ডেস্ক রিপোর্ট
২১ মার্চ ২০২৩, ১১:৪৭ অপরাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক: বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সমন্বয়ক কমরেড মাসুদ রানা আজ মঙ্গলবার, ২১ মার্চ ২০২৩ সংবাদপত্রে প্রদত্ত একবিবৃতিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দুইটি খাল খনন করে তিস্তা ও জলঢাকা নদীথেকে পানি প্রত্যাহার পরিকল্পনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং অবিলম্বে ভারতকে এ প্রকল্প বাতিলেবাধ্য করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ হতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন।
কমরেড মাসুদ রানা বিবৃতিতে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ সরকার দুইটি খাল খনন করে তিস্তার পানি ব্যবহার করে দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। অথচ তিস্তার উজানে ভারতের গজলডোবা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তাতে পানি কমে যায়। প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে তিস্তা নদীতে বর্ষার তিনমাস ছাড়া বাকি নয়মাস পানিশূন্য হয়ে পড়বে। শুধু তিস্তাই নয়,জলঢাকা নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে কুড়িগ্রাম জেলা দিয়ে প্রবাহিত ধরলা নদীও তিস্তার পরিণতি বরণ করবে। এর ফলে তিস্তানদী মরে যাবে, উত্তরাঞ্চলের সেচব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে পড়বে। এছাড়া এই অঞ্চলের প্রাণ—প্রকৃতিও ধ্বংসের সম্মুখীন হবে। ইতোমধ্যে তিস্তায় পানি না থাকায় আমাদেরদেশের বৃহৎ সেচ প্রকল্প ‘তিস্তা সেচ প্রকল্প’ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, তিস্তায় পানি না থাকায় এঅঞ্চলের ধরলা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, আখিরা, দুধকুমার, বুড়ি তিস্তাসহ প্রায় ৩৩টি ছোট বড় নদ—নদীতে তারপ্রভাব পড়ছে। রংপুর অঞ্চল ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে মাত্রাতিরিক্তভাবে। ভারতের এ প্রকল্প বাস্তবায়নেরখবর ভারতের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে। অথচ ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকার বরাবরের মতো নরম সুরে উদ্বেগ প্রকাশ ও দিল্লীকে চিঠিদেওয়ার গতানুগতিক দায়সারা তৎপরতাতেই সীমাবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবার বলে আসছেন, ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র, তারা আমাদের নিরাশ করবেনা।
অথচ ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও, ভারত শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস দিয়েইদীর্ঘ ১২ বছর তাঝুলিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে তিস্তা নদীর উজানে একের পর এক ব্যারেজও প্রকল্প করে পানি প্রত্যাহার করছে। একদিকে ভারত বাংলাদেশকে তার ন্যায্য পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে, আর বাংলাদেশ ভারতকেট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট, বন্দর ব্যবহার, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, সামরিক চুক্তিসহ একের পর এক সুযোগসুবিধাপ্রদান করছে। এটি বাংলাদেশ সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতিরই ফলাফল। সাম্রাজ্যবাদী ভারতের আগ্রাসী পানিনীতি এবং পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ক্ষেত্রে অতীতের সরকারগুলোর মতো আওয়ামী সরকারের নতজানু নীতির কারণে বাংলাদেশের মানুষ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পায়নি। বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত ৫৭টি অভিন্ন নদীর ৫৪টিই এসেছে ভারত থেকে।
ফলে দু’দেশের মধ্যেনদীর পানির ন্যায্য বণ্টন, সীমান্ত ও ছিটমহল সমস্যারসমাধান, বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ, জনগণের বাধাহীন যাতায়াত এসব সমস্যা নিয়ে জনস্বার্থের বিবেচনায় প্রয়োজনীয় আলোচনা ও উদ্যোগ গ্রহণছিল অত্যন্ত জরুরি। তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। ভারত চাইলেই একতরফাভাবে এমন আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করতে পারেনা এবং এ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিকআইনও বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু কোন একটি প্রশ্নেও আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠী কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করে নি। এর পরিবর্তে, বর্তমানক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকারসহ বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীর সব সময় প্রচেষ্টাছিল, জনগণের এসব সমস্যাকে সামনে রেখে নিজেদের লাভালাভ, পারস্পরিক লেনদেন, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থআদায় করা। বর্তমান সময়ে এর প্রত্যক্ষ ফলাফলহচ্ছে ট্রানজিট—ট্রান্সশিপমেন্ট—করিডোর, রামপাল বিদ্যুৎপ্রকল্প, ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়, এবং সর্বোপরি ক্ষমতায় থাকা ও যাওয়ার ক্ষেত্রেভারতের শাসকদের প্রত্যক্ষ—পরোক্ষ মদদ। উজানের দেশ এবং পরাশক্তি হিসাবে ভারতের কাছ থেকে জাতীয় স্বার্থ আদায়ে আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠীর উচিত ছিল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়গুলো উত্থাপন করা, বিশেষত নদীর পানির বিষয়টি। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারগুলো এ বিষয়ে বরাবরইসে পথ অনুসরণে বিরতথেকেছে, আগ্রহ দেখিয়েছে দ্বি—পাক্ষিক সমঝোতায়।
আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত ফোরামকে পাশ কাটিয়ে গোপন দ্বিপাক্ষিক লেনদেন—নির্ভর আলোচনায় শাসকদের বিশেষ আগ্রহের এক জাজ্বল্যমান উদাহরণহল জাতিসংঘ জলপ্রবাহ সনদে (ইউএন ওয়াটারকোর্সেস কনভেনশন, ১৯৯৭) বাংলাদেশের স্বাক্ষর না করা। এইকনভেনশনের সাত নম্বর ধারায় পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক প্রবাহের ক্ষেত্রে একটি দেশ এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না, যা আরেকটি দেশেরজন্য ‘ধর্তব্য ক্ষতির’ কারণ হয়। বাংলাদেশের উচিত ছিল, ১৯৯৭ সালের কনভেনশনে স্বাক্ষর করা, এবং অন্য দেশগুলোকে স্বাক্ষর করার জন্য রাজী করাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া। উজানে আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদী থেকে ভারত যেহেতু পানি প্রত্যাহার করছে, ফলে এ কনভেনশনে ভারতস্বাক্ষর করবেনা, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেন বাংলাদেশ এ কনভেনশনে এখনওস্বাক্ষর করছেনা, তা স্পষ্ট নয়।
আমরাদাবি জানাই, অবিলম্বে উজানে তিস্তানদী থেকে পানি প্রত্যাহার বন্ধ করতে ভারতকে বাধ্য করতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বিষয়টি উত্থাপন করতে হবে। একইসাথে নতজানু পররাষ্ট্রনীতি পরিত্যাগ করে ভারত থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বাংলাদেশ সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবিতে জনমত ও গণআন্দোলন গড়েতোলার জন্য আমরা জনগণের কাছে উদাত্ত আহবান জানাই।