন করছি তখন দেশের মানুষ এক চরম সংকটে দিনাতিপাত করছে। দীর্ঘ পনেরো বছর একটানা ক্ষমতায় থাকার পর দেশবাসীর মত উপেক্ষা করে গত ৭ জানুয়ারি একতরফা ‘ডামি’ নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতার নবায়ন করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন দীর্ঘায়িত করতে যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দেশের মানুষ দিশেহারা। ১২ কোটি মানুষ পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত। দেশের অর্থনৈতিক সংকট চরমে। রিজার্ভ ক্রমাগত কমছে। বেকারত্বের অভিশাপে ছাত্র যুবকদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। বিরোধী মত-পথ দমনের জন্য সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইন জারি করেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, খুন, নারী-শিশু নির্যাতন, টাকা পাচার, সীমাহীন লুটপাট, ব্যাংক লোপাট ও ও দুর্নীতি চলছে অবাধে। পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের উপর চলছে নির্বিচারে গুম, হত্যা, নির্যাতন ও ভূমি দখল। সীমান্তে চলছে মানুষ হত্যা। সর্বগ্রাসী এক সংকটে দেশ নিমজ্জিত হতে চলেছে।
স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর দেশের শিক্ষার হালচিত্রটি কেমন? বর্তমান শিক্ষার প্রধান ধারা বেসরকারি ও বাণিজ্যিক ধারা। এক কথায় বলা যায় ‘টাকা যার শিক্ষা তার’ এই নীতিতেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদে একই পদ্ধতির শিক্ষার কথা বললেও এখানে চলছে সাধারণ, ইংরেজি মাধ্যম, কারিগরি, ক্যাডেট ও মাদ্রাসা শিক্ষা নামক বিভিন্ন ধারা। সরকার প্রাথমিক স্তরে সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বললেও চিত্র ঠিক উল্টো। ‘ব্যানবেইস ২০১৯ এর রিপোর্ট অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের পূর্বে প্রায় ১৮% শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণী সমাপ্তের আগে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর প্রায় ৩৮% এবং দ্বাদশ শ্রেণী সম্পূর্ণ করার পূর্বেই উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীর প্রায় ২০% শিক্ষার্থী শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়ে অর্থাৎ গড়ে প্রায় ৭০% শিক্ষার্থী দ্বাদশ শ্রেণী সম্পূর্ণ করার পূর্বেই বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে’। এই ঝরে পড়ার কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায় এর মূল কারণ হচ্ছে দারিদ্র্য, আর্থিক অস্বচ্ছলতা।
সংগ্রামী বন্ধুগণ, ২০২৩ থেকে চালু করা হয়েছে শিক্ষাক্রম ২০২১। কোন প্রকার প্রস্তুতি ও আয়োজন ব্যতিরেকে শিক্ষার্থীদের উপর চাপানো হল এই কারিকুলাম। ফলত, ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকেরা পড়ছেন বিপাকে। শিক্ষানুরাগী মানুষের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকসহ দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের মতামত নিয়ে শিক্ষাক্রমের মূল্যায়ন ও পরিমার্জন করার। কিন্তু সরকার সেদিকে কর্ণপাত করছেন না। নতুন কারিকুলামের আঙ্গিকে নতুন বই জানুয়ারির ১ তারিখে দেয়া হয়েছে। ভুলে ভরা, নিম্নমানের পাঠ্যপুস্তক দেয়া হচ্ছে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের হাতে। ইতিমধ্যেই মুদ্রণবিভ্রাটের কারণে সাতক্ষীরা থেকে ৩১ হাজার বই ফেরত নেয়া হয়েছে। এহেন দায়িত্বহীন। কাজ শিশু-কিশোরদের মনে দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষত তৈরি করবে।
শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ-বেসরকারিকরণ নীতির ফলে উচ্চ শিক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি ঘটছে তীব্র আকারে। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৫৭টি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১১৩টি। উচ্চশিক্ষায় অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে অর্থের বিনিময়ে সার্টিফিকেট কিনতে হচ্ছে। জনগণকে জিম্মি করে চলছে শিক্ষার রমরমা ব্যবসা। ইউনেস্কো শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ ভাগ বরাদ্দের কথা বললেও এ বছর আমাদের বরাদ্দ মাত্র ১.৭৬ শতাংশ, যেটি গতবারের চেয়ে ০৭ শতাংশ কম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। ক্যাম্পাসগুলিতে শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের দ্বারা গণরুম-গেস্টরুম নির্যাতন এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ ও শিক্ষার গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ৪ দশকে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট শিক্ষার বেসরকারিকরণ-বাণিজ্যিকীকরণ, ফি বৃদ্ধি, শিক্ষা সংকোচনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রণীত সকল শিক্ষানীতি বিশ্লেষণ করে শাসকশ্রেণির শিক্ষা সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির গণবিরোধী রূপ উন্মোচন করেছে ছাত্র ফ্রন্ট। পাশাপাশি ‘শিক্ষা নীতি ও শিক্ষা সংকট প্রসঙ্গে’ বই প্রকাশ করে সারাদেশে সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক সেক্যুলার বৈষম্যহীন একই পদ্ধতির (one channel of education) গণতান্ত্রিক শিক্ষানীতির রূপরেখা তুলে ধরে সারাদেশে প্রচার এবং ৬ দিনব্যাপী শিক্ষা সম্মেলন করে দেশের প্রথিতযশা শিক্ষক, শিক্ষাবিদদের মতামত নিয়ে ‘শিক্ষা স্মারকগ্রন্থ’ প্রকাশ করা হয়েছে। যা শিক্ষা আন্দোলনের এক অমূল্য দলিল হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ ৬ দফা দাবিতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট তুলে ধরে স্বতন্ত্র পরীক্ষা হল নির্মাণসহ ৮ দফা দাবিতে, স্কুল শিক্ষার সংকট তুলে ধরে দশ দফা দাবিতে এবং পলিটেকনিক এর ৫ দফা দাবিতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন পরিচালনা করে আসছে ছাত্র ফ্রন্ট। ছাত্র রাজনীতি বন্ধের চক্রান্ত ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করেছি। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব, নির্যাতন, স্বৈরাচার ও মৌলবাদী আক্রমণসহ দেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে গিয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের অসংখ্য নেতাকর্মী গ্রেফতার, নির্যাতন ও হামলার শিকার হয়েছেন।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট মনে করে শিক্ষার সংকট সমাজের অপরাপর সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবন চরম অভাব-দারিদ্র আর বৈষম্য-বঞ্চনার ভারে পিষ্ট। তাই শিক্ষা আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতিতে একটি শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠারই সংগ্রাম। চল্লিশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ সংগ্রামমুখর মুহুর্তে ছাত্র-শিক্ষকসহ দেশবাসীর প্রতি আমাদের আহ্বান শিক্ষা-সংস্কৃতি-মনুষ্যত্ব রক্ষার এই সংগ্রাম শক্তিশালী করুন। দেশের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন রুখে দিতে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলুন।
অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে উদ্বোধনী বেলুন উড়িয়ে ৪ দশক পূর্তি উপলক্ষে উদ্বোধনী ছাত্র সমাবেশ ও বছরব্যাপী আয়োজনের কর্মসূচী ঘোষণা করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ।
কর্মসূচিসমূহ :
মার্চ-এপ্রিলে ’২৪ জেলায় জেলায় বিজ্ঞান উৎসব ও স্কুল উৎসবের আয়োজন। ২৪ জুলাই ’২৪ স্কুল কনভেনশন কেন্দ্রীয় ও জেলায় জেলায় আয়োজন। ২৭ আগস্ট ’২৪ উচ্চ শিক্ষা কনভেনশন কেন্দ্রীয় ও জেলায় জেলায় আয়োজনসহ দাবিভিত্তিক ধারাবাহিক সভা-সমাবেশের আয়োজনের মধ্যে দিয়ে আগামী ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিশাল ছাত্র সমাবেশের মধ্যে দিয়ে ৪ দশকের সমাপনী অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত কর্মসূচিসমূহে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও সকলের আর্থিক ও শারীরিক সহযোগিতাসহ অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করছে সংগঠন।