ডেস্ক রিপোর্ট

১৯ এপ্রিল ২০২১, ৭:০৫ অপরাহ্ণ

করোনা: ‘উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে’!

আপডেট টাইম : এপ্রিল ১৯, ২০২১ ৭:০৫ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক::

আমরা ক্রমেই করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করছি। গত ১৬ দিনে (১-১৬ এপ্রিল) সংক্রমিত হয়েছে ১ লাখ ৪৮৪, সংক্রমণের হার ২২%, এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ১৩৬, প্রতি ১৫ মিনিটে একজনের মৃত্যু হচ্ছে (করোনা.গভ.ইনফো)। এই সরকারি হিসাবের বাইরেও আরো অনেক সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যাণ আছে যা অন্ধকারেই রেখে দিচ্ছে সরকার। রায়ের বাজার কবরস্থানে ৫০ টি কবর প্রতিদিন অগ্রিম খুঁড়ে রাখা হচ্ছে করোনায় আক্রান্ত মৃত্যুবরণকারীদের জন্য। কারণ প্রতিদিন এতো মৃতদেহ আসছে যে, তাৎক্ষনিকভাবে কবর খুঁড়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে রাজধানীর কবরস্থানগুলোতে মৃতদেহ প্রায় ৮ গুণ বেশি এসেছে।

এবারও যখন করোনার পিক টাইম সেই মুহুর্তে, গত বছরের মতো গত কয়েকদিন থেকে টেস্টের পরিমান কমিয়ে আনা হয়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় টেস্টের হার কমেছে ১৯%। একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে টেস্ট কমিয়ে আনা হয় যাতে সংক্রমণের সংখ্যা কম দেখায়। কিন্তু দেখা যায় সংক্রমণের হার ও মৃত্যু বাড়তির দিকেই থাকে। কারণ এই দুটিকে টেম্পার করা সম্ভব হয় না। গত বছরেও ঠিক এমনটিই ঘটেছিলো! টেস্ট কমিয়ে আনা আত্মঘাতি একটি বিষয় করোনা প্রতিরোধে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, লকডাউন এবং মানুষের অনাগ্রহের কারণে টেস্ট কম হচ্ছে। গত বারেও যা বলেছিলো!! জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে টেস্ট বাড়ানোর জন্য তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেওয়া ছিলো। ০১. টেস্টের ফি প্রত্যাহার করে নেওয়া। ০২. লকডাউন শুরুর পূর্বেই রাজধানী সহ দেশের সকল পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়নের ওয়ার্ডগুলোতে নমুনা সংগ্রহের একাধিক বুথ স্থাপন করা। র‌্যাপিড এন্টিজেন টেস্ট করা। ০৩. টেস্টের এই কার্যক্রম সফল করার জন্য জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা। সরকার এর কোনটিই না করে, সমস্যা সমাধানের পথে না হেঁটে বরাবরের মতো এক্ষেত্রেও জনগণের উপর দায় চাপিয়ে দিচ্ছে। সরকারের করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়, যেনতেন প্রকারে ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে সেটা জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া। মনে হয় তাহলেই করোনা মুক্তি ঘটবে!!
সমস্যা হচ্ছে, করোনা শনাক্তে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার জন্য ১ হাজার ২০০ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ও ১ হাজার ৮০০ টেকনিশিয়ান নিয়োগের কথা বলা হলেও অদ্যাবধি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ১০ মাস পার হলেও এটা চুড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। নানা ধরনের অনিয়ম আর ঘুষ বাণিজ্যে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে গেছে। টেস্ট বাধাগ্রস্থ হচ্ছে, শনাক্ত হচ্ছে কম। সামগ্রীকভাবে করোনা প্রতিরোধে বাঁধা তৈরি করছে। এবং এর জন্য বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। সঠিকভাবে রোগী চিহ্নিত হচ্ছে না, ট্রেসিং করা যাচ্ছে না, আইসোলেশন, কোয়ারাইন্টাইনের বাইরে থেকে যাচ্ছে, চুড়ান্তভাবে মৃত্যু বেড়ে যাচ্ছে। সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এই দায় কার??

আজকে আইসিইউ কেন্দ্রীক সংকট দেখা যাচ্ছে। সেটির সৃষ্টি হতো না, যদি এক বছর পূর্বেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসারে সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার ব্যবস্থা করা সম্ভব হতো। গত দেড় মাসে রোগী বেড়েছে ৩০০% আর হাসপাতালের আসন বেড়েছে ৪%। ২৮ ফেব্রয়ারিতে সারাদেশে আক্রান্ত সাধারণ রোগী ভর্তি ছিলো ১ হাজার ৩৮১, আইসিইউতে ছিলো ১৪৭। দেড় মাস পর ১৫ এপ্রিল সাধারণ শয্যায় রোগী বেড়ে হয়েছে ৫ হাহাজার ৫৯৬ ও আইসিইউতে ৬৫২ (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর)। দেশে এখন চাহিদার তুলনায় দিনে প্রায় ৬০ টন অক্সিজেনের ঘাটতি রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে সমালোচনা হলে ডিজি মহোদয় আবার রাগান্বিত হচ্ছেন।

গত ১৪ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে জনস্বাস্থ্যবিদ ও গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি ক্ষোভ জানিয়েছেন। যখন রোগী সাধারণ শয্যা, আইসিইউ পাচ্ছে না, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে পথেই মৃত্যুবরণ করছেন। হেলথ এর ডিজি যেখানে আত্মসমালোচনা করে ভুল কাটিয়ে ওঠার জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করবেন, উল্টো তাদের ব্যবস্থাপনার দূর্বলতার সমালোচনা করার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। জনস্বাস্থ্যবিদগণ যে পরামর্শ প্রদান করেছেন সেগুলি যদি আপনারা ঠিকমতো গ্রহণ করতেন তবে আজকের এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো না।

ক্ষোভ দেখিয়ে বলেছেন, জনস্বাস্থ্যবিদরা রোগীর কাছে যান না, টিভি তে মুখ দেখিয়ে বেড়ান। আপনি একজন চিকিৎসক হিসাবে কিভাবে বিস্মৃত হলেন, মেডিক্যাল টার্মে ক্লিনিক্যাল ও নন ক্লিনিক্যাল বলে দুটি বিষয় আছে। এমবিবিএস শেষ করার পর যারা ক্লিনিক্যাল সেক্টরে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেন তারাই সরাসরি রোগীর চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। আর ননক্লিনিক্যাল সেক্টরে (পাকলিক হেলথ, হেলথ ইকোনমিক্স, মাইক্রোবায়োলজি, জেনেটিক ইঞ্জিয়ারিং প্রভৃতি) যারা উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেন সাধারণত সরাসরি রোগীর চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন না। তাঁরা গবেষণা ও চিকিৎসা-রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করেন।

এ ধরনের মহামারীকালীন পরিস্থিতিতে ক্লিনিক্যাল যারা আছেন তাঁরা সরাসরি রোগীর চিকিৎসা সেবা প্রদান করবেন, আর যারা নন ক্লিনিক্যাল আছেন তাঁরা, চিকিৎসা সেবা যারা প্রদান করছেন তার ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণার দিক দেখবেন। সেই অনুযায়ী পরামর্শ প্রদান করবেন। ডিজি মহোদয় যাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন তারা প্রত্যেকেই নন ক্লিনিক্যাল পারসন। তাঁরা যথাযথভাবেই তাদের দায়িত্ব পালন করছেন, বরং ডিজি সাহেবরা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে ‘উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে’ চাপানোর চেষ্টা করছেন।

তবে এটা ঠিক যে, এদের মধ্যে যারা যখন বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে ছিলেন তারাও খুব বেশি কিছু করতে পারেননি। তার কারণ আমাদের এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা লুটেরা ধনীক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে। এ কারণেই এখানে জনস্বাস্থ্য অবহেলিত। তাদের ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রের কারণে অন্য সেক্টরের মতো চিকিৎসা ব্যবস্থা পুরোটাই ভেঙ্গে পড়েছে। এখন তারা নিজেরা নিজেদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না। তারপরেও আত্মসমালোচনা নেই, কারণ ফ্যাসিস্ট কখনওই নিজের ত্রুটি স্বীকার করে না।

রোগীর সুস্থতা নিয়ে আগে থেকেই ধুম্রজাল ছিলো। গত ৩ দিনে সেটি আরো বেড়েছে। গত কয়েকদিন হাসপাতালে অনেক রোগী ভর্তির চাপ রয়েছে। যাদের অক্সিজেন দেওয়ার পর অবস্থার একটু উন্নতি ঘটছে তাদের হাসপাতাল থেকে রিলিজ করা হচ্ছে। যাতে অপেক্ষমান অন্য গুরুতর রোগীকে ভর্তি করা যায়। কিন্তু যাকে রিলিজ করা হচ্ছে তারা সকলেই অসুস্থ হলেও এই রিলিজ তালিকা অনুসারে সুস্থতা ঘোষণা করা হচ্ছে! ফলশ্রুতিতে আমরা প্রতিনিয়তই একটা ফেক তথ্যের মধ্যে থাকছি।

এই পরিস্থিতিতে সর্বাত্বক লকডাউনের কথা বলা হলেও মূলত সেটি কার্যকর হচ্ছে প্রধান সড়কগুলোতে। অলি-গলি-মহল্লাতে তার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য যে ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, সেটি পুরোপুরি অনুপস্থিত। ইতিমধ্যে আজকে দিয়ে ৫ দিন পার হলেও, সাতদিন পর কী হবে এ বিষয়ে এখনও কোন নির্দেশনা বা পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়নি। শ্রমজীবী মানুষের কী হবে, গার্মেন্টস কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হতে পারে অথবা আরো যারা আছেন তাদের কারো প্রশ্নেই কোন সামগ্রীক পরিকল্পনা নেই।

করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ দরিদ্র পরিবার ও কাজ হারানো শ্রমিকদের সহায়তা দিতে ২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়। যার মধ্যে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্থ দরিদ্র পরিবারের জন্য। এখনও পর্যন্ত ৪৩৯ কোটি টাকা বিতরন করা যায়নি। শ্রমিকদের ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই তহবিল মিলে থেকে গেছে ১ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। এছাড়া গত বছরে এডিবির করোনা নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দকৃত অর্থ এখনও পর্যন্ত ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।

যে ৩৬ লাখ ৭ হাজার ৮৭২ পরিবারের কাছে আড়াই হাজার করে টাকা পাঠানো হয়েছে তার মধ্যে আবার ৪ লাখ ২ হাজার ১৬৮ টি পরিবারের কাছে টাকা না পৌঁছে সেটা থেকে গেছে মোবাইল আর্থিক সেবা দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে। কাজটি শুরু করা হয়েছিলো গত বছরে ১৪ মে (প্র.আ.-১১.০৪.২১)। যাদের মধ্যে বিতরণ হয়েছে এদের অনেকেই শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে রাত্রি যাপন করে!!

যারা বলে থাকেন, সরকারের লকডাউন চালানোর ১৫ দিনের সামর্থ্য নেই তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, সরকার চাইলেই এটা পারে। এই যে, প্রায় এক বছর পার হলেও বরাদ্দকৃত টাকার ব্যয় নিশ্চিত করা যায়নি তার অন্যতম কারণ আমলাতান্ত্রিকতা, অনিয়ম-দুর্নীতি। এ বিষয়ে জোর কন্ঠে আওয়াজ তুলুন। এই সব অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হলে শ্রমজীবী মানুষের এক মাসেরও বেশি সময়ের দায়িত্ব সরকারের পক্ষে নেয়া সম্ভব।
‘এক অদ্ভুত মাটির উপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি; অর্থাৎ দাঁড়িয়ে থাকার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছি এ মাটির গর্ভে কী আছে আজও আমাদের জানা নেই যদিও কান পাতলে শুনতে পাওয়া যায় এক লক্ষ সাপের গর্জনের চেয়েও কোন ভয়ঙ্কর পরিণাম, যা ক্রমেই আসন্ন হচ্ছে’।

লেখক : সাবেক সভাপতি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যুব পরিষদ

শেয়ার করুন