ডেস্ক রিপোর্ট
২৪ আগস্ট ২০২২, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক:: আজ ২৪ আগস্ট, ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস। ১৯৯৫ সালের আজকের দিনে দিনাজপুরে কয়েকজন বিপথগামী পুলিশের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় ১৬ বছরের কিশোরী ইয়াসমিন। তবে ওই ঘটনার প্রতিবাদে দিনাজপুরবাসী যা করেছিল, তাতে কেঁপে গিয়েছিল পুরো বাংলাদেশ। টানা কয়েক দিন পুরো দিনাজপুর জেলা কার্যত অচল করে দেয় বিক্ষোভকারীরা। কারফিউ-গুলি কোনো কিছুই তাদের দমাতে পারেনি সেদিন। ক্ষোভ সামাল দিতে দিনাজপুর পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়। আরও ১০৫ পুলিশ কর্মকর্তা এবং সদস্যকেও বদলি করা হয় অন্যান্য জেলায়। অভিযুক্ত তিন পুলিশ সদস্যকে আটক করে মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হয়। প্রবল বিক্ষোভের মুখে পাঁচ দিন পরে ময়নাতদন্ত এবং সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির জন্য ইয়াসমিনের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করা হয়। ময়নাতদন্তের পর অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বিচারের মাধ্যমে তারা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল। ঘটনার ৯ বছর পর ২০০৪ সালে সেই পুলিশ সদস্যকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
কিন্তু আলোচিত সেই অপরাধ আর দৃষ্টান্তমূলক সেই শাস্তির পরও থেমে নেই নারীর প্রতি সহিংসতা; বরং ইদানীং তা বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলা নিষ্পতিতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়া ও সঠিক বিচার না হওয়ায় ধর্ষণ ও নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না। সূত্র জানিয়েছে, দিনাজপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সাড়ে ৪ হাজারের অধিক মামলা আটকে আছে। গত ৮ মাসে আদালতে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ মামলা হয়েছে ৮৭১টি। আর ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই আদালতে মামলা হয় ১ হাজার ২৭৬টি।
আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তৈয়বা বেগম বলেন, বর্তমানে আদালতে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি নারী ও নির্যাতন মামলা জট রয়েছে। মূলত মামলার সাক্ষীরা সঠিক সময়ে উপস্থিত হন না। তাই মামলাগুলোর কার্যক্রম বেশি দিন ধরে চলছে। মামলার সাক্ষীদের সঠিক সময়ে উপস্থিত করা গেলে মামলার সংখ্যা অনেকটা কমে আসবে। তবে এর পেছনে আরও অনেক কারণ আছে বলে মনে করেন এই আইনজীবী।
এদিকে ইয়াসমিনকে নিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দিনাজপুর-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল বলেন, সে সময় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিনাজপুরবাসীর পাশে থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান সরকার নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করলেও এ ঘটনা কমছে না। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা প্রতিরোধে সবাইকে এক যোগে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নারী নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করছে বেসরকারি সাহায্য সংস্থা পল্লী শ্রীর হিসাবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস শেষে জুন মাস পর্যন্ত সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪ হাজার ৭৬৯ জন নারী-শিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের পর মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৭২ জন নারীকে। আত্মহত্যা করেছে ৬ জন নারী। আইন সংক্রান্ত মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের এবং স্বামী কর্র্তৃক হত্যার শিকার হয়েছে ৯৪ জন নারী। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক শামীম আরা বেগম বলেন, সমাজের পুরুষ মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি যত দিন পাল্টানো যাবে না, যত দিন মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগবে, সঠিক বিচার হবে না, তত দিন নারী নির্যাতনের ঘটনা কমবে না। তিনি বলেন, ‘নারীদের প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধ করতে আইনের সঠিক প্রয়োগ প্রয়োজন।’
এদিকে ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস উপলক্ষে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে অবস্থিত ইয়াসমিনের স্মৃতিসৌধে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ, কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ইয়াসমিনের মা শরীফা বেগম তার বাড়িতে দুস্থদের মাঝে খাদ্য বিতরণ ও দোয়ার আয়োজন করেছেন।