ডেস্ক রিপোর্ট
৭ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:৪৯ অপরাহ্ণ
আবু নাসের অনীক::
সরকারের সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ডা: মুরাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে দেশে- বিদেশে আলোচনার ঝড় ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তিনি জাইমা রহমানকে ‘লুচ্চা’, তারেক রহমানকে ‘বাস্টার্ড’, খালেদা জিয়া সম্পর্কে চুড়ান্ত অশ্লীল বাক্য এমনকি দেশের প্রবীন নাগরিক ডা: জাফরুল্লাহকে ‘রামছাগল’ বলে অভিহিত করেছেন। তার এধরনের বক্তব্যে অনেকে যেমন হতবাক হয়েছেন একইভাবে ক্ষুব্ধও হয়েছেন।
কিন্তু আমি বিস্মিত হয়নি। কারণ তার এই বক্তব্য বিছিন্ন কোন বিষয় নয়। অনেকেই এটাকে লৈঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন। খেয়াল করুন ডা: মুরাদ শুধুমাত্র যে নারীদের সম্পর্কে অসভ্য ভাষায় কথা বলেছেন তা নয়, পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই রকম অসভ্য-বর্বর ভাষা ব্যবহার করেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান লুটেরা শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রের ভাষা এটা। সময়ে সময়ে কারোটা প্রকাশ হয় কারোটা হয় না। স্মরণ করুন, গত বছর ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ঢাবি শাখার সভাপতি প্রগতিশীল ছাত্র জোটের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যে ছাত্র সমাবেশে বলেছিলো,‘এরপরে কোন ধৃষ্টতা দেখালে এই শাহবাগে আপনাদের পাড়াইয়া পিষিয়ে ফেলবো। কোন ধরনের প্রশাসন, কোন ধরনের মিডিয়াকে আমরা ভয় পায়না’। গত কয়েক মাস আগে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলেন,‘এই সরকার নৌকা মার্কার সরকার, পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট নেওয়া হবে’। সাবেক প্রতিমন্ত্রীর পুলিশ দিয়ে তুলে এনে ধর্ষণের হুমকি, আর নৌকা মার্কায় পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে ভোট নেওয়ার হুমকি এর মধ্যে কী কোন পার্থক্য আছে??
সরকারের মন্ত্রী, ছাত্রসংগঠনের মধ্যম সারির নেতা আর ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন নেতার বক্তব্যের মধ্যে মৌলিক কোন তফাৎ আছে কী? প্রত্যেকটি কথার উৎসমূলে রয়েছে একচেটিয়া ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র। তাদের প্রত্যেকের কথার মধ্যে অন্তমিল এক ও অভিন্ন। বিদ্যমান এই লুটেরা রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমাজে-রাষ্ট্রে পুরুষতান্ত্রিকতাকে আরো বেশি উসকে দেয়। অন্যায়ভাবে আধিপত্য জারি করে। পাওয়ার এবসুলুট করার জন্য এর বিকল্প কোন পন্থা এধরনের শাসকগোষ্ঠীর সামনে খোলা থাকে না।
তথ্য প্রতিমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। লক্ষ করুন, তাকে বরখাস্ত করা হয়নি। উনিও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। অনেকেই বলছেন নৈতিক স্খলনের দায়ে তার সংসদ সদস্য পদ থাকে না। অফিসিয়ালি নৈতিক স্খলনের জন্য তো তার মন্ত্রীত্ব যায়নি!! কোন ঘটনা যখন জনমনে ও বর্হিঃবিশ্বে প্রচুর চাপ তৈরি করে এবং কোন কোন সময়ে কেউ দলীয় রাজনৈতিক কৌশলের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে তখন এমন এক/দুইজনকে পদত্যাগ করানো হয় বিষয়টিকে আপাতভাবে মোকাবেলার জন্য।
পদত্যাগের এই নির্দেশনায় প্রধানমন্ত্রী জনমনে মহৎ হয়ে উঠেছেন, ধন্যবাদের বন্যায় ভাসছেন। লুটেরা ব্যবস্থাপনার সব দায় ঘুচে যাবে। সমস্ত কিছু এখন একজন ব্যক্তির ঘাড়ে দিয়ে বরাবরের মতোই লুটেরা রাষ্ট্রের শ্রেনী চরিত্রকে আড়াল করে ফেলা হবে। জনগণও মহা আনন্দে সেই যাত্রায় শামিল হবে। কারণ বাংলাদেশে যেসমস্ত রাজনৈতিক দল বিকল্প রাজনীতির কথা বলে, তাঁরা জনগণের কাছে বিষয়টি পরিস্কার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কেউ কেউ আবার আড়াল করার দলেও আছে।
ডা: মুরাদ, ছাত্রলীগের ঢাবি সভাপতি অথবা লেখায় উল্লেখিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বক্তব্য যদি বিচ্ছিন্ন হতো তবে বরখাস্ত করা হতো। সবটাই একসূত্রে গাথা। সেকারণে লাটাইয়ের সূতাকে গুটিয়ে এনে আপাতভাবে ঘুড়ির উড়াউড়ি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
তথ্যমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী সম্পর্কে বলেছেন,‘গত কয়েক মাস ধরে তার মধ্যে আমি কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করেছি। তার কিছু বক্তব্য ও ঘটনা সরকার ও দলকে বিব্রত করেছে’। ঠিক তাই, উনি পরিবর্তন লক্ষ করেছেন তখন, যখন ডা: মুরাদ বলেছেন,‘সংবিধানে বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম ও রাষ্ট্রধর্ম থাকতে পারেনা’। তার এই বক্তব্যেই মূলত সরকার তার উপর রুষ্ট হয়। যেমনভাবে হয়েছে গাজিপুর আর কাটাখালির মেয়রের ক্ষেত্রে।
নায়িকা মাহীর সাথে তার ফোনালাপের যে রেকর্ড ফাঁস হয়েছে সেটি দুই বছর আগের। ইউটিউবে বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের বিষয়ে তার অসভ্য-ইতর মার্কা বহু বক্তব্য অনেক বছর আগে থেকেই পাওয়া যায়!! সেই সময়ে আলোচনায় আসেনি, এগুলো ফাঁস হয়নি, বা তার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও কোন পরিবর্তন লক্ষ করেননি, কারণ সরকার তখন এটার প্রয়োজন মনে করেনি। সে ছাত্র দলের কর্মী ছিলো কীনা সেটাও প্রকাশ হয়নি। একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী যখন শপথ গ্রহণ করে তার পূর্বেই সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের আদ্যপান্ত সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে। দেখুন, খালেদা জিয়া, জাইমা, তারেক রহমান বা ডা: জাফরুল্লাহ সাহেব সম্পর্কে ডা: হাসান যে অসভ্য ভাষায় মন্তব্য করেছেন সেটা কিন্তু এখন আর ফোকাসে নেই। মূল ফোকাস এখন মাহীর সাথে কথাপোকথন।
বিষয়টি কিন্তু পরিস্কার। ডা: হাসানকে সরানো হয়েছে নৈতিক স্খলনের দায়ে নয়। বরং সরকারের সাথে তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কারণে। যেমনভাবে সরানো হয়েছে গাজিপুরের মেয়র বা কাটাখালির মেয়রকে। সরানোর সাথে সাথে তারা বিরাট দুর্নীতিবাজ হয়েগেছে, ভাব দেখলে মনে হবে এরা ছাড়া সরকারে দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী, এমপি, আমলা আর কেউ নেই!! নৈতিক স্খলনের বিষয়টি সরকার তাকে সরানোর জন্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছে মাত্র!
ডা: হাসানের মতো অসভ্য-ইতর ভাষায় কথা বলা একই নেচারের বহু নেতা-কর্মী সরকার দলীয় সংগঠনের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যার কয়েকটি উদাহরন আমি লেখায় উল্লেখ করেছি। কারণ এটাই তো শাসকগোষ্ঠীর ভাষা। এই ভাষা ব্যবহার না করলে একটি গণবিরোধী সরকারের পক্ষে পাওয়ার এবসুলুট করা সম্ভব না। এদের মধ্যে কেউ যদি সরকারের কোন সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলে তখন তারও ফোন রেকর্ড ফাঁস হবে ডা: হাসানের অথবা গাজীপুরের মেয়রের মতো!
ডা: মুরাদকে দল থেকে বের করা হবে, হয়তো মামলাও হবে। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে খালেদা জিয়া বা জাইমার সাথে অসভ্য আচরনের জন্য কোন মামলা হবে না। কারণ সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সাথে এই ভাষায় কথা বলার বৈধতা আগেই দিয়ে রেখেছে। এতে বরং তারা বিগলিত হয়।
এটা শুধুমাত্র আওয়ামীলীগের নয় বিএনপিরও রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বরং বলা যায় এটা এই লুটেরা রাষ্ট্র ব্যবস্থার শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
বিএনপি নেতা জনাব আলালের একটি বক্তব্য ইউটিউবে ঘুরে বেড়ায়। যেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বলছেন,‘..ভারতে গিয়ে মোদীর সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে’। ডা: মুরাদের বক্তব্যের সাথে এর ফারাক আছে কী?? ফারাক এটুকুই যে, মুরাদ আলালের চাইতে আরো একটু বেশি রসিয়ে রসিয়ে উপস্থাপন করেছে মাত্র।
এই লুটেরা রাষ্ট্র ব্যবস্থার শাসকগোষ্ঠীর শ্রেণী চরিত্র একই ধরনের হয়ে থাকে। পার্থক্য যখন যে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকে তখন সে অনেক বেশি এগ্রেসিভ আচরণ করে। এবং এটা মনে করে, তার এই ক্ষমতা চীরস্থায়ী বন্দবস্ত। এই অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বরুপকে উন্মোচন করা। জনগণের লড়াই সংগঠিত করা। ডা: মুরাদের মতো ব্যক্তিরা বেড়ে ওঠে এই রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিতর থেকে। এখানে ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার অর্থ আগামীতে এমন অনেক মুরাদ তৈরির পথকে প্রসস্ত করা।