ডেস্ক রিপোর্ট
৬ এপ্রিল ২০২৩, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক: বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) ৫ দফা দাবিতে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি পেশ করেছে ৫ এপ্রিল, ২০২৩, বুধবার। স্মারকলিপি পেশের পূর্বে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের উদ্যোগে পল্টন মোড়ে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সমন্বয়ক মাসুদ রানার সভাপতিত্বে ও সদস্য জয়দীপ ভট্টাচার্যে্যর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সদস্য ও বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সভাপতি সীমা দত্ত, কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সদস্য ও বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক রাজু আহমেদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সদস্য রাশেদ শাহরিয়ার ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি সালমান সিদ্দিকী।
সভার শুরুতেই বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সমবেদনা জানানো হয়। ব্যবসায়ী, দোকান কর্মচারি, পণ্য পরিবহনের কাজে যুক্ত শ্রমিকসহ ক্ষতিগ্রস্ত সকলকে সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানানো হয়। একইসাথে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার তদন্তের দাবি জানানো হয়।
সীমা দত্ত বলেন, “দেশে নারী ও শিশু হত্যা, ধর্ষণ বাড়ছেই। শুধুমাত্র ২০২২ সালেই ধর্ষিত হয়েছে ৪ হাজার ৩৬০ জন নারী, এর মধ্যে ৪৫০ জনকে আবার ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ২০২২ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৬০ জন শিশু। বিচারহীনতা, অপরাধীদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে না পারলে, তা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।”
রাজু আহমেদ বলেন, “করোনা মহামারী ও পরবর্তীতে বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে এ দেশের শ্রমিক ও কৃষকসহ শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু বেঁচে থাকার মতো মনুষ্যোচিত মজুরি থেকে শ্রমিকরা বঞ্চিত। স্বাধীনতার এত বছর পরেও তাদের নিম্নতম কোন জাতীয় মজুরি নেই। কৃষক হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। অথচ মধ্যস্বত্ত্বভোগী ফড়িয়াদের কারসাজিতে কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেনা। সার, বীজ, কীটনাশক, সেচের মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষক দিশেহারা। দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপীদের একের পর এক ঋণ মওকুফ করা হয়, অথচ সামান্য ঋণের দায়ে লক্ষ লক্ষ কৃষকের নামে সার্টিফিকেট মামলা দিয়ে হয়রানি চলছে।”
রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, “এরশাদ সরকারের পতনের পর সাংবিধানিক সংকট উত্তরণের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা এসেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে বিএনপি সরকারের সময় মাগুরা উপনির্বাচনের নমুনা দেখে জনগণ বুঝতে পেরেছিল বাংলাদেশের বিদ্যমান দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাস্তবতায় দলীয় সরকারের অধীনে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনও সম্ভব নয়। সেসময় গণআন্দোলনের চাপে ও গণআকাঙ্খা অনুযায়ী বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান যুক্ত করতে বাধ্য হয়। সেদিন আওয়ামী লীগও এই আন্দোলনে যুক্ত ছিল। অথচ ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর যেকোনভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সংবিধান সংশোধন করে সে ধারাটি বাতিল করেছে। এখন তারা বলছে যে, তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন পরিচালনার বিধান সংবিধানে নেই। তাই সাংবিধানিক কারণে এটির বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
এই যুক্তি অচল। সংবিধান শাশ্বত অপরিবর্তনীয় কোন কিছু নয়। দেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্যই যদি সংবিধান হয় তাহলে দেশের জনগণ চাইলে অবশ্যই এটা পরিবর্তন করা যাবে। দলীয় সরকারের অধীনে বিগত ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন ও ২০১৮ সালের নৈশ নির্বাচন এবং গত ১৪ বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতায় দেশবাসীর সামনে এটা স্পষ্ট যে, বর্তমান সরকারের অধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই।”
সালমান সিদ্দিকী বলেন, “স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও সবার শিক্ষার অধিকার আজও নিশ্চিত হয়নি। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ—বেসরকারিকরণ সীমা ছাড়িয়েছে। মধ্যবিত্ত—নিম্নবিত্ত ঘরের সন্তানরা উচ্চশিক্ষার দরজায় পৌঁছাতে পারছে না। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ—বেসরকারিকরণ বন্ধ করে স্নাতক পর্যন্ত সবার জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।”
সভাপতির বক্তব্যে কমরেড মাসুদ রানা বলেন, “আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনমনে নানা উদ্বেগ—উৎকন্ঠা ও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমাদের দল বাসদ (মার্কসবাদী) ও আমাদের জোট ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ এর পক্ষ থেকে এবং প্রায় সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনের পূর্বে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানানো হয়েছে। সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে দলনিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানানোর পাশাপাশি আমরা মনে করি, নির্বাচনে জনগণ যাতে অবাধে ভোট দিতে পারে সেরকম একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। এজন্য নির্বাচন কমিশন আইন সংশোধন করে ও বর্তমান অনুগত কমিশন ভেঙ্গে দিয়ে একটি স্বাধীন ও আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা ভোটাধিকার আদায় করার জন্য জনগণকে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এমনকি ভোটাধিকার রক্ষা করতে হলেও গণআন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। আজকের দিনে গণআন্দোলন ছাড়া ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারও রক্ষা করা যাবে না। প্রায় তিনমাস ধরে আমরা স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি পালন করছি। আমাদের কর্মীরা তাদের সাধ্যমত দেশের পাড়ায় পাড়ায়, এলাকায় এলাকায় গেছেন। আমরা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী ও পুলিশের বাধার মুখে পড়েছি। তবু আমাদের কর্মীরা নিরস্ত হননি। সাধারণ জনগণ আমাদের অকুণ্ঠ সমর্থন করেছেন। আমাদের কর্মসূচিতে শুধু স্বাক্ষরই দেননি, তারা আমাদের সাহস দিয়ে, পাশে থেকে অনুপ্রাণিত করেছেন। আমরা জনগণের সহযোগিতা নিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় ও রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাব। আপনাদের সকলকে গণআন্দোলনের দল বাসদ (মার্কসবাদী)কে শক্তিশালী করার আহবান জানাই।”