ডেস্ক রিপোর্ট
১৪ জুন ২০২২, ১:৪৮ পূর্বাহ্ণ
আবু নাসের অনীক::
গত কয়েকদিন যাবত মুসলিম সম্প্রদায় এর মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই উত্তেজনার বিষয়বস্তু মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার বিতর্কিত মন্তব্য। সম্প্রতি ভারতে বারাণসী শহরে জ্ঞানবাপী মসজিদ বিতর্ক নিয়ে একটি টকশোতে অংশগ্রহণ করেন নূপুর। তিনি যা বলেছেন এবং তার প্রকাশভঙ্গি অত্যন্ত নিন্দনীয়। অশালীন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বক্তব্য।
তার এই বক্তব্যের প্রতি আমি ব্যক্তিগতভাবে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। তার বক্তব্য মূলত বর্তমান ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী বিজেপি’র উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। এধরণের বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে বিজেপি’র উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতি উস্কে দিয়ে তার প্রসার ঘটানোই বর্তমান ভারতীয় সরকারের লক্ষ্য। কিন্তু এর বিপরিতে প্রতিবাদের নামে যারা নূপুরকে ধষর্ণের, হত্যার হুমকী প্রদান করছে সেটাও কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সেটাকেও উগ্র মুসলিম ধর্মীয় মৌলবাদ হিসাবেই চিহ্নিত করতে হবে।
কেনো এমনটি ঘটছে? রাজনীতিতে যখন ধর্মের ব্যবহার বৈধতা পায় বা ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি আবর্তিত হয় তখন বাংলাদেশ বা ভারত যেখানেই হোকনা কেনো ধর্মীয় উগ্রবাদীতা সৃষ্টি হবে সেটাই স্বাভাবিক। এবং এটা এখন বৈশ্বিক রাজনীতির অংশ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকরাও তার অংশগ্রহণকারী হিসাবে ভূমিকা পালন করছে। বিজেপি যে রাজনৈতিক ফায়দা এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে লুটতে চেয়েছে সেটি কিন্তু তারা লুটছে।
এবার প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত করতে চাই। যে মানবকে বা মহামানবকে আমরা অনুসরণ করে থাকি, যাকে আমরা আমাদের পথ প্রদর্শক মনেকরি অন্য সবার থেকে আলাদা করে; কেনো তাঁর সম্পর্কে এই বোধ আমরা ধারণ করি? কারণ সেই মানুষটির মতাদর্শ, জীবনবোধ, জীবন পরিক্রমা, জীবনের নানা বৈচিত্র্য-বৈশিষ্ট্য অন্য সকলের চাইতে পৃথক হয়। সেজন্যই তাঁর প্রতি আমাদের প্রশ্নহীন আনুগত্যবোধ তৈরি হয়। তৈরি হয় স্পর্শকাতর এক অনুভূতি; যা তাঁর প্রতি যেকোন ঘটনাতেই নিজের মনকে আন্দোলিত করে।
এমন মানুষদের প্রতি সম্মান জানানোর, জীবনে ধারণ করার, অনুসারী হবার পথ টা তাহলে কী? পথটি হলো তিনি যে মতাদর্শ ধারণ করেছিলেন সেটি ধারণ করা, সে জীবনকে যেপথে হাটতে শিখিয়েছে সেই পথে হাটা, জীবনের মূল্যবোধ তাঁর মতো করে সাজিয়ে নেওয়া, তাঁর সবটুকু ভালোকে গ্রহণকরে পূর্ণাঙ্গ জীবন পরিচালনা করা। এভাবেই আমরা আমাদের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও সম্মান জানাতে পারি।
আমরা যখন মুখে মুখে এমন মানুষকে আমাদের অনুসরণীয়-অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে প্রচার করি কিন্তু তাদের মূল্যবোধের আংশিক বা বিন্দুমাত্র ছাপ আমাদের ব্যক্তিজীবনে থাকেনা তখন কিন্তু প্রকারন্তরে তাকে অবমাননা করা হয়। এবং সেই অবমাননা অনেক বেশি গর্হিত কাজ ও অন্যায় যারা তাকে অনুকরণীয় বা অনুসরণীয় হিসাবে স্বীকার করেনা তার চাইতেও।
কারণ তারা তো স্বীকারই করেনা, আর যারা স্বীকার করছে এবং সেটি প্রকাশ ও প্রচার করছে কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে বিষয়টি অনুপস্থিত তারা একদিকে যেমন অবমাননা করছে অন্যদিকে প্রতারণা। তাহলে তাদের অন্যায়ের বোঝা অন্যদের তুলনায় অনেক ভারি হবারই কথা!
মুসলিম ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা) নিশ্চয় তেমনি একজন মানুষ। যিনি বিশ্বের সকল মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে অনুকরণীয়-অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। বিশ্বের অন্যসকল দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ন্যায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বিষয়। হযরত মোহাম্মদ (সা) সম্পর্কে যখন কটূক্তি করা হয়েছে তখন আমাদের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। তাঁর প্রতি অবমাননার প্রতিবাদে বাংলাদেশে হাজার হাজার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ রাজপথে নেমে এসে প্রতিবাদ জানিয়েছে, জানাচ্ছে।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় এখানেই যে, তারা যার অবমাননার জন্য রাস্তায় নেমে এসেছে সেই মহান ব্যক্তির মতাদর্শ, জীবনদর্শন, জীবনাচারণ, জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি, সততা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে দাড়াঁনো এর কোনটিরই ধারে কাছে থাকেননা। এক অদ্ভূত মনোজগতে বাস করেন। আমাদের এই সমাজ-রাষ্ট্র আজ পাপাচার-অনাচারে পরিপূর্ণ। এসব বিষয়ে আমাদের অতি সুক্ষ অনুভূতিসম্পন্ন এই ইমানদার মানুষেরা অধিকাংশই এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেননা!
সমাজে-রাষ্ট্রে যখন খুন-গুম-ধর্ষণের ঘটনা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে সেটি কী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেনা! মহানবী কী এ সমস্ত ঘটনার প্রতিবাদ করতে বলেননি? আপনি যখন মুখ বুজে মেনে নেন তখন কী আপনার প্রিয় মহানবীর মতাদর্শ থেকে দুরে অবস্থান করেন না? আপনার এই দুরের অবস্থান কী তাকে অবমাননার সামিল নয়?
মাদ্রাসাগুলোতে যখন শিক্ষক কর্তৃক একের পর এক শিশু বলাৎকারের ঘটনা ঘটছে সে বিষয়ে নিশ্চুপ থেকে আপনি ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দেন তখন স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন সামনে এসে দাড়াঁয় প্রিয় মহানবী কী এই বলাৎকারকে সমর্থন করেছেন, নাকি এই শিশু বলাৎকারের ঘটনা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করছে না!! যদি তেমন হয় তবে মুসলিম ভাইদের স্পষ্ট করে বলা উচিত ঠিক কোন কোন বিষয়ে তাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে আর কোন বিষয়ে লাগেনা। তাহলে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন অবস্থার অবসান ঘটবে।
ভারতে মহানবীর প্রতি কটূক্তি প্রকাশে আপনি প্রতিবাদ করবেন কিন্তু সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানে যখন মানুষকে হত্যার-ধষর্ণের হুমকী দেওয়া হয় তার প্রতিবাদ করবেন না এর চেয়ে স্ব-বিরোধীতা আর কিছু হতে পারেনা। আপনার নিশ্চুপ অবস্থান পূর্বের প্রতিবাদের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্যাম্পেইন, রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল করে মহানবী’র প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করবেন সেটা করা আপনার অধিকারের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তাঁর জীবনের মতাদর্শ-জীবনচরিত আপনার ব্যক্তি জীবনে যখন প্রতিফলিত হতে দেখা যায়না তখন এভাবে ভালোবাসা প্রকাশ একটা হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়।
যে সমস্ত কাজগুলো থেকে তাঁর উম্মতদের বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন সেই কাজগুলোই যখন প্রতিদিন আপনার জীবনে নিয়মিত কাজের অংশ হয়ে দাড়াঁয় তখন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা কোনটিই প্রকাশ হয়না। বরং আপনি নিজেই তাকে অবমাননার অংশ হয়ে ওঠেন। তখন তাঁর উম্মত হিসাবে নিজেকে পরিচিত করানো অর্থই তাকে অপমান করা।
কারো প্রতি ভালোবাসা-শ্রদ্ধা পোষণ করা হালকা কোন বিষয় নয়। আর মহানবী’র বিষয় তো আরো কঠিন একটি ব্যাপার। আমাদের ভাবনার মধ্যে আছে মুখ দিয়ে ভালোবাসি বল্লেই ভালোবাসা হয়ে গেল। বিষয়টি আদৌ তা নয়। এ ধরনের অনুসরণীয় ব্যক্তিদের প্রতি ভালোবাসা তখন ভালোবাসা হয়ে ওঠে যখন তাঁর মতাদর্শ-জীবনচরিত নুন্যতমভাবে হলেও আপনার ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিফলিত হয় অথবা সেটার জন্য প্রচেষ্টার প্রকাশ ঘটে।
অথচ নুন্যতম প্রতিফলিত হবেনা আবার কোন প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যাবেনা সেটা প্রকৃতপক্ষে কোন ভালোবাসা নয়। ভালোবাসা মনের গহীনে থাকার বিষয়, চ্যালেঞ্জ জানানোর কোন বিষয় নয়। আমরা শহুরে মধ্যবিত্ত ফেসবুকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মনে করছি হান্ড্রেড পার্সেন্ট লাভ হয়ে গেলো, যেমন সিনামাতে দেখি!
যারা মহানবী’র বা কোরআন অবমাননার প্রতিবাদ করেন তাঁরা অধিকাংশই সমাজে-রাষ্ট্রে-দেশে ঘটে চলা সকল অনাচারের বিষয়ে নিশ্চুপ হয়ে থাকেন। কিন্তু এই অনাচার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সামিল, কারণ কোন ধর্মই এগুলো এডমিট করে না। আর এই নিশ্চুপ থাকাটাই তার প্রতিবাদের ন্যায্যতাকে খারিজ করে। সিলেক্টিভভাবে কখনও প্রতিবাদ হয়না। এটা একটা সুবিধাবাদিতা।
উন্মাদনা কী? শাব্দিক অর্থে উত্তেজনা, প্রবল উৎসাহ, চিত্ত বিক্ষোভ, উগ্র রোষ, ক্রুদ্ধ তর্জন-গর্জন, ক্রোধে কিছু করা। মানুষের মধ্যে উন্মাদনা সৃষ্টি হয় তার মস্তিস্ক থেকেই। এটা একটা নেতিবাচক অনুভবের প্রকাশ।
আমাদের এখানে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের নামে যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলো প্রকৃত অর্থে ধর্মীয় উন্মাদনা। যা ধ্বংস-যজ্ঞ তৈরি করে। এবং সেটিই করেছে। প্রকৃত অর্থে এর সাথে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত পাওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। সারা বছর ব্যাপী আঘাত পাবার মতো শত শত ঘটনা ঘটছে এর একটিতেও এই অংশ কোন প্রতিবাদ করেনা; কোথায় ফ্রান্সে-ভারতে কী ঘটলো, ঈমানী দায়িত্ব পালনের জন্য হাজারে হাজারে রাস্তায় নেমে পড়লেন!
ফেসবুকে এ ধরনের প্রতিবাদ জানানো নিরাপদ অবস্থানে থেকেই করা যায়, কিন্তু সমাজের অন্য কোন অনাচারের প্রতিবাদ করতে গেলেই ঝুঁকি তৈরি হয়। একারণেও তারা নিরব থাকে! তাদের এই নিশ্চুপ থাকা ধর্মীয় মুল্যবোধের স্ব-বিরোধীতা। বাংলাদেশের মানুষের এতো এতো সংকট অথচ সেসমস্ত একটি বিষয় নিয়েও তারা প্রতিবাদ সংঘটিত করেনা।
জনগণের মধ্যে এই প্রবনতা তখনই তৈরি হয় যখন সরকার ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র জারি রাখার মাধ্যমে সমাজের মধ্যে উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয়। সেই উন্মাদনা কখনও ধর্মীয় উন্মাদনা হিসাবে ব্যবহার হয়, কখনও উগ্র জাতীয়তাবাদ, কখনও অন্যকোনভাবে। এই উন্মাদনায় সমাজে সহিংসতা জারি রাখে। লুটেরা শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখে সেটা বাংলাদেশ হোক অথবা ভারত!
এ থেকে মুক্তি পাওয়ার অন্যতম প্রধান উপায় বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা উচ্ছেদের লক্ষ্যে শ্রেণী সংগ্রাম জারি রাখা। শ্রেণী সংগ্রামই পারে মানবতাবোধকে উর্দ্ধে তুলে ধরতে। তথাকথিত ধর্মীয় অবমাননার এই জাল থেকে মুক্ত করতে!