ডেস্ক রিপোর্ট

৭ অক্টোবর ২০২৩, ১১:১৩ অপরাহ্ণ

শ্রমিকের মজুরি ও জীবনমান

আপডেট টাইম : অক্টোবর ৭, ২০২৩ ১১:১৩ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

রাজেকুজ্জামান রতন:

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় পুরোটাই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। গত অর্থবছরে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৫ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলার। এই আয় আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। আবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এই রপ্তানি আয়ের মধ্যে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি ডলার। তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি। রপ্তানি ক্রমাগত বাড়ছে এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দেখে তৈরি পোশাকশিল্পকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন মালিকরা। এই শিল্পের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শ্রমিকের শ্রম এবং মূল্য সংযোজন। কাঁচামালের বিরাট অংশ আমদানি করা হয় এবং শ্রমিকের শ্রমে মূল্য সংযোজিত হয়ে তা আবার রপ্তানি করা হয়। এই খাত ক্রমে সম্প্রসারিত হচ্ছে, রপ্তানির পরিমাণ বাড়ছে, মালিকদের আয় এবং সম্পদ বাড়ছে, কিন্তু মজুরি নিয়ে শ্রমিকের অসন্তোষ কমছে না।

তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা এখন কারখানাকে সবুজে রূপান্তর করছেন। দেশের ছোট-বড় ৪০৩টি বস্ত্র ও পোশাক কারখানার মালিক-শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে সিপিডি। এতে দেখা যাচ্ছে, বস্ত্র ও পোশাক কারখানা মালিকদের মধ্যে যারা এটি করেছেন তাদের মধ্যে ৬৯ দশমিক ৭০ শতাংশই করেছেন স্বপ্রণোদিত হয়ে। এ ছাড়া ৫৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ কারখানা সবুজ হয়েছে মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির কারণে। ৩৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ সবুজ হয়েছে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য। ইতিমধ্যে দেশের অনেক কারখানা সবুজে রূপান্তর করা এবং মান উন্নত করায় অনেক কারখানা বিদেশি সনদপত্র ও স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু কারখানার মান ও কাজের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন যেমন আছে, তেমনি উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে শ্রমিকদের জীবনমান নিয়ে। কারখানা সবুজ হলেও শ্রমিকদের জীবন যেন ধূসর।

প্রতিদিন শ্রমিক যা খায়, যা পরিধান করে, যেখানে ঘুমায়, যে পরিবহন ব্যবহার করে, ওষুধ খায় সেসব কিছুই শ্রমিকের শ্রমে তৈরি। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের শ্রমজীবীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৩৪ লাখ ১০ হাজার। বাংলাদেশের এই ৭ কোটি শ্রমজীবী তাদের শ্রম দিয়ে, যা উৎপাদন করেন আর প্রায় ৪০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক যে পোশাক তৈরি করেন তা শুধু দেশের মানুষ ভোগ করেন তা নয়, সারাবিশে^র অনেক দেশের মানুষের কাজে লাগে। সে কারণেই বলা হয়, পোশাক তৈরি হয় দেশে কিন্তু ব্যবহৃত হয় বিশ^ বাজারের পণ্য হিসেবে। শ্রমিকের শ্রমে উৎপাদন হয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও গার্মেন্টস শ্রমিকসহ শ্রমজীবীদের ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন উঠলেই নানা অজুহাতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে আড়াল করার চেষ্টা চলে। বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পর মজুরি নির্ধারণ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো পাঁচ বছরে দ্রব্যমূল্য, টাকার মান, জীবনযাত্রার ব্যয় এক জায়গায় স্থির থাকে না।

যে কোনো উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শ্রমিকের শ্রমশক্তি। এটা তো সবাই মানেন যে, কারখানায় যত বেশি পুঁজি, যত উন্নতমানের কাঁচামাল এবং যত উন্নত প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হোক না কেন, শ্রমিকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শ্রম ছাড়া কোনো উৎপাদন সম্ভব হয় না। পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকের শ্রমশক্তি আর মালিকের পুঁজি এই দুই মিলেই উৎপাদন হয়। শ্রমশক্তি বিক্রির আর্থিক মূল্যটাই শ্রমিক মজুরি হিসেবে গ্রহণ করে। শ্রমিকের শ্রমশক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচের একটা অংশ মজুরি। শ্রমিককে মজুরি দিয়ে উৎপাদন করিয়ে নেওয়া পণ্য উৎপাদন খরচের চেয়ে বাড়তি দামে বিক্রির মাধ্যমে মালিকের মুনাফা অর্জিত হয়। ফলে শ্রমিকের মজুরি যত কম দিতে পারে মালিকের মুনাফা তত বৃদ্ধি পায়। কাজের বিনিময়ে শ্রমিক যে মজুরি পায় তা দিয়ে সে তার জীবনধারণের জন্য শুধু পণ্যসামগ্রী কেনে তাই নয় বরং নানা ধরনের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের কাজে ব্যবহার করে। সুস্থ এবং সবল শ্রমিক যেমন উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে তেমনি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পরবর্তী প্রজন্মের দক্ষ শ্রমশক্তি শ্রমজীবীদের মাধ্যমেই আসে। তাই শ্রমিকদের মজুরির ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান সময় নয়, সমাজের ভবিষ্যতের কথাও বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে একটি নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। জিডিপি গড়ে ৭ শতাংশের মতো করে বাড়ছে, মাথাপিছু আয় ২৭৯৩ ডলারে উন্নীত হয়েছে এবং এটা প্রতিবছরই বাড়ছে। তাই জাতীয় আয় এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালনকারী শ্রমিকদের মজুরি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সংগতি রেখে নির্ধারণ করা হবে, এটা শ্রমজীবীদের একটি যুক্তিসঙ্গত প্রত্যাশা।

একটি পরিবারের টিকে থাকার সামগ্রী দিয়ে নিম্নতম মজুরির হিসাব করা হয়। তাই নিম্নতম মজুরি কোনো যুক্তিতেই দারিদ্র্যসীমার আয়ের নিচে হতে পারে না। বাংলাদেশ সরকারের ‘পারিবারিক আয় ও ব্যয় জরিপ’ই এ বিষয়ে তথ্যেকে উৎস হিসেবে ধরলে একটা সাধারণ হিসাব পাওয়া যাবে। এর সর্বশেষ প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে গড় কিলোক্যালরি ভোগ মাথাপিছু দৈনিক ২ হাজার ৩৯৩। শক্তি আসবে খাদ্য থেকে তাই এই পরিমাণ শক্তি পেতে হলে বিভিন্ন পণ্যের গড় ভোগের পরিমাণও দেখানো হয়েছে। পণ্যগুলো হলো মোটা চাল, গম, ডাল, দুধ, তেল, মাংস, মাছ, আলু, সবজি, চিনি ও ফল। যদিও শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রোটিনের সহজ উৎস ডিমকে হিসাবে ধরা হয়নি। পুরুষ শ্রমিকদের কাজের ধরন অনুযায়ী দিনে প্রয়োজনীয় কিলোক্যালরি লাগে কমপক্ষে তিন হাজার আর নারী শ্রমিকদের গড়ে প্রয়োজন ২৪০০ কিলোক্যালরি। শ্রমিকরা যদি এই পরিমাণ শক্তি পেতে চায় তাহলে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী খাবারের খরচ প্রয়োজন হবে চারজনের পরিবারে ২২ হাজার থেকে ২৪ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির খরচ, পরিবহন খরচ, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, মোবাইল ফোন ব্যবহারের খরচ, আপ্যায়ন, বিনোদন ইত্যাদি। এসব খরচ কম করে করলেও তার জন্য ঢাকার বাইরে ৪০ হাজার টাকা এবং ঢাকায় প্রায় ৫০ হাজার টাকা প্রয়োজন। অন্যান্য শিল্প এবং মালিকদের সক্ষমতা বিবেচনা করে বেশির ভাগ শ্রমিক সংগঠন মজুরি দাবি করেছে ২৩ হাজার টাকা এবং কোনো কোনো সংগঠন ২৫ হাজার টাকা দাবি করেছে।

শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ন্যায্য মজুরির দাবি তুললেই সেই দাবিকে প্রথমে ‘অযৌক্তিক’ বলে বাতিল করার চেষ্টা করা হয়। তারপর বলা হয়, মজুরি বৃদ্ধি করলে দেশে গার্মেন্টস শিল্প থাকবে না। কিন্তু প্রতিবার মজুরি বৃদ্ধির পর গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংস হয়নি বরং রপ্তানি বেড়েছে। ২০১০ সালে তীব্র আন্দোলন হয়, ফলে মজুরি ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু রপ্তানি কমেনি বরং ২০১৩ সালে গার্মেন্টস খাতে রপ্তানি আয় হয় ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০১৫ সাল থেকে আন্দোলনের পর ২০১৮ সাল নাগাদ মজুরি বৃদ্ধির সময় রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। ২০১৮ সালে ৮ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ করা হয়, যা ২০১৯ সাল থেকে কার্যকর হচ্ছে। বর্তমানে গার্মেন্টসে রপ্তানি আয় ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি ডলার। মজুরি বৃদ্ধির পরও বাজার হারায়নি, রপ্তানি কমেনি বরং মুনাফা বেড়েছে। ২০১৮ সালের পর পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি। গত ১০ এপ্রিল গঠিত মজুরি বোর্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে আগামী ৯ অক্টোবর। শ্রম আইন অনুযায়ী মজুরি বোর্ড গঠনের ৬ মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত মজুরি কাঠামো ঘোষণা করার কথা। মূল্য বৃদ্ধির কারণে ২০১৮ সালে নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ২০২৩ সালে এসে প্রকৃত মূল্যে ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে প্রায় অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শ্রমিক এবং তাদের সন্তানরা অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। অথচ এই শ্রমিকদের শ্রমে ঘামে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় প্রতিবছরই বাড়ছে। বিগত বছরগুলোতে শ্রমিকদের আয় বাড়েনি, কিন্তু ডলারের বিনিময়ে টাকার দাম কমে যাওয়ায় মালিকপক্ষ গত এক বছরে বাড়তি পেয়েছে ৯০ হাজার কোটি টাকার বেশি। ফলে শ্রমিকের প্রত্যাশা অনুযায়ী মজুরি দিলে মালিকের লোকসান হবে না কিন্তু উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে পারবে। তা না হলে রপ্তানি বাড়বে, সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে অসন্তোষ। আর উন্নয়নের পেছনে থাকবে বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ^াস যা জন্ম দেবে বিক্ষোভের।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন