ডেস্ক রিপোর্ট
৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ
রাজেকুজ্জামান রতন::
রাজপথে রাজনৈতিক উত্তেজনা আর বাজারে মূল্যবৃদ্ধির আঘাত। জীবনযাপন আর দিনযাপন দুটোই কঠিন হয়ে পড়ছে দিন দিন। অন্যদিকে রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে বাজারে এবং বাজারদরে। জ্বালানি তেলের দামের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি, ভোজ্য তেলের সর্বাধিক দাম, চালের বাজারে অস্থিরতা, ডিম নিয়ে কারসাজি, বেসরকারিভাবে সর্বাধিক দামে ডলার কেনাবেচা সবকিছুতেই নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। তবে এই রেকর্ড আনন্দের নয় আতঙ্কের। আতঙ্ক জীবনযাপনের ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয় না বাড়ার, সামনের দিনগুলো কেমন আসবে, কীভাবে সামাল দেওয়া যাবে শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যয়ভার, বাসাভাড়া আর পরিবহন খরচ? ফলে প্রতিদিন মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ে টান ধরছে আর দরিদ্ররা পথ বের করতে চাইছে কোনোমতে দিন পার করার।
দাম বাড়ছে শুধু নয়, চালের বাজারে চালবাজি, তেলের বাজারে তেলেসমাতি, ডিম নিয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড, দেশে উৎপাদিত সবজি থেকে শুরু করে আমদানি করা চিনি পর্যন্ত সবকিছু নিয়ে চলছে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিযোগিতা। রড-সিমেন্টও বাদ পড়ছে না তালিকা থেকে। এসব তদারকি করার কথা যে প্রতিষ্ঠানের সেই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তৎপরতা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না দাম বরং ১৫ দিনে ভোজ্য তেল থেকে ১৫০০ কোটি টাকা কিংবা ডিম থেকে ৫৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করার কথা মানুষ জেনেছে। তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধিতে যেখানে কেজিপ্রতি চালের দাম ৫০ পয়সা বাড়ার কথা, সেখানে বেড়েছে ৫ টাকা অর্থাৎ ১০ গুণেরও বেশি। ২০ টাকার সবজির দাম ঢাকায় এসে কেন ৪০-/৫০ টাকা হয়ে যায় তার কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা নেই। মানুষ কিনছে, ফলে কর্তাব্যক্তিরা ভাবছেন মানুষ তো মেনে নিয়েছে এবং তারা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন মানুষের আয় বেড়েছে তো, তাই কোনো সমস্যা হচ্ছে না!
আমরা ভালো আছি, ভালো আছি ইউরোপ আমেরিকার অনেক দেশের তুলনায় ক্ষমতাসীনদের মুখে এসব কথা মানুষ শোনে কিন্তু বিশ্বাস করে কি না বা ভরসা পায় কি না তা বলা মুশকিল। শাসক দলের নেতারা বলেন, মানুষ যদি কষ্টে থাকত তাহলে তো রাস্তায় নামত। কই মানুষ তো কিছু বলে না! আসলে তারা ভালো আছে কারণ আয় বেড়েছে তাদের। একজন আবেগের চোটে বলেই ফেললেন, অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে মনে হবে বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে। এসব তো ক্ষমতাসীনদের কথা। বাস্তবে অল্পকিছু মানুষ সুখে থাকলেও আমজনতা যে কষ্টে আছে তা মুখ ফুটে বলতে হবে না কারও।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে নানা জরিপ হচ্ছে, কিন্তু জরিপের সঙ্গে জীবনের মিল থাকছে না। মূল্যস্ফীতি কেন হয় সে বিষয়ে দুই ধরনের মত রয়েছে। অর্থের পরিমাণ তত্ত্ব এবং বাড়তি চাহিদা তত্ত্ব। প্রথমটির ব্যাখ্যা হচ্ছে, বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়লে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ে। তাতে পণ্য আগের মতোই থাকে, কিন্তু মানুষের হাতে টাকা বেড়ে যায়। যে কথা ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী আর নেতাদের মুখ থেকে আমরা অহরহ শুনতে পাচ্ছি। মানুষের আয় অনেক বেড়েছে তাই জিনিসের দাম বাড়লেও মানুষের কষ্ট হচ্ছে না, কেউ না খেয়ে মারা যাচ্ছে না ইত্যাদি। অন্যদিকে বাড়তি চাহিদা তত্ত্ব অনুযায়ী বলা হয় অর্থ ও পণ্য উৎপাদন আগের মতোই আছে, কিন্তু মানুষ বেড়ে গেছে ফলে চাহিদা বেড়েছে। মানুষ খালি পায়ে হাঁটছে না, খালি গায়ে চলছে না, খরচ করছে এবং কিনছে বেশি, এসব কারণে মূল্যস্ফীতি ঘটছে।
আবার কারণ হিসেবেও মূল্যস্ফীতি দুই ধরনের। যেমন : চাহিদা বাড়লে যে মূল্যস্ফীতি হয়, তাকে বলে চাহিদাজনিত বা ‘ডিমান্ড পুল’ মূল্যস্ফীতি। আবার যেসব উপকরণ দিয়ে পণ্য উৎপাদন করা হয়, তার দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এতে পণ্যের দাম বাড়লে তাকে বলা হয় ব্যয় বৃদ্ধিজনিত বা ‘কস্ট পুশ’ মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি সাধারণত খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এই দুভাবে ভাগ করা হয়। মূল্যস্ফীতিকে আরও দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন : মৃদু মূল্যস্ফীতি ও অতি মূল্যস্ফীতি। মৃদু অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি যখন আস্তে আস্তে বাড়ে, তখন মানুষও আস্তে আস্তে এর সঙ্গে মানিয়ে নেয়, আয় বাড়ায়, উৎপাদকরা বিনিয়োগ করেন। এতে দেশের উন্নতি হয়। কিন্তু লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লে এর সঙ্গে কেউই তাল মেলাতে পারে না। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে। মানুষের জীবনযাত্রার মান খারাপ হয়ে যায়। এই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যাওয়াকেই বলে অতি মূল্যস্ফীতি। লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে ধীরে ধীরে আয় বৃদ্ধি বা আয় কমে যাওয়া মানুষ তাল মেলাবে কেমন করে?
দেশের অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে, বাড়ছে মাথাপিছু আয়। মাথাপিছু আয়ের বিচারে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে মধ্যম আয়ের দেশে। কিছুদিনের মধ্যেই স্বল্পোন্নত দেশ থেকেও বের হয়ে যাবে বাংলাদেশ। কাজ ও জীবনযাপনের ধরন পাল্টে যাওয়ার কারণে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। ফলে ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই সরকার যে মূল্যস্ফীতির হার প্রকাশ করে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা। গত জুলাই মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাবে এবং অজুহাতে বেড়ে গেছে সবকিছুর দাম। সুতরাং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতি কতটা বাড়িয়ে দেখাবে আর বাস্তবে কতটা বাড়বে তার মধ্যে ফারাক থাকবে অনেক।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়ে গেছে নতুন করে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। তার মতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ এবং তার আশঙ্কা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করতে সরকারের কার্যকর হাতিয়ার নেই। তার বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, ‘অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা আমরা খুব একটা গুরুত্বসহকারে নিই না। মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে হয় না।’ শুধু তিনিই নন, এ রকমই বলছে অনেকেই। আসলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের কাছে সংখ্যা যত গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের জীবনযাপনের কষ্ট তেমন বিবেচনা পায় না।
বাস্তবে বিবিএস জাতীয় পর্যায়ে এবং গ্রাম ও শহরাঞ্চলের জন্য ভোক্তা মূল্যসূচক (কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স বা সিপিআই) হিসাব করে। শহর, গ্রাম ও জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির হিসাব করতে এসব সূচক ব্যবহার করা হয়। শহর ও গ্রামের গড় আয়ের পরিবারগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয় ভোক্তা মূল্যসূচক। শহর ও গ্রামের ভোগ্যপণ্যের কিছুটা পার্থক্য আছে সে কারণে দুটি আলাদা ভোগ্যপণ্যের তালিকা বা কনজ্যুমার বাস্কেট তৈরি করা হয়। শহরের ভোক্তাদের এই তালিকায় আছে খাদ্য, অন্য নানা ব্যবহার্য জিনিসসহ ৪২২টি পণ্য। আর গ্রামের ভোক্তাদের তালিকায় আছে ৩১৮টি পণ্য। ভোক্তা মূল্যসূচক তৈরি করতে কোনো পণ্যের গড় মান (পরিসংখ্যানের ভাষায় যাকে বলা হয় ওয়েট) কত হবে, তা বিবিএস নির্ধারণ করে একটি পরিবারের মোট খরচের কত অংশ কোন পণ্যের জন্য খরচ হয় তার ভিত্তিতে। আর পরিবারগুলোর এই অর্থ ব্যয় বা ভোগের ধরন নির্ধারণ করা হয় ২০০৫-০৬ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের ভিত্তিতে।
ঢাকার অধিবাসীদের খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের যে তালিকা করা হয়েছে তাতে আছে চাল, আটা, ডাল, চিনি, মাছ, মাংস, ডিম, সরষে ও সয়াবিন তেল, বিভিন্ন ধরনের মাছ ও মাংস, ডিম, পেঁয়াজ, হলুদ, আদা, লবণ, আলু, তরল ও গুঁড়ো দুধ, নারকেল তেল, শাড়ি-লুঙ্গি, সিমেন্ট, সাদা কাগজ ইত্যাদি। এর সবগুলো সাধারণ মানুষের প্রয়োজন হয় না। তাদের জীবন বেশি প্রভাবিত হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে।
৫ আগস্ট থেকে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চালের উৎপাদন কত খরচ বাড়বে সে হিসাব করেছেন অনেকেই কিন্তু তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে যে পরিবহন খরচ এরই মধ্যে বেড়েছে তার অজুহাতে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে অনেক বেশি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যানুযায়ী, ঢাকার বাজারে গত ২৮ জুলাই মোটা চালের কেজি ছিল ৪৮-৫০ টাকা। আর ২৯ আগস্ট সেই চাল বিক্রি হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা। তার মানে, চালের দাম বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। এ ছাড়া খোলা আটার দাম ২৮ শতাংশ বেড়েছে। এরপর বাড়ানো হলো সয়াবিন তেলের দাম। ডিম নিয়ে যে কারসাজি হলো তা তো মূল্যসন্ত্রাসের পর্যায়ে পড়ে। বাজারে মাছ-মাংস, শাকসবজিসহ এমন কোনো জিনিস কি আছে যার দাম বাড়েনি?
সামগ্রিকভাবে ধারণা করা হয় মূল্যস্ফীতি গণনায় খাদ্যপণ্যের ভার ৬০ শতাংশের মতো। আবার খাদ্যপণ্যের মধ্যে প্রধান খাদ্য চালের ভার ৪০ শতাংশের মতো। এর মানে, সার্বিক মূল্যস্ফীতি গণনায় চালের ভার ২৪ শতাংশের মতো। ফলে চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে তাতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি এমনিতেই ২ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহনসহ অন্য পণ্যের দামও বেড়েছে। ফলে পারিবারিক ব্যয় বেড়েছে অনেক। একটা সাধারণ হিসেবে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছরে একটি ৫ সদস্যের পরিবারে প্রতি মাসে চাল, চা, চিনি, বিস্কুট, দুধ, মাছ, মাংস, ডিম, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, স্কুলের খরচ, চিকিৎসা খরচ, বাড়িভাড়া, পোশাক-পরিচ্ছদের খরচ হিসাব করলে প্রায় ৪ হাজার টাকা খরচ বেড়েছে।
কিন্তু মানুষের আয় তো বাড়েনি। ফলে উপায় কী? মন্ত্রীরা খাওয়া কমানোর পরামর্শ না দিলেও বাধ্য হয়ে খাওয়া কমাবেন বা অনেকে দুর্নীতির পথ খুঁজবেন। একদল ব্যবসায়ীর বেশুমার লাভের খেসারত দেবে কোটি মানুষ তাদের জীবনমান ও চরিত্রের মান নামিয়ে দিয়ে। একে কি ভালো থাকা বলে?
লেখক: বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারি সম্পাদক ও কলামিস্ট
rratan.spb@gmail.com