ডেস্ক রিপোর্ট
২৯ মে ২০২৩, ৯:১২ অপরাহ্ণ
আবু নাসের অনীক::
বাংলাদেশের জন্য সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় মার্কিন ভিসা নীতি। রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু এখন এটি। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথে জ্বী হুজুর-জ্বী হুজুর করতে করতে সরকারীদল,বিএনপি ও জাতীয় পার্টি একইসাথে মার্কিন দূতাবাসে ছুটে গেছেন রাষ্ট্রদূতের সাথে মিটিং করার জন্য বিনা আমন্ত্রণেই! অথচ তারা নিজ উদ্যোগে কখনওই একসাথে বসার প্রয়োজন অনুভব করেনি দেশের সংকট প্রশ্নে!
বিষয়টি সম্পর্কে সরকার আগে থেকেই অবগত ছিলো। এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে যখন বৈঠক হয়, সেখানে বাংলাদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনায় এই প্রসঙ্গটি উঠে আসে। এ বিষয়ে তারা সরকারের মতামতও গ্রহণ করে। ভিসা সংক্রান্ত এ নতুন নীতির সিদ্ধান্তের কথা যুক্তরাষ্ট্র গত ৩রা মে বাংলাদেশের সরকারকে জানায়।
যুক্তরাষ্ট্র এধরনের ভিসা নীতি শুধুমাত্র যে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে প্রথমবার করেছে এমনটি নয়। অনেক দেশের জন্যই সে এটা করেছে। সেসব দেশের সাথে পার্থক্য হলো সেখানে ঘোষণা হয়েছে নির্বাচনের পর আর বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে করা হলো নির্বাচনের পূর্বে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ভিসা নীতিকে শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলই স্বাগত জানিয়েছে। কারণ এদের একটি অংশ যেকোন কায়দায় ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায় আর অন্য অংশটি যেকোন উপায়ে ক্ষমতায় যেতে চায়! তাতে যদি তাদের নিজেদের জামাকাপড় খুলে উলঙ্গ করে দেওয়া হয় সেটি মানতেও তারা রাজি।
ক্ষমতায় টিকে থাকা ও যাওয়ার জন্য নেংটা হয়ে নৃত্য করতেও তাদের লজ্জার কিছু নেই! কারণ নেংটা হয়ে নাচার পরিস্থিতিটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারাই তৈরি করেছে ধারাবাহিকভাবে। তাদের সার্বিক কর্মকান্ডই যুক্তরাষ্ট্রকে এধরণের একটি অমর্যাদাকর ভিসা নীতি ঘোষণা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
এটি ভাবার কোন কারণ নেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রহীনতার জন্য মার্কিনের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তাদের ঘুম হচ্ছেনা এজন্য যে, সামনে নির্বাচনটি যদি ঠিকমতো না হয় তবে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হবে। সেধরনের পরিবেশ তৈরি হলে তাদের যে বিভিন্ন ইস্যু আছে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সেটি বাস্তবায়ন করা ঝুকিপূর্ণ হয়ে যাবে। ভূ-আঞ্চলিক রাজনীতিতে তার আধিপত্য বজায় রাখা কঠিন হবে।
আসুন দেখি, মার্কিন ভিসা নীতি কী বলছে, যে সব কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বানচালের আওতায় পড়বে তার মধ্যে আছে – ভোট কারচুপি, ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার প্রয়োগ করা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করার জন্য সহিংসতাকে কাজে লাগানো, এবং এমন কোন পদক্ষেপ – যার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক দল, ভোটার, সুশীল সমাজ বা সংবাদমাধ্যমকে তাদের মত প্রচার থেকে বিরত রাখা।
অর্থাত তাদের আওতায় সরকার এবং বিরোধী দল উভয়ই আছে। তবে একটু বিশ্লেষন করলেই বোঝা যাবে, এটা সরকারকে যতোটা চাপে ফেলবে তার চাইতে আরো বেশি চাপে ফেলবে বিরোধী দলগুলিকে তার দাবী বাস্তবায়নে।
বিরোধীদলগুলি বলে আসছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেনা। যদি তারা সেটি না করে তাহলে মার্কিনের ঘোষিত নীতির আওতায় ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বানচাল’ এর আওতায় পড়বে। অন্যদিকে বিরোধীদলগুলি শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী সরকারের কাছ থেকে আদায় করতে পারার কোন প্রশ্নই নেই!
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার একজন সাংবাদিকের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে বলেন,‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে আমাদের কোন মাথাব্যাথা নেই। আমরা এই বিষয়টি নিয়ে কিছুই ভাবছি না।’
সাথে সাথে তিনি এটিও বলেন,‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রশ্নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র তার সমর্থনকে শেয়ার করছে। বুধবার যে নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছে, তা সেই প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার লক্ষ্য নিয়েই তৈরি করা হয়েছে। একই সাথে এর লক্ষ্য, বাংলাদেশের জনগণ যাতে একটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন এবং তাদের নেতা বেছে নিতে পারেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু চ্যানেল-আই তৃতীয় মাত্রায় বলেছেন, এটা সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা নীতি, যা এখনো কারও ওপর প্রয়োগ হয়নি, যারা নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে আদেশ প্রদান করবে এবং যারা আদেশ বাস্তবায়ন করবে, তাদের সবার ওপরই ভবিষ্যতে প্রয়োগ করা হবে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই এর আওতায় রাখা হয়েছে।
অর্থাত বর্তমান সরকারের অধীনেই বিএনপিসহ অন্যদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অন্যকোন বিকল্প নেই এই ঘোষণার আলোকে। বলা যায়, মার্কিন এই ভিসা নীতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুটিকে ডেড করে ফেলেছে। মার্কিনের সাথে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে তাদের জন্য! আমার মনে হয়েছে, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ এই ইস্যুটির বিষয়ে সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আন্ডারষ্টানডিং তৈরি হয়েছে। সেটিকে আমলে নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে।
টাঙ্গাইল যুবলীগের সমাবেশে প্রেসিডিয়াম মেম্বার, মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ভিসা নীতির প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘অবশ্যই নির্বাচনে একটা প্রভাব বিস্তার করবে। তার অর্থ এই না আমরা জাতীয় সংসদে হেরে যাবো। ৩০০ সিট রয়েছে, কিন্তু আমার দরকার ১৫০ সিট। আমি কি সব সিটে জিতবো। আমরা সব জায়গায় জিততে পারি না। নানা ফ্যাক্টর কাজ করে।’
অনেকেই বলার চেষ্টা করছেন ভিসা নীতির প্রভাব পড়েছে গাজীপুরের নির্বাচনে। উভয় প্রার্থীই এখানে সরকারী দলের ছিলো। ইতিমধ্যেই জাহাঙ্গীর বলেছেন, ‘এখানে নৌকার হার হয়নি, একজন ব্যক্তির হার হয়েছে।” অল্প কিছুদিন এর মধ্যে এটাও দেখবো তার বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার হয়েছে এবং তার মা নির্বাচিত মেয়র আওয়ামীলীগে যোগ দিয়েছেন।
জাহাঙ্গীর এর নামে যতো অভিযোগই থাকুক ব্যক্তি হিসাবে এলাকায় জনপ্রিয়। অন্যদিকে আজমতউল্লাহ সাহেবের জনসম্পৃক্ততা খুবই কম। এখানে জাহাঙ্গীর এর সাথে রিগিং করার মতো কোন সুযোগ ছিলোনা, কারণ তার জনপ্রিয়তাকে সরকারি দল কাউন্ট করেছে শেষে এসে। আর অযথা ঝুঁকি গ্রহণ করার তার তো এখানে কোন দরকার নেই। যেহেতু বিজয়ী তার কোলেই উঠে বসবে আজ অথবা কাল। সুতরাং ভিসা নীতির প্রভাব এখানে পড়েনি।
এখন দেখার বিষয় বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি যারা বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না, তাদের অবস্থানটা কী হয়। রাজনৈতিকভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করলেও বামপন্থী নেতাদের অনেকের সন্তান-পরিজনই কিন্তু আমেরিকায় থাকেন এবং তারাও নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন!
আমি মনে করি, বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলিও যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী বাস্তবায়ন না হলে নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছে বিএনপি’র সাথে, তারাও বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন।
এটি হবে রাজনৈতিকভাবে তাদের বিরাট পরাজয়। অবশ্য এই পরাজয় বরণ করা ছাড়া তাদের সামনেও নিজস্ব কোন পথ খোলা নেই। কারণ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল কেন্দ্রীক তাদের নিজস্ব কোন রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের অস্তিত্ব নেই! তারাও গতানুগতিক রাজনীতির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
৫২ বছর আগে রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনকারী একটি দেশকে মার্কিন ভিসা নীতির প্রভাবে তার রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হচ্ছে; এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কী হতে পারে! শাষকগোষ্ঠীর লুটেরা রাজনৈতিক দলগুলির নিজেদের খেয়োখেয়ি আর ক্ষমতাসীনদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত করার নেতিবাচক ফলাফল আজকের এই বাস্তবতায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ব্যতীত এই লুটেরাদের হাত থেকে আমাদের মুক্তি নেই! আর তার জন্য প্রয়োজন জনগণের সংগঠিত শক্তির বিকাশ ।