ডেস্ক রিপোর্ট

১০ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

জাগবে না কি ভগিনীগণ ? জাগো !

আপডেট টাইম : ডিসেম্বর ১০, ২০২১ ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

শেয়ার করুন

রাজেকুজ্জামান রতন::

বেগম রোকেয়া হলেন সেই মহিয়সী যার সমগ্র জীবনটাই এক সংগ্রাম ।
জ্ঞান হবার পর দেখেছেন বৈষম্য তারপর থেকে মৃত্যু অবধি লড়েছেন অবিরাম ।
নারী মুক্তির লড়াইয়ে শত আঘাতেও হাল ছাড়েন নি তিনি ,
বিনিময়ে পেয়েছেন অপবাদ ও গ্লানি ।

কত কষ্টে তার হৃদয় বিদির্ণ হয়েছিল বলে তিনি লিখেছিলেন –
“ আমি কারসিয়াং ও মধুপুরে বেড়াইতে গিয়া সুন্দর সুদর্শন পাথর কুড়াইয়াছি, উড়িষ্যা ও মাদ্রাজে সাগর তীরে বেড়াইতে গিয়া বিচিত্র বর্ণের বিচিত্র আকারের ঝিনুক কুড়াইয়া আনিয়াছি । আর পঁচিশ বছর ধরিয়া সমাজসেবা করিয়া কাঠমোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইয়াছি ।”

কিন্তু আঘাত ও অপমান তাকে হতোদ্যম করেনি । বরং যুক্তি ও সাহস ছিল তার অবলম্বন । এর জোরেই তিনি লড়েছেন আজীবন । তিনি বলেছেন –
“কেহ বলিতে পারে যে তুমি সামাজিক কথা বলিতে গিয়া ধর্ম লইয়া টানাটানি কর কেন? তদুত্তরে বলিতে হইবে যে, ‘ধর্ম’ শেষে আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে, ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভূত্ব করিতেছেন। তাই ধর্ম লইয়া ধার্মিকগণ আমাকে ক্ষমা করিতে পারেন। অতএব জাগ, জাগ গো ভগিনী। প্রথমে জাগিয়া উঠা সহজ নহে, জানি। সমাজ মহা গোলযোগ বাঁধাইবে, জানি। ভারতবাসী মুসলমান আমাদের জন্য ‘কৎল’ এর বিধান দিবেন এবং হিন্দু চিতানল বা তুষানলের ব্যবস্থা দিবেন, জানি। এবং ভগীনিদিগের জাগিবারও ইচ্ছা নাই, জানি। কিন্তু সমাজের কল্যাণের নিমিত্ত জাগিতে হইবেই। বলিয়াছিত, কোন ভাল কাজ অনায়াসে করা যায় না। কারামুক্ত হইয়াও গ্যালিলিও বলিয়াছিলেন, কিন্তু যাহাই হউক পৃথিবী ঘুরিতেছে। আমাদিগকেও ঐরুপ বিবিধ নির্যাতন সহ্য করিয়া জাগিতে হইবে।”

তিনি জেগে উঠেছিলেন কারণ নারী পুরুষের বৈষম্যের বেদনা তাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেয় নি। আবার অনেকের মত শুধু নিজে জেগে উঠে একা এগিয়ে গিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া নয়, সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাবার কষ্টকর পথে হেঁটেছেন আজীবন। তার এই সাহস ও সমাজের প্রতি দায় এবং অবিচল সংগ্রামের চেতনা যেন আমাদেরকেও পরিচালিত করে !

সমাজের প্রতি কর্তব্য এবং সমাজের কাছে প্রাপ্য অধিকার দুটোই যেন যুক্তি দ্বারা নির্ধারিত হয়, বেগম রোকেয়ার জীবন সংগ্রাম থেকে এটাই যেন হয় আমাদের শিক্ষা। দয়া নয়, করুণা নয়, মর্যাদা এবং অধিকার পাওয়ার জন্যই ছিল তার সংগ্রাম। সে কারনেই তিনি যেমন বলেছিলেন, অনুগ্রহ করে আমাদের অনুগ্রহ কোরোনা। অন্যদিকে নারীদেরকে ভৎসনা করে বলেছিলেন, আমাদের মন মগজ পর্যন্ত যেন দাসী হইয়া গিয়াছে। তাই তিনি সারাজীবন ধরে শিখিয়েছেন- কোন কাজই তুচ্ছ নয়, তা সংসারের কাজ হোক বা সমাজের কাজ। শিক্ষা যেন অহমিকা বা অলংকারের বিষয় না হয়। তা যেন মানসিক সৌন্দর্য বাড়ায়, সচেতন, সংগ্রামী, সাহসী ও সংযমী করে।

আজ সমাজের অর্থনীতি , রাজনীতি, সংস্কৃতি সমস্ত ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মানুষের এত অবদান সত্বেও ঘরে বাইরে এত অপমান দেখে হতাশ হতে গিয়ে দেখি স্নিগ্ধ হাসি মুখে সামনে দাড়িয়ে আছেন তিনি । বলছেন – যদি সমাজের কাজ করিতে চাও,তবে গায়ের চামড়াকে এতখানি পুরু করিয়া লইতে হইবে; যেন নিন্দা- গ্লানি,উপেক্ষা – অপমান কিছুতেই তাহাকে আঘাত করিতে না পারে; মাথার খুলিকে এমন মজবুত করিয়া লইতে হবে; যেন ঝড়- ঝঞ্ঝা,বজ্র- বিদ্যুৎ সকলই তাহাতে প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসে।”

সমাজের দেয়া আঘাত ও অপমানে তার হৃদয় বিদির্ণ হয়েছিল বলে তিনি লিখেছিলেন –
“ আমি কারসিয়াং ও মধুপুরে বেড়াইতে গিয়া সুন্দর সুদর্শন পাথর কুড়াইয়াছি, উড়িষ্যা ও মাদ্রাজে সাগর তীরে বেড়াইতে গিয়া বিচিত্র বর্ণের বিচিত্র আকারের ঝিনুক কুড়াইয়া আনিয়াছি । আর পঁচিশ বছর ধরিয়া সমাজসেবা করিয়া কাঠমোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইয়াছি ।”

আজ নারীদের উপর অভিসম্পাত শুধু নয় আক্রমণ যে কত গুন বেড়েছে তা আমরা প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করছি। ফলে যারা বেদনা অনুভব করেন তাদের দায়ীত্ব বেড়েছে বহুগুন। আমরা প্রত্যেকেই যেন নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে সেই দায়ীত্ব পালন করতে পারি।

বেগম রোকেয়া বেদনার সংগে বলেছিলেন, কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারে যেমন গরু ছাগল থাকে তেমনি একপাল নারীও থাকেন। তাই তিনি আহবান জানিয়েছিলেন, আমরা অলংকারের মত সিন্দুকে আবদ্ধ থাকবো না, আসবাবের মত ঘরে থাকবো না, আমরা পশুর মত নির্বাক থাকবো না। ভগিনীগন সমস্বরে বল আমরা মানুষ। সাম্প্রতিক কালেও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও মন্তব্য দেখে মনে হয় তার এই আহবান আজও প্রাসঙ্গিক।
এই গণতন্ত্রহীন, মর্যাদাহীন, অধিকারহীন অন্ধকার সময়ে বেগম রোকেয়ার সংগ্রাম ও শিক্ষা আমাদের কাছে আরও বেশি স্মরণীয়, অনুসরণীয়।

লেখক: বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য

শেয়ার করুন