ডেস্ক রিপোর্ট
৫ এপ্রিল ২০২৬, ২:৩২ অপরাহ্ণ
রাজেকুজ্জামান রতন :
প্রকাশ্যে ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়ার হুংকার দিচ্ছেন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সর্বাধুনিক বিমান আর মিসাইল ছুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়, সেতু, তেলের ডিপো, পানির আধার সব জায়গায় হামলা করে ধ্বংস করা হচ্ছে। নিজের সীমিত সামর্থ্য, স্বল্প ব্যয়ের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মরিয়া হয়ে প্রতিরোধ করে যাচ্ছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ইরানের ওপর হামলা বাড়ানোর জন্য, জাতিসংঘকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। সেখানে বাধা দিয়েছে রাশিয়া, চীন এবং ফ্রান্স। এসব ঘটনা শুধু উত্তেজনার খোরাক জোগাচ্ছে না, বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ যেখানেই হোক না কেন, তার প্রভাব বাংলাদেশে পড়বেই। যদিও কোনো কোনো যুদ্ধে বাংলাদেশে প্রভাব পড়ার প্রত্যক্ষ কারণ না থাকলেও, বাজারকে অস্থির করার সুযোগ সন্ধানীরা এর সুফল নিয়ে, জনগণের জীবনকে অস্থির করবেনই। অতীতে করেছেন, বর্তমানেও করছেন। আর ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণ তো শুরু থেকেই আশঙ্কার পারদ চড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি। আশঙ্কা থেকে জন্ম নিয়েছে অস্থিরতা। এখন আতঙ্কে রূপ নিতে যাচ্ছে। তেলের পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন। কার, মাইক্রোবাস আর মোটরসাইকেল। কেউ বলছেন, ৫ ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি, কেউবা তার চেয়েও বেশি সময় অপেক্ষা করছেন, তেল পাবেন বলে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, তেলের কোনো সংকট নেই। সৃষ্টি করা হচ্ছে, কৃত্রিম জটিলতা। কেউ করছে মজুদ আর কেউ করছে আতঙ্কে কেনাকাটা। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে, যা তেল আছে তাতে চলবে ১৫-২০ দিন বা এক মাস। কোনটা সত্য, তা যাচাই করার উপায় নেই। কিন্তু পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না এটাই সত্য। মানুষ অধৈর্য হয়ে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে কোনো কোনো জায়গায়।
অন্যদিকে উদ্ধার করা হচ্ছে হাজার হাজার লিটার তেল। খাটের নিচে বোতলেও জমিয়ে রেখেছেন কেউ কেউ। এসব দেখে হাসির মধ্যেও কান্না আসে। মানুষের এত সংকীর্ণতা! আমদানি করা তেলের মধ্যে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডিজেলের। ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন, জেট ফুয়েল মিলে ৬৫ থেকে ৬৭ লাখ টন তেল লাগে প্রতি বছর। বাস-ট্রাক-রেল-বিমান- বিদ্যুৎকেন্দ্র চলে এসব দিয়ে। কিন্তু এখন শহর, গ্রামে তেলের জন্য যে হাহাকার এবং দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে, তার অধিকাংশই অকটেন ও পেট্রলের জন্য। ব্যক্তিগত পরিবহনে তেলের চাহিদা পূরণ করতে, হিমশিম অবস্থা তৈরি হয়েছে অধিকাংশ পেট্রলপাম্পে। হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়, বরাদ্দকৃত তেল ফুরিয়ে অনেক ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অনেক পাম্পে ডিজেল থাকলেও, টান পড়েছে অকটেন ও পেট্রলে। ডিজেল বাংলাদেশ প্রায় পুরোটাই আমদানি করে। আর বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট থেকে দৈনিক প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার ব্যারেল পেট্রল ও অকটেন উৎপাদিত হয়। তাহলে অঙ্ক বলে, দেশে তেলের মজুদ এবং উৎপাদন সক্ষমতা মিলিয়ে পেট্রল-অকটেনের এমন সংকট হওয়ার কথা নয়। সিলেটের গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় গ্যাসের সঙ্গে যে কনডেনসেট (গ্যাস উৎপাদনের সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া তরল হাইড্রোকার্বন) পাওয়া যায়, সেটি প্রক্রিয়াজাত করে বাংলাদেশ পেট্রল ও অকটেনের চাহিদার একটা বড় অংশ উৎপাদন করে। ইরান যুদ্ধ এবং তেলের মজুদ নিয়ে নানা খবরে আতঙ্ক থেকেই পেট্রল ও অকটেনের অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে বছরে পেট্রলের চাহিদা চার লাখ ৬২ হাজার টন ও অকটেনের চাহিদা চার লাখ ১৫ হাজার টন। বাংলাদেশে নিজস্ব উৎপাদন ও ক্রুড অয়েল থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিশোধন করে বলে পেট্রল আমদানির প্রয়োজন হয় না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত কনডেনসেট থেকে দুই লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি, অর্থাৎ মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক পেট্রল উৎপাদিত হয়েছে। এ ছাড়া অকটেন হয়েছে মোট চাহিদার প্রায় চারভাগের একভাগ।
বিশ্ববাজার থেকে তেল আমদানি পুরো বন্ধ হয়ে গেলেও, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে পেট্রল ও অকটেনের দিক থেকে একেবারে জ্বালানিশূন্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। এর মধ্যে পেট্রোবাংলার কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্টে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ করে প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার ৬৬২ মেট্রিক টন পেট্রল এবং ৫৫ হাজার ৩৩৯ মেট্রিক টন অকটেন উৎপাদন করেছে। বাংলাদেশের নিজস্ব কনডেনসেট থেকে পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন করে সরকারি কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্ট এবং চারটি বেসরকারি রিফাইনারি। দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসা কনডেনসেট থেকে সবচেয়ে বেশি পেট্রল ও অকটেন, কেরোসিন ও ডিজেল এবং অল্প পরিমাণ এলপিজি উৎপাদন করে হবিগঞ্জ অবস্থিত সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট ও ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিট বা সিআরইউ। হবিগঞ্জের প্ল্যান্টে বর্তমানে, প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট বিভাজন করে ৬শ ব্যারেলের (৭৪ মেট্রিক টন) মতো অকটেন, তিন হাজার ৪৫০ ব্যারেল বা ৪২০ মেট্রিক টন পেট্রল, ১৫০ ব্যারেল বা ২০ মেট্রিক টন ডিজেল ও ১শ ব্যারেল বা ১৩ মেট্রিক টন কেরোসিন এবং ১৭ ব্যারেল বা ১.৫ মেট্রিক টন এলপিজি উৎপাদন হচ্ছে। এসজিএফএলের লিকুইড পেট্রোলিয়াম মার্কেটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জীবন শান্তি সরকার জানান, এসজিএফএলের প্ল্যান্ট দেশীয় কনডেনসেট থেকে দৈনিক চার হাজার ব্যারেলের বেশি পেট্রল এবং অকটেন উৎপাদন করছে। এই তেল দেশের মোট পেট্রলের চাহিদার, ৩৩-৩৫ শতাংশ এবং অকটেনের চাহিদার ৭-৮ শতাংশ, কেরোসিনের চাহিদার ৭ শতাংশ এবং ডিজেল চাহিদার ০.২ শতাংশ পূরণ করতে পারে। বাংলাদেশে সিলেট গ্যাসফিল্ডসের কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট ছাড়াও চারটি বেসরকারি রিফাইনারি দেশীয় কনডেনসেট থেকে প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রল অকটেন, কেরোসিন ও ডিজেল উৎপাদন করে। বাংলাদেশে ফিনিশড প্রোডাক্ট হিসেবে, ‘পেট্রল আমদানির প্রয়োজন হয় না। দেশীয় উৎপাদিত কনডেনসেট থেকে, দেশের মোট পেট্রলের চাহিদার প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। আর বাকিটা ইআরএল (ইস্টার্ন রিফাইনারি লি.) ক্রুড অয়েল থেকে এবং প্রাইভেট কোম্পানিগুলো ইমপোর্টেড কনডেনসেট থেকে পেট্রলের চাহিদা পূরণ করছে। অকটেনের চাহিদা অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি প্রায় ৬২ শতাংশ অকটেন উৎপাদন করেছে, বাকি চাহিদা দেশীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।নিজস্ব কনডেনসেট থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদন করে সিলেট গ্যাস ফিল্ড। সিলেটের দুটি প্ল্যান্টে দৈনিক সাড়ে সাত হাজার ব্যারেল কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে গ্যাসের উৎপাদন ও কনডেনসেট উৎপাদন কমে গিয়ে এখন প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট বরাদ্দ পায় সিলেট গ্যাসফিল্ডের কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট।
ইরান যুদ্ধের কারণে তেল সংকট সৃষ্টির পর, পেট্রোবাংলার নির্দেশনা অনুযায়ী, হবিগঞ্জ সিআরইউতে দৈনিক অকটেন উৎপাদন ১শ ব্যারেল বৃদ্ধি করে ৭শ ব্যারেল উৎপাদন করা হচ্ছে এবং সপ্তাহে পাঁচদিনের পরিবর্তে সাত দিন লরিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। হবিগঞ্জে উৎপাদিত পেট্রল-অকটেন সিলেট অঞ্চল এবং রংপুর, পার্বতীপুর ও বাঘাবাড়ি এলাকায় সরবরাহ করা হয়। সরকার বলছে, স্বাভাবিক চাহিদা পূরণের জন্য বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় মজুদ ও তেল আমদানি করা হচ্ছে। মে মাস পর্যন্ত মজুদ সব ধরনের তেলের মজুদ নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রলপাম্প মালিক সমিতি জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে, গ্রাহকদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না কেনার আহ্বান জানিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পাম্পে সবার হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেও জানান পাম্প মালিকরা। বৃহত্তর ময়মনসিংহ পেট্রলপাম্প মালিক সমিতি বলেছে, মানুষ অতিরিক্ত তেল কিনে মজুদ করার কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে আগে প্রতিদিন ৫-৬ হাজার লিটার তেল বিক্রি হতো। পেট্রল দুই হাজার লিটার আর ডিজেল তিন হাজার লিটার। এখন সেই ডিমান্ড হয়ে গেছে, ২০ হাজার- ৩০ হাজার লিটার। পেট্রল অকটেনের মজুদ এবং উৎপাদন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে পেট্রল অকটেনের এই চাহিদা অস্বাভাবিক। তবে একটা বিষয় ভেবে দেখার মতো। বিবিয়ানার উৎপাদন ১২শ-১৩শ মিলিয়ন থেকে ৮শ-৯শ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে গেছে। তাতে আমাদের নিজস্ব সরবরাহ থেকে পেট্রলের চাহিদা মেটানো যাবে। তবে অকটেন কিছুটা আমদানি করতে হবে। এ তো আমরা বুঝতে পারি, কিন্তু এখন কেন সংকট? তবে কি গাড়ির লাইন অনেকটা প্যানিক পারচেজ!
জ্বালানি নিয়ে এই সংকট বিপদে ফেলছে, কৃষক এবং সাধারণ মানুষকে। পরিবহনের অভাবে মাঠে নষ্ট হচ্ছে সবজি, টমেটো, তরমুজ, আনারস। কৃষকের নিঃশব্দ হাহাকার বা নীরব কান্নার পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিচ্ছে। তেলের দাম এখনো বাড়েনি, বেড়েছে ট্রাক ও পিকআপের ভাড়া। জমিতে সেচের কী হবে, সেই চিন্তায় কৃষকের কপালে ঘামের রেখা। ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি, খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি মানুষকে ভাবাচ্ছে। তেলের দাম বৃদ্ধির অপেক্ষায় আছেন ব্যবসায়ীরা। তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা এবং বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি একই সঙ্গে ঘটবে। তেলের জন্য যুদ্ধ, সম্পদের জন্য যুদ্ধ এটা দেখছে সবাই। কিন্তু নিঃশব্দ যুদ্ধ চলছে বাজারে, যার প্রভাব পড়বে চাকরি, মজুরি, দ্রব্যমূল্য আর সবশেষে ভাতের পাতে। অনেকে দেখছেন, ট্রাম্পের যুদ্ধ এবং হুংকার। ট্রাম্প একজন যুদ্ধোন্মাদ। কিন্তু বাইডেন, ওবামা, ক্লিনটনের সময় কি ফিলিস্তিন, লেবানন, গাজা, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইউক্রেন যুদ্ধ হয়নি? আর যুদ্ধ হোক বা না হোক, শ্রমিক কৃষকের জীবনে কি সংকট আসেনি? যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, নির্মমতা আর জনগণ দেখছে শোষণের নিয়ম। একটা সংকট মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার কথা। কিন্তু সংকটের সুযোগ নেয় পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ীরা। তেল সংকটের পাশাপাশি এই বিষয়টাও যেন, জনগণের খেয়াল থাকে। আমেরিকায় মানুষ লড়ছে, নো কিং আন্দোলনে। আমাদেরও সতর্ক থাকতে হবে, যুদ্ধের নামে জনগণের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা এসব চক্রান্তের বিরুদ্ধে।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক