ডেস্ক রিপোর্ট

১১ ডিসেম্বর ২০২১, ৪:০৭ অপরাহ্ণ

বুয়েটের ২৫ ছাত্রের খুনী হয়ে ওঠার দায় কার?

আপডেট টাইম : ডিসেম্বর ১১, ২০২১ ৪:০৭ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক::

আবরার হত্যাকান্ডের রায় হয়েছে। আদালত ২৫ আসামীর মধ্যে ২০ জনকে মৃত্যুদন্ড ও ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেছেন। একসাথে ২০ জন আসামীর মৃত্যুদন্ডের রায় বোধকরি এটাই প্রথম। যারা আবার দেশের অন্যতম সেরা মেধাবীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বুয়েটের ছাত্র। হত্যাকান্ডটি যেমন আলোচিত ছিলো, এর রায়টিও সমানভাবে আলোচিত। দেশের অধিকাংশ নাগরিকের চাওয়া ছিলো এই হত্যাকান্ডের একটি দৃষ্টান্তমূলক রায়।

আইনমন্ত্রী এই রায়েকে কেন্দ্র করে মন্তব্য করেছেন,‘রায়ে প্রমাণিত হয়েছে, দেশে আইনের শাসন আছে’। পৃথিবীতে ‘আইনের শাসন’ এই ব্যাপারটি এসেছিলো কর্তৃত্ববাদী এবং নিরঙ্কুশ রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসাবে। বাংলাদেশের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা যে কর্তৃত্ববাদী সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না! আইনের শাসন এর অর্থ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে শাসনের মধ্যে রাখা।

সাংবাদিক সাগর-রুনী, ত্বকী,তনুসহ আরো অসংখ্য আলোচিত হত্যাকান্ডের বিচার এখনো সম্পাদিত হয়নি। দেশে গুম-বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড অব্যহত রয়েছে। এসব কোন ঘটনাই প্রমাণ করে না দেশে আইনের শাসন আছে। ২০২১ সালে আইনের শাসনের সূচকে ১৩৯ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৪(ডব্লিউজেপি)।

একটি হত্যা মামলায় ২০ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা কোনভাবেই আইনের শাসন বলবত আছে তার মাপকাঠি হতে পারে না। আইনের শাসনই যদি থাকতো তবে এই ২৫ মেধাবী ছাত্রের খুনী হিসাবে বিচারের মুখোমুখী হবার মতো কোন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

যে ২৫ জনের বিরুদ্ধে রায় হয়েছে তারা দেশের সবচেয়ে সেরা মেধাবীদের মধ্যে অন্যতম। এরা কী খুনী হিসাবে বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলো?? তাদের কারো পরিবার কী ভাবতে পেরেছিলো সন্তানের জায়গা হবে অন্ধকার কনডেম সেলে!! অবশ্যই না। যদি উত্তর না হয়, তবে এরা যে খুনী হয়ে উঠলো, বিচারে কী এই বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে এদের এই পরিণতির জন্য কারা দায়ী? না, এই প্রশ্নগুলিকে বরাবরের মতোই আড়াল করে শুধুমাত্র ব্যক্তিকেই সামনে রাখা হয়েছে। সবধরনের দায় চাপানো হয়েছে ব্যক্তির ঘাড়ে!

কিন্তু সময় এসেছে আমাদেরকে প্রশ্ন তুলতে হবে। আমাদের সন্তানেরা খুনী, ধর্ষক, গুন্ডা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করছে, এর দায় কার? শুধুই কী ব্যক্তির? এই প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে সামনে আমাদের আরো অনেক বেশি অন্ধকারে হারিয়ে যেতে হবে। আলোর সন্ধান করা এখনই জুরুরী, নতুবা কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হবে না। স্বপ্নের ফুলগুলো কলি থেকে ফুল হয়ে ফোটার আগেই ঝরে পড়তে থাকবে। যেমন ঝরে গেলো ২৫ টি জীবন।
বুয়েটে দিনের পর দিন এই ছাত্ররা তাদের সতীর্থদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে। এর দায় কী শিক্ষকদের ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উপরেও বর্তায় না? তারা যদি বলে এর কিছুই জানতো না, তবে সেটি হবে নির্জলা মিথ্যাচার।

যে ছাত্ররা দিনের পর দিন এধরনের অন্যায় কাজের সাথে যুক্ত ছিলো, শিক্ষকরা যদি প্রারম্ভেই এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতো তবে আজকে তাদের স্থান হতো শ্রেনী কক্ষে, ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী হিসাবে কনডেম সেলে নয়। যেকারণে ছাত্ররা বিপথগামী হয়েছে সেই একই কারণে তাদের শিক্ষকরাও তাদের বাঁধা প্রদান করেনি।

অর্থাৎ শাসকগোষ্ঠীর দুর্বৃত্তায়ন রাজনীতির চক্রে শিক্ষক-ছাত্র উভয়েই দোল খাচ্ছে। শিক্ষকরা তোষামদিকে ব্যবহার করে ভিসি, প্রোভিসি, প্রক্টর,হল প্রভোষ্ট, হাউজ টিউটর হতে চায়! আর ছাত্ররা রাজার হালে হলে থাকতে চায়, ছাত্র জীবনে লাখ টাকার মটোর বাইক বা চার চাকার গাড়ির মালিক হতে চায়। এখানেই দুই পক্ষের সাথে সমঝোতা! তার পরিণতিতে সম্ভবনাময় ভবিষৎ এর মৃত্যু!!

তাদের এই কাঙ্খিত লক্ষ অর্জনের জন্য চাই ক্ষমতা। গুন্ডাতন্ত্র জারি রাখতে না পারলে এই ক্ষমতা চর্চা করা যায় না। একটি গণবিরোধী-অগণতান্ত্রিক সরকারের যেহেতু কোন প্রকার জনভিত্তি থাকে না সেকারণে তাকে নির্ভর করতে হয় আমলা, রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্র আর দলীয় গুন্ডাতন্ত্রের উপর। এই ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রের চেইন গড়ে ওঠে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত। একটি পর্যায়ে যা সাধারণ নাগরিকের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়।
গত এক মাসে ছাত্রলীগের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মকান্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি এদের কিভাবে গিলে খেয়েছে! বুয়েটে খুনের অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত ২৫ জন, কুয়েটে শিক্ষকের মৃত্যুর অভিযোগে ৯ জন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চাঁদাবাজির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৩০ জন, মোট ৬৪ জন ছাত্র বহিস্কার হয়েছে।

প্রত্যেকেই দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। দেশের সেরা মেধাবীদের মধ্যে অন্যতম হবার কারণেই এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলো। দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির প্রভাবে এরা হয়ে উঠেছে খুনী-সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ-দখলদার! আর রাজনীতিটা দুর্বৃত্তায়িত হয়েছে লুটেরা রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীনে।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্ব দেশে-বিদেশে সরকারী অথবা দলীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিয়ে গণভবন-বঙ্গভবন-প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডাকা হয়। জেলা পর্যায়ে মন্ত্রী-এমপিদের সকল ধরনের সরকারী কর্মসূচিতে জেলার নেতারা উপস্থিত থাকে আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে। সরকারী দলের ছাত্র সংগঠন এভাবেই ক্ষমতায়িত হয়। কারণ তাদেরকে ক্ষমতায়িত করা হয় গুন্ডাতন্ত্র জারি রাখার জন্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী বা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পত্রের জন্য শরণাপন্ন হয় এইসব ছাত্র নেতাদের কাছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ছাত্র নেতাদের কাছে বিনয়ের সুরে বলতে শুনেছি,‘পিএম এর কাছে আমার নামটা বলো, প্লিজ’। এই শিক্ষকরা তার ছাত্রদের অন্যায় কর্মকান্ডে বাঁধা দিবে না সেটাই স্বাভাবিক।

অন্যায় ঘটনা কী শুধুমাত্র ছাত্রলীগই ঘটায়? না, ঘটায় আসলে সরকারী দলের ছাত্র সংগঠন। যখন যে ক্ষমতায় থাকে তার আশ্রিত ছাত্র সংগঠন। প্রাসঙ্গিক একটি ঘটনার উল্লেখ করি। ২০০৫ সাল বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায়। আমি তখন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বে। ৩১ মে, ২০০৫ মধুর কেন্টিনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা আমাকেসহ প্রগতিশীল ছাত্র জোটের আরো দুজন শীর্ষ নেতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করে আহত করে। অন্য ছাত্র কর্মীরাও আহত হয়। ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি লিয়াকত সিকদার ও সা:সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবু দৌড়ে তখনকার আইবিএ ভবনে আশ্রয় গ্রহণ করে নিজেদের রক্ষা করে। পরে এম্বুলেন্সে ক্যাম্পাস ত্যাগ করে।

সেদিন সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত ছিলাম আমি। তাদের সেদিনের আঘাতে আমার স্পাইনালকর্ড স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টানা কয়েকমাস পিজি হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। আমার চলৎশক্তি সেই সময়ে হারিয়ে গেছিলো। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারতাম না। স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যাবার সম্ভবনা তৈরি হয়েছিলো। সেই সময়ে গুন্ডাতন্ত্র জারি রাখার লাঠিয়াল ছিলো ছাত্রদল, আজকে যেমন ছাত্রলীগ।

একপক্ষ আওয়াজ তুলেছে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার। দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির অবসান না ঘটিয়ে, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে ছাত্রদের খুনী হয়ে ওঠা ঠেকানো সম্ভব না। বরং দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি প্রতিরোধে ছাত্ররাই সংগঠিত হচ্ছে এবং হবে। ছাত্ররাজনীতি মানে শুধুমাত্র ছাত্রলীগ নামক গুন্ডা সংগঠন নয়। আরো সংগঠন আছে যারা এই লুটেরা রাজনীতির বিপক্ষে সংগ্রাম করছে। আপনি তাদের দেখেন না, কারণ তাদের দেখতে চাননা তাই!! এই লুটেরা রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করুন তাহলে তাদেরকেউ দেখতে পাবেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশির্বাদপুষ্ট ছাত্র সংগঠনের নেতারা সাংগঠনিক সফরে প্লেন থেকে বিমান বন্দরে নেমে ১০০/২০০ গাড়ির বহর নিয়ে শহরে ঢোকেন, রাত্রি যাপনের জন্য জেলা সার্কিট হাউজে থাকেন। কোথায় পান এই বিলাসী জীবন যাপনের অর্থ? প্রধানমন্ত্রী জানেন না!! জানেন, কিন্তু কিছুই বলেন না যতোক্ষণ পর্যন্ত কোন ঘটনা পাবলিক হয়, ভাইরাল হয়। ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সফরসঙ্গীর তালিকা থেকে বাদ দিতে বলেন, গণভবনে-বঙ্গভবনে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ জানানো বন্ধ করেন, তাহলেই দেখবেন খুনী হয়ে ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমি যতো সহজে এই করনীয়গুলি বল্লাম এর একটিও পূরণ করা এই লুটেরা শাসকগোষ্ঠীর দলগুলির পক্ষে সম্ভব না। কারণ এটা করলে তার ক্ষমতায় থাকাটাই অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। প্রকৃতপক্ষে এই লুটেরা রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ লড়াই এর বিকল্প অন্য কিছু নেই। ২৫ ছাত্রের খুনী হয়ে ওঠার দায় এই লুটেরা রাষ্ট্র ব্যবস্থার আর তার থেকে সৃষ্টি হওয়া দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির।

লেখক : সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী

শেয়ার করুন