ডেস্ক রিপোর্ট

২৫ ডিসেম্বর ২০২১, ৩:৪১ অপরাহ্ণ

সংলাপ : অভিজ্ঞতা এবং অনিশ্চয়তা

আপডেট টাইম : ডিসেম্বর ২৫, ২০২১ ৩:৪১ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

রাজেকুজ্জামান রতন ::

বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভাতের পরই ভোট গুরুত্বপূর্ণ। যে কারণে রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে ভোট ও ভাতের জন্য লড়ছি এই কথাটি বহুল ব্যবহৃত। সেই নির্বাচনপ্রিয় বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বেশি সংশয় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন তো বটেই, এমনকি স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটির নির্বাচনও এখন নির্বাচন উত্তেজনার পরিবর্তে অবসাদের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু হয় গণ-অভ্যুত্থান, নয় নির্বাচন এর বাইরে সরকার পরিবর্তনের আর কোনো পথ তো নেই। আর গণ-অভ্যুত্থান তো নিয়মিত হয় না, তাই নিয়মিত নির্বাচনই সরকার পরিবর্তনের আপাত শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি। যদিও বলা হয় নির্বাচন হবে শান্তিপূর্ণ কিন্তু নির্বাচনের আগে, নির্বাচনকালে এবং নির্বাচন-পরবর্তী কোনো সময়েই শান্তি বজায় রাখা সম্ভব হয় না। তাই নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য এবং অংশগ্রহণকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য নির্বাচন পরিচালনায় নিরপেক্ষতার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সব নির্বাচন নিয়েই কমবেশি বিতর্ক আছে। কিন্তু দল-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো তুলনামূলক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। তাই দল-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন পদ্ধতির একটি স্থায়ী রূপের প্রত্যাশা সবার। কিন্তু তা না হয়ে নির্বাচন নিয়ে স্থায়ী অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের সময় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হিসেবে নির্বাচনী ব্যবস্থার বিবর্ণ চেহারা দেখেছেন সবাই। রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকেন তারা সবাই সংবিধানকে সবার ওপরে স্থান দেন এ কথা যত উচ্চস্বরে বলেন, নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশন গঠনের আইনের কথা উঠলে ততটাই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েন। অথচ নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন প্রণয়নের কথা সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ সংবিধানের এমন সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও গত ৫০ বছরে কোনো সরকারই এ আইন প্রণয়ন করেনি। সবার শাসনামলই নাকি গণতন্ত্রের স্বর্ণযুগ, কারও আমলেই এই আইন প্রণীত হয়নি। আইনের শাসনের কথা এত বলা হয় অথচ সংবিধান উপেক্ষা করাও তো এক অর্থে আইনের শাসনের পরিপন্থী।

সংবিধানের দোহাই দেন যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন সবাই। বর্তমান সরকার তো বলছে সংবিধানের বাইরে তারা পা ফেলতে পারবেন না। কিন্তু সংবিধানে আইন প্রণয়ন না করে অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে কমিশনে নিয়োগ প্রদানের কোনো বিধান নেই। আবার সংবিধানেই আছে, ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শুধু প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া সমস্ত কাজই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নেবেন, তাই এই সন্দেহ ও অবিশ্বাস তো থেকেই যায় যে, রাষ্ট্রপতি কর্র্তৃক গঠিত অনুসন্ধান কমিটি প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের বাইরের ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হবে না। ফলে অনুসন্ধান কমিটি এবং তার সুপারিশে গঠিত নির্বাচন কমিশন কতটুকু গ্রহণযোগ্য এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক থেকেই যাবে।

গত ৫০ বছরে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়ন না করার প্রধান কারণ হলো ক্ষমতাসীনরা কোনোরূপ বিধিনিষেধে বাঁধা পড়তে চান না। আইন প্রণীত হলে সব ঠিক হয়ে যাবে তা নয় কিন্তু আইন থাকলে কিছু বিধিনিষেধ এবং নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে কমিশনে নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু আইনের পাশাপাশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিচারপতি রউফ, বিচারপতি আজিজ, কাজী রকিব যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন নুরুল হুদা তো সেই পথেই হেঁটেছেন। বিচারপতি আর আমলাতে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা গেল না।

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী নতুন ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতি যে সংলাপ শুরু করেছেন, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল, জোট এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তেমন কোনো আগ্রহ ও উৎসাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কারণ ব্যক্তিগত সদিচ্ছা বা উদ্যোগ খুব ভালো ফল দেয় না। তাই ইসি গঠনে সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রায় সবাই। কিন্তু ফলাফল শূন্য। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে বারবার। কিন্তু তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। কিন্তু যদি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হয় এবং নির্বাচনে জনগণের ন্যূনতম আস্থাও ফেরাতে হয় তাহলে নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন করে সে আইন অনুযায়ী ইসি নিয়োগের বিকল্প নেই। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সব অংশের মানুষের প্রত্যাশা, নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব এমন ব্যক্তিদের হাতে অর্পিত হওয়া উচিত যারা তাদের অতীত কর্মকাণ্ডে যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। যাদের ওপর জনগণ ভরসা করতে পারে এই ভেবে যে তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলে তারা নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের সৎসাহস দেখাবেন। তিনি বা তারা নিজের এবং পদের মর্যাদা রক্ষা করবেন।

নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপে এরই মধ্যে জাতীয় পার্টি এবং জাসদ দেখা করে তাদের মতামত জানিয়েছে এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদকে ২৬ ডিসেম্বর আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিক যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তাতে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের বিষয়টিকে ‘মতবিনিময়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যেহেতু বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শিগগিরই উত্তীর্ণ হচ্ছে, সেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত গ্রহণ সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশন গঠনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন।

একটু পেছন ফিরে তাকানো যাক! বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের শেষ দিকে সংলাপ শুরু করেছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এক মাসের বেশি সময় ধরে সেই সংলাপ চলেছিল। তখন রাষ্ট্রপতি সব দলের কথা শুনেছেন কিন্তু নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলসমূহের কিংবা নাগরিক সমাজের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। বরং আলোচনার ফলাফল হয়েছিল তার বিপরীত। এবারের উদ্যোগ সম্পর্কে অনেকেই বলছেন, বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সংলাপ বা মতবিনিময় কার্যত ‘আনুষ্ঠানিকতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। সংলাপের মাধ্যমে নতুন কিছু বেরিয়ে আসবে বলে তারাও মনে করেন না। কারণ অতীত তো তাদের জানা আছেই। এর আগে দুবার সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল। এবারও তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটার সুযোগ নেই।

সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে রাষ্ট্রপতির কাছে অন্তত ৫টি উদ্যোগ আশা করা যেতে পারে। যেমন :

১. নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন, নির্বাচন কমিশনকে স্বতন্ত্র কাঠামোয় দাঁড় করানো, নির্বাচন কমিশনারের সংখ্যা ৮ বিভাগ বিবেচনায় ৮ জন করা, সার্চ কমিটি গঠনের কাঠামো, নির্বাচন কমিশনের বাজেট, নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত নির্বাচন কমিশন গঠন।

২. নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের মানদণ্ড মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ, অসাম্প্রদায়িক, কোনোপ্রকার দুর্নীতির অভিযোগ না থাকা।

৩. নির্বাচন কমিশনের কর্মপরিধি ও ক্ষমতা, জামানতের পরিমাণ কমানো, না ভোটের বিধান, নির্বাচনী বিরোধ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সাংবিধানিক আদালত গঠন।

৫. সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন, সংবিধানের ৭০ ধারা বাতিল, ঔপনিবেশিক পুলিশ আইন পরিবর্তন।

৬. নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা নির্ধারণ, আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ বাতিলের বিধান, নির্বাচনে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় প্রতারণা, আঞ্চলিকতা বন্ধ করা।

এ কথা ঠিক যে রাষ্ট্রপতির হাতে কতটুকু ক্ষমতা তা নিয়ে সংশয় আছে। সাধারণভাবে এটাই মনে করা হয় যে তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কিছু করবেন না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সব দলের কাছেই শ্রদ্ধেয়। মতবিনিময় সভায় তার সদিচ্ছা থেকে তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কথা বলবেন, পরিবেশটাকে সহজ ও আন্তরিক করার জন্য রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নানা ঘটনার কথা বলে কিছুটা আনন্দঘন সময় অতিবাহিত করবেন, তার পক্ষ থেকে হয়তো নানা আশ্বাস দেওয়া হবে, রাজনৈতিক উত্তেজনাকে তিনি তার সৌজন্যমূলক ব্যবহারে শান্ত রাখার চেষ্টা করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন গঠনে ক্ষমতাসীন দলের পছন্দই প্রাধান্য পাবে।

আগের দুই দফায় (২০১২ ও ২০১৭ সালে) মূলত আওয়ামী লীগের পছন্দ তাদের শরিক দলগুলোর প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয়েছিল। ফলে মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়েই নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে। দুটি নির্বাচন কমিশনই (ইসি) তাদের কাজ এবং কথাবার্তার দ্বারা ব্যাপকভাবে বিতর্কিত ও সমালোচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা ও ভোটারবিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্বাচনী সংস্কৃতিতে এক নতুন বিপর্যয় সৃষ্টি করে দেশ-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও জালিয়াতি হয়েছে, এই ভোট দিনে না হয়ে আগের রাতেই হয়েছে বলে ক্ষমতার বাইরের সব মহল বলে আসছে। কিন্তু তারা না শোনার পণ করেছেন। তাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ভালো কিছু দেখলেন না জনগণ।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনায় অনেকেই অংশ নেবেন না। তারা বলবেন এই আলোচনায় কোনো লাভ নেই, কেন তাহলে বৈধতা দেব? ক্ষমতাসীন দল বলবে আপনারা তো আলোচনাতেই এলেন না। তর্ক পালটা তর্কে কিছু উত্তেজনা সৃষ্টি হবে কিন্তু গণতান্ত্রিক পরিবেশের উন্নয়ন হবে না। সামগ্রিক বিবেচনায় পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, রাষ্ট্রপতির সৌজন্যমূলক তৎপরতা গতানুগতিকতার বাইরে কোনো ফল বয়ে আনবে না। ফলে গণতন্ত্র বিকশিত হওয়ার পরিবর্তে নির্বাচন বিতর্কিত হওয়ার আশঙ্কা ঘনীভূত হবে আরও। সার্চ কমিটি দ্বারা তৈরি নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের আকাক্সক্ষা তাই সোনার পাথরবাটি হয়েই থাকবে।

লেখক : কলামনিস্ট ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য

শেয়ার করুন