ডেস্ক রিপোর্ট

৭ নভেম্বর ২০২১, ৪:১৩ অপরাহ্ণ

সোভিয়েত চিকিৎসা বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

আপডেট টাইম : নভেম্বর ৭, ২০২১ ৪:১৩ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

আল কাদেরী জয়::

করোনা মহামারির গত ২০ মাসে বিশ্বের প্রায় ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আমাদের দেশেও মৃত্যু ঘটেছে বহু মানুষের এবং জনগণের সংকটের পাশাপাশি উন্মোচিত হয়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বরুপ। পুঁজিবাদী বিশ্বের মানুষের চিকিৎসা সুবিধা নির্ভর করে মুনাফার উপর। এই মহামারিতে আমরা দেখি স্বাস্থ্যখাতে সীমাহীন দূর্নীতি, লুটপাট আর মানুষের দূর্ভোগ। অন্যদিকে কিউবাসহ বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক নীতি দেখিয়ে দিয়েছে কেমন হওয়া দরকার রাষ্ট্রের দায়িত্ব?

৭ নভেম্বর’২১ মহান রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ১০৪ তম বার্ষিকীতে সোভিয়েত চিকিৎসা বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে লিখেছেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আল কাদেরী জয়।

জনগণের স্বাস্থ্যঃ সোভিয়েতের সম্পদ

” না এলে এ জন্মের তীর্থ দর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকতো!”-কথাটি বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।তবে কোন গয়া-কাশী দেখে কিংবা নৈসর্গের মুগ্ধতা থেকে তিনি এ কথাটা বলেন নি,বলেছিলেন বিশ্বের প্রথম শ্রমিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের অভিজ্ঞতায়।১৯৩০ সালে,অর্থাৎ বিপ্লবের ১৩ বছর পরে কবিগুরু দুই সপ্তাহের সফরে সোভিয়েত রাশিয়ায় যান যা তার মতে ছিলো তীর্থ দর্শন সমতুল্য।সেখানের শিক্ষা,সমাজ,উন্নয়ন,মানুষের লোকাচার সবকিছু মিলিয়ে এক অপূর্ব বর্ণনা মেলে তাঁর ১৪ খানা প্রবন্ধ-পত্রে।’রাশিয়ার চিঠি’ নামে তাঁর এই রচনায় সোভিয়েত সম্পর্কে যেমন ভূয়সী প্রশংসা ও আশাবাদ তেমনি কিছু সমালোচনাও পাওয়া যায় ।

কি দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ-রাশিয়ায়? এককথায় উত্তর দিলে বলতে হয়, মানুষ! হাঁ, রবীন্দ্রনাথ সেখানে মানুষ দেখেছিলেন,সোভিয়েত মানুষ- যা দেখে তিনি তীর্থের সুখ পেয়েছিলেন।কোন দেবদেবীর স্বর্গ কিংবা সৃষ্টিকর্তার বন্দনা নয়, রবীন্দ্রনাথ সেখানে খুঁজে পেয়েছিলেন মানুষের সৃষ্টি।মানুষকেই দেখতে পেয়েছিলেন স্রষ্টার রুপে।সোভিয়েত রাষ্ট্রের এই মানুষই ছিলো সমাজতন্ত্রের শক্তি।কর্মে,সৃজনে ও শ্রমে তারা গড়ে তুলেছিলো সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও সভ্যতা।আর সোভিয়েত নির্মাণ করেছিলো তার জনগণের শক্তি।

রাষ্ট্রের চেহারা আমূল পরিবর্তনের ফলে পাল্টে যায় তার আর্থ-সামাজিক চরিত্র। জনগণের শিক্ষা,স্বাস্থ্য,বাসস্থান,কাজ প্রভৃতি মানবিক মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠে এই শক্তি। নতুন সমাজ বিনির্মাণে প্রয়োজন হয় নতুন মানুষ।পুরানো শোষণমূলক ব্যবস্থায় যা ছিলো মানুষের অসাধ্য,তা তারা নিয়ে এসেছিলো মানুষের সেবায়।যে জনগণ এতোদিন রোগ-শোক, ক্ষুধা-যন্ত্রণা,সামাজিক কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসে নিমজ্জিত ছিলো; সমাজতন্ত্র সে সমাজের অচলায়তন ভেঙ্গে মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছিলো।প্রতিটি মানুষের জন্য চিকিৎসা সুবিধাসহ নাগরিক মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছিলো।

জারশাষিত রাশিয়াঃ বঞ্চনা আর মৃত্যুই ছিলো জনগণের পরিণতি

বিপ্লবপূর্ব জারের রাশিয়ায় ২০ হাজার জনে ছিলো মাত্র ১ জন ডাক্তার।অর্থ্যাৎ একজন কৃষক জীবনে একবারও ডাক্তারের দেখা পেত কিনা সন্দেহ। সেখানে বিপ্লবের পর (১৯৬৫ সালের হিসাব) প্রতি ৪১৮ জনের জন্য ১ জন ডাক্তার তৈরী হয়েছিল।
১৯১৩ সালে তাজিকিস্তানের ১৫ লক্ষ অধিবাসীর জন্য ছিলো মাত্র ১৩ জন ডাক্তার,আর সোভিয়েত আমলে সেখানে ১০ হাজার ১৪ জন ডাক্তার নিশ্চিত করেছিলো।

শুধু সংখ্যাতত্ত্বই নয়,প্রাক সোভিয়েত রাশিয়ার পশ্চাৎপদতা বোঝা যায় সে সময়ের প্রসূতি মা’দের ভয়াবহ ও অমানবিক দূর্দশার চিত্র দেখলে।প্রাকবিপ্লব যুগে সেখানে বছরে প্রায় ৩০ হাজার প্রসূতি মারা যেত। শিশুমৃত্যুর হার ছিলো হাজারে ২৭৩ জন। স্ত্রীলোক ও শিশুদের ক্লিনিক ছিলো মাত্র ৯টি।শুধুমাত্র অবস্থাসম্পন্ন ও অভিজাতরাই এই ক্লিনিক সেবার সুযোগ পেত। আর বিস্তীর্ণ রাশিয়ার গ্রামাঞ্চল ও শ্রমজীবী ছিলো বঞ্চিত। বছরের পর বছর গ্রাম্য ডাক্তার ও দাঈমা ছিলো একমাত্র অবলম্বন।গ্রামীণ সংস্কার ছিলো-প্রসবের পর প্রসূতিকে সূর্যের আলো থেকে দূরে ও অন্ধকার নোংরা ঘরে চার সপ্তাহ থাকতে হতো।

১৯১১ সালে সেই রাশিয়ার মস্কোর শহরতলির বর্ণনায় স্টিফেন গ্রেহাম তাঁর ‘A vagabond in the Caucasus’ বইয়ে লিখেছিলেন,”বাজারে গেলে যে কেউ দেখতে পাবে নারী ও পুরুষ এক সঙ্গে জড়াজড়ি করে মাত্র একখানি সুতার বস্ত্র গায়ে জড়িয়ে দারুণ শীত নিবারণের চেষ্টা করছে।এদের জীবনধারণের প্রচেষ্টা ধারণাতীত।…ভিখিরীর সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের কম নয়।শহরটা বলতে গেলে তাদেরই।যদি বলা যায় শহরের নর্দমায় ইঁদুরের প্রভাব চলছে তবে রাস্তাগুলোয় চলছে তাদের।”

বিপ্লবের আগে রাশিয়ায় এই চিকিৎসা সেবা ছিলো এক ধরণের ভোক্তাসংলগ্ন ব্যবসা। ডাক্তারদের সুনাম ও প্রসার নির্ভর করতো কেবল তাদের পেশাদারিত্বের উপরই।তারা অনেকেই রোগীর বাড়ী বাড়ী যেতেন।প্রাইভেট প্র্যাকটিসের উপরই তাদের নির্ভর করতে হতো।প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোগীরা ঘরের মুরগী,আলু বা অন্যান্য গৃহস্থালি জিনিষপত্র দিয়ে ডাক্তারের সেবা নিতো।এই গ্রামগুলোতে কিছু দাতব্য চিকিৎসালয় ছিলো।তার বাইরে এই হাতুড়ে ডাক্তাররাই ছিলো অসহায় মানুষের একমাত্র অবলম্বন। এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের উপায় নিয়ে বলতে গিয়ে একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ডঃ আই দানিলেভস্কি মন্তব্য করেন,”একমাত্র রাষ্ট্রই হতে পারে শ্রেষ্ঠতম ডাক্তার,যা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্ভব নয়।”

বিপ্লবঃ এনেছে পরিবর্তন,এনেছে অধিকার ও মুক্তি

১৯১৭ সালে বলশেভিক পার্টি ক্ষমতায় আসার পর মহামতি কমরেড লেনিন আইন প্রণয়ন করেন দেশের সকল মেডিক্যাল সার্ভিস জাতীয়করণের এবং বিনামূল্যে সোভিয়েত জনসাধারণের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।তখন থেকেই ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ হলো।স্থাপিত হতে লাগলো বড় বড় হাসপাতাল,প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতেও এই চিকিৎসা সেবা প্রসারিত হতে লাগলো।কিন্তু শুধু রোগ নিরাময় নয়,বরং রোগের প্রতিরোধ-সোভিয়েত মেডিক্যাল সার্ভিসের মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হলো।সোভিয়েত চিকিৎসকদের আদর্শ হলো এটাই যে জনগণের স্বাস্থ্য জাতীয় সম্পদরুপে গণ্য করতে হবে।আর এজন্য স্বয়ং রাষ্ট্রই ঐ সমস্ত গণপ্রতিষ্ঠান(স্কুল,কলেজ,কল-কারখানায়) এ সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব নিলো। এছাড়া অতিরিক্ত খাটুনীতে মানুষের স্বাস্থ্য নষ্ট হয়,সেজন্য ৮ ঘন্টার বেশি কেউ কাজ করবে না- এই আইনও জারী হলো।

সোভিয়েত চিকিৎসা ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হলো অগ্রবর্তী শহরাঞ্চলের সাথে সাথে পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলোর একসাথে এগিয়ে চলা।

১৯৬৫ সালে স্ত্রীলোক ও শিশুদের জন্য ৯টির জায়গায় ১৯ হাজার ৫০০টি ক্লিনিক স্থাপিত হয়।এসময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে ডাক্তারের সংখ্যা ছিলো ৫ লক্ষ ৫০ হাজার যেখানে আমেরিকায় ছিলো ৩ লক্ষ ৫১ হাজার, গ্রেট ব্রিটেনে ৮৯ হাজার ১০০ এবং ফ্রান্সে ছিলো ৭৫ হাজার জন।সোভিয়েত ইউনিয়নের এই ডাক্তারি পেশায় নিযুক্ত শতকরা ৮৬ জন ছিলো নারী।ট্রেনিং প্রাপ্ত নার্সের সংখ্যা ছিলো ১৭ লক্ষ,মেডিক্যাল কলেজ ছিলো ৮৭টি এবং নার্সিং স্কুলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলো ৬০০টি।

শুধু ব্যবস্থার অগ্রগতিই নয়,উন্নত দেশগুলোর তুলনায় সোভিয়েতে স্বাস্থ্যগত অবস্থারও প্রভূত উন্নতি ঘটেছিলো।শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৭৩ জন কমিয়ে এনে হয়েছিলো ৭.৩% ; অথচ ঐ একই সময়ে আমেরিকায় শিশুমৃত্যুর হার ছিলো ৯.৪%, সুইডেনে ১০.১%, ফ্রান্সে ১১.১% ও ব্রিটেনে ১১.৫%।

সোভিয়েত ইউনিয়নে হাসপাতাল বেডের সংখ্যা ছিলো ২২ লক্ষ।আমেরিকায় প্রতি হাজার অধিবাসীর জন্য এ সুযোগ ছিলো ৮.৫%; আর সোভিয়েতে তা ৯.৬% য়ে উন্নীত হয়েছিলো।

জনগণের স্বাস্থ্যের প্রতি সোভিয়েত রাষ্ট্রের দরদবোধ ও দায়িত্ববোধের একটা বাস্তব পরিচয় পাওয়া যায় ইউক্রেনের নিপ্রোজেরজিন্স্ক কেমিক্যাল মিলসে্র উদাহরণে।সেখানে ৭৫০০ শ্রমিকের সেবায় নিযুক্ত ছিলো ২০৩ জন ডাক্তার।

সোভিয়েত চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর বলতে গিয়ে আমাদের দেশের একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক ড. প্রাণগোপাল দত্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার এক সাক্ষাৎকারে বলেন- ” পৃথিবীর কোন পুঁজিবাদী দেশও এটা বিশ্বাস করে না যে,সোভিয়েত শিক্ষাপদ্ধতি খারাপ বা দূর্বল ছিলো।বরং সোভিয়েত চিকিৎসক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কর্মকান্ড সম্পর্কে তারা উচ্চ ধারণাই পোষণ করেন।” তাঁর সেই সাক্ষাৎকারে সোভিয়েত রাশিয়া চিকিৎসা সম্পর্কিত গভীর শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি প্রকাশ ঘটে এই ভাষায়ঃ “আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ডাক্তারদের সম্মান কোথায় বেশি? আমি তো জার্মানি,ইংল্যান্ড,রাশিয়া তিনটাই দেখেছি- এক কথায় বলবো সোভিয়েত ইউনিয়ন।”

সোভিয়েত চিকিৎসা বিজ্ঞানঃ মানুষের গবেষণার নতুন দিগন্ত

জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সোভিয়েত ইউনিয়নে চিকিৎসা কেবল রোগ নিরাময় প্রতিষেধক কিংবা সেবা হিসেবে থাকে নি।বরং বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে আধুনিক সোভিয়েত চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশেষত্ব অর্জন করে। ভবিষ্যত উন্নত সমাজ ও দক্ষ আধুনিক জনগোষ্ঠী তৈরীতে গবেষণা,পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় সোভিয়েত চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশ্বের শীর্ষস্থানে উঠে আসে।মহাকাশ বিজ্ঞান,ভৌত,পদার্থ,রসায়নসহ আধুনিক গবেষণায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে ও সে সবাইকে ছাড়িয়ে যায়।

এই গবেষণা পরিচালনায় নার্সিং স্কুল,মেডিক্যাল কলেজের পাশাপাশি সোভিয়েতে ৩৫৯ টি রিসার্চ ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়।মুনাফা নয়,সমাজের সার্বিক অগ্রগতি ও জনগণের স্বার্থ-লক্ষ্যেই ইন্সটিটিউটগুলোতে গবেষণা পরিচালিত হতে থাকে।এক্ষেত্রে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে সম্পূর্ণরুপে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে ভরোভিয়ভূ, টঙ্কভ্, লিস্গাফ্ট, ফিলাটভ প্রমুখ চিকিৎসা বিজ্ঞানীর অবদান অপরিসীম।

একসময় চিকিৎসা ব্যাপারটা ছিলো নিছক রোগ সারানোর কৌশল।সোভিয়েতে তা পরিণত হলো স্বাস্থ্য বিষয়ক বিজ্ঞানে। বিপ্লবের পূর্বে বিজ্ঞানী আই.আই. মেচ্নিকভ ইমিউনিটি(immunity) বা রোগ অনাক্রমণতার মতো কোষের সূক্ষাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।এই চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের অনেকেই বিপ্লবপূর্ব সময়ে জনসাধারণের সেবায় নিজেদের সমস্ত শক্তি ও সাধনা ব্যয় করেন।ফলে একদিকে তারা যেমন বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন অন্যদিকে স্বৈরাচারী জারতন্ত্রের বিরাগভাজন হয়ে পড়েন।বিপ্লবোত্তর সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের ফিজিওলজি(physiology) আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক বিশাল ভুমিকা পালন করে।এই কৃতিত্বের দাবিদার হিসেবে ফিলোমাফিটিস্ক,বাসভ্, মিলোসভিস্ক,অভসিযানিকভ,বটকিন এবং আরো অনেক সোভিয়েত ফিজিওলজিস্টের নাম উল্লেখযোগ্য।

সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের বিশেষ চিন্তা ও গবেষণায় চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় সূচিত হয়।এক্ষেত্রে বিজ্ঞানী ইভান পেত্রোভিচ পাভলভ (১৮৪৯- ১৯৩৬)য়ের ভুমিকা অবিস্মরণীয়।পাভলভ এক নতুন ধরণের সুশৃঙ্খল,পরিমাণাত্মক শারীরবৃত্তিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া প্রবর্তন করেন।১৯০৪ সালের পোষ্টিকতন্ত্রের গঠন ও কার্যাবলীর উপর ভুমিকা রাখায় তিনি নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। পাভলভ প্রমাণ করেন যে-পরিপাক ক্রিয়ার ঘটনাটি নিছক পাকস্থলীর নিজস্ব ফাংশানিং নয়। পাকস্থলী, মুখ গহবর,নাক এবং চোখ থেকে যেসব উদ্দীপনা পরিবাহিত হয়,সমগ্র জীবদেহে তার অতি জটিল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটে। সেই সব উদ্দীপনা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং সংবেদী( sympathetic) স্নায়ুতন্ত্র উভয়ের সংযোগ মারফত পরিবাহিত হয়। এই পাচকরসের ক্ষরণহার নির্নয় করতে গিয়ে পাভলভ তাঁর বিখ্যাত “শর্তাধীন পরাবর্ত ” ( condition reflex) বিষয়টা আবিস্কার করেন। এর পূর্বে তাঁর শিক্ষক আই.সেচেনভ (১৮২৯-১৯০৫) মস্তিষ্কের রিফ্লেক্স ও ইনহিবিশনের উপর ‘Reflexes of the Brain” বইটা লেখেন।

বিজ্ঞানী পাভলভই সর্বপ্রথম প্রমাণ করেন যে, মানুষের দেহ ও মন তথা মস্তিষ্ক ‘কন্ডিশন রিফ্লেক্স’ দ্বারা চলে। তিনি দেখান, মানুষের মস্তিষ্কের রিফ্লেক্সগুলি নিম্ন কেন্দ্রের রিফ্লেক্সের মত সাধারণ এবং স্থায়ী নয় বরং কন্ডিশনাল ও অস্থায়ী ধরণের যা গড়তে ও ভাঙ্গতে পারে।এই রিফ্লেক্স সিস্টেম প্রাণীর পরিবেশ অনুযায়ী গঠিত হয়।এই ব্যাপারে পাভলভ একটা পরীক্ষা চালান যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।

পাভলভ তাঁর পরীক্ষায়ঃ একটা কুকুরকে মাংস দেয়ার সময় কয়েক সেকেন্ড আগে একটি বাতি জ্বালাতেন।তারপর কুকুরটাকে মাংস খেতে দিতেন।এভাবে কিছুদিন খাওয়ানোর পর দেখা গেলো- আলো জ্বালাবার পর মাংস না দিলেও কুকুরের লালা গ্রন্থি থেকে লালা ঝরতো।

এর থেকে তিনি সিদ্ধান্ত পেলেন-নিশ্চয়ই কুকুরের মস্তিষ্কের দৃষ্টিকেন্দ্রের সাথে খাদ্যকেন্দ্রের একটা অস্থায়ী সংযোগ স্থাপিত হয়েছে যার ভিতর দিয়ে মেডুলাস্থিত লালাকেন্দ্র হয়ে লালাগ্রন্থির স্নায়ু রিফ্লেক্স এবং দেহকোষের স্নায়ু রিফ্লেক্সের অস্থায়ী সংযোগের মাধ্যমে একযোগে উদ্দীপনা সাড়ার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কাজ করে। প্রাণীদেহে এসবই বস্তুগতভাবেই গড়ে উঠে।এতে রহস্য কিংবা অলৌকিকতার কিছু নেই।জন্মের পর মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর পরিবেশ ও ব্যবহারিক কাজের মধ্য দিয়ে এই কন্ডিশন রিফ্লেক্স গড়ে উঠে যার ফলে সে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়।এর মাধ্যমে আরেকটা বিষয় প্রমাণিত হয়- মানুষের চারিত্রিক দোষ-গুণগুলোও পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।পরিবেশ ও শিক্ষাগুণে যেমন ভালো ও স্বাস্থ্যকর রিফ্লেক্স গড়ে উঠে তেমনি খারাপ পরিবেশ ও শিক্ষাদোষে অস্বাস্থ্যকর কন্ডিশন রিফ্লেক্স তথা খারাপ আচরণ তৈরী হয়।পাভলভের এই আবিষ্কারর মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বৈজ্ঞানিক ও দ্বান্দ্বিক ধারণা বিকশিত করে।

মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা,অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা

রাশিয়ায় আগে মানুষের অসুখ ব্যাপারটাকে ঈশ্বরের দেয়া সাজা কিংবা হুঁশিয়ারি বলে মনে করা হতো।পরবর্তীতে সেটাকে কুৎসিত জীবনযাপন,মদ্যপান এবং অপরিচ্ছন্নতার কুফল হিসেবে ভাবা হতো। সোভিয়েত চিকিৎসা বিজ্ঞান এই ধারণাগুলোর মূলে কুঠারাঘাত হেনে দেখালো,যুগ যুগ ধরে এক নির্মম নির্বোধ সমাজব্যবস্থার কর্তৃক আরোপিত জীবনযাত্রার পরিণামেই রোগভোগ দেখা দেয়।

বিপ্লবের পর সোভিয়েত পুরানো সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটায়। বিপ্লবের পনেরো বছরের মধ্যে নিরক্ষরতা মুছে দিয়ে প্রমাণ করলো মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি।শিক্ষাকে অবৈতনিক করে দেয়া হয়।চিকিৎসা আর ক্রয়-বিক্রয়ের সামগ্রী হিসেবে থাকে নি,পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় সেবায়।মানুষের বাসস্থান সমস্যা পুরোপুরি মিটে গেছে। এই আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে মানুষের বিকাশ ঘটেছে জীবনের,মুক্তি পেয়েছে তার অবরুদ্ধ ক্ষমতার।সমাজের শৃঙ্খল যে মানুষকে এতোদিন কেবল পদানত করে রেখেছিলো অমানবিক দূর্দশা ও অসহায়ত্বের বন্ধনে, সেটা ভেঙ্গে সোভিয়েত ঘোষণা করলো তার শ্রেষ্ঠত্বের অমোঘ বাণী।

তীর্থ দর্শনের সোভিয়েত সমাজের সেই অভিজ্ঞতা থেকে রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছিলেন, ” সনাতন বলে পদার্থটা মানুষের অস্থিমজ্জায় মনেপ্রাণে হাজারখানা হয়ে আঁকড়ে আছে; তার কত দিকে কত মহল,কত দরজায় কত পাহারা,কত যুগ থেকে কত ট্যাকসো আদায় করে তার তহবিল হয়ে উঠেছে পর্বতপ্রমাণ। এরা তাকে একেবারে জটে ধরে টান মেরেছে; ভয় ভাবনা সংশয় কিছুই মনে নেই।” এই সোভিয়েতই যেন সমাজের জীর্ণতা মুছে জ্বেলেছিলো সভ্যতার আলোকবর্তিকা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় , ‘ মনে হলো যেন আরব্য উপন্যাসের জাদুকরের কীর্তি! ”
(সমাপ্ত)

তথ্য সহায়তায়
১.ইতিহাসে বিজ্ঞান- জে.ডি বার্ণাল।
২.শোনো বলি মনের কথা- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
৩. তরঙ্গ পত্রিকার নিবন্ধঃ আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু-এম এ ওয়াদুদ(১৯৬৭)।
৪. সাক্ষাৎকার- ড.প্রাণগোপাল দত্ত।
এবং ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত বিভিন্ন লিংকসমূহ।

শেয়ার করুন