ডেস্ক রিপোর্ট
২৬ নভেম্বর ২০২১, ১০:৫৪ অপরাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক:: প্রবীণ রাজনীতিবিদ জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ সভাপতি সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিবিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের আপসহীন, অকুতোভয়, দৃঢ়চেতা, সাহসী জননেতা এবং সাপ্তাহিক সেবা পত্রিকার সম্পাদক ডাক্তার এম. এ. করিম মৃত্যুতে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ মৌলভীবাজার জেলা শাখার উদ্যোগে ২৬ নভেম্বর বিকাল ৪ টায় মৌলভীবাজার পৌর মিলনায়তনে এক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়।
জেলা এনডিএফ সভাপতি শহীদ সাগ্নিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শোকসভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনডিএফ’র কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শ্যামল ভৌমিক ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক রহমত আলী।
জেলা এনডিএফ’র সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাসের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত শোকসভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি মোঃ নুরুল মোহাইমীন, বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির আহবায়ক ডা. অবনী শর্ম্মা, গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক আম্বিয়া বেগম, ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পদক অমলেশ শর্ম্মা। শোকসভার শুরুতে প্রয়াত নেতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন ও শোক প্রস্তাব পাঠ করা হয়।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ত্রিকালদর্শী রাজনীতিবিদ ডা. এম এ করিম এক জীবন্ত ইতিহাসের অগ্রসেনা ও ইতিহাসের কালপঞ্জী ছিলেন। প্রায় ৮ দশক জুড়ে ছিল তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সুদূর প্রসারী কর্মতৎপরতা ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ডাঃ এম. এ. করিম। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন। ’৪৬-এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি মেডিকেল টিম নিয়ে দাঙ্গাপীড়িত বিহারে গিয়েছিলেন। এ সময় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না হলেও গঠিত হয়েছিল পাকিস্তান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। ডাঃ এম এ করিম এই সোসাইটির প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫০ সালে জগন্নাথ কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ঐ কলেজের ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্র আন্দোলন, ’৫৪ নির্বাচনসহ সর্বত্রই তাঁর বিচরণ ছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন, ন্যাপ গঠন, যুবলীগ গঠন সর্বত্রই তিনি ছিলেন সরব। ১৯৫৭ সালে কাগমারিতে আওয়ামী লীগের বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সময় সিয়েটো-সেন্টো চুক্তি এবং মার্কিন অনুগত পররাষ্ট্র নীতির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সমসাময়িক সময়ে কমরেড আবদুল হকের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাত ও পরিচয় হয়। প্রথম পরিচয়েই তাঁদের মধ্যে গড়ে ওঠে রাজনৈতিক গভীর ঘনিষ্ঠতা। সেই ঘনিষ্ঠতার ধারাবাহিকতা তিনি কমরেড হক জীবিত থাকাকালে ও পরবর্তীতে শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ততা বজায় রেখেছেন ঐতিহাসিক কারণে। ১৯৬২ সালে বিনা পরোয়ানায় তাঁকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বিনা বিচারে ৫ মাস আটকে রাখা হয়। জেলজীবনের স্মৃতিকথা তিনি ‘ঢাকা সেন্ট্রাল জেল; নানান রঙের দিনগুলি’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন, যেখানে তিনি এদেশের রাজনীতির ইতিহাসের অনেক অজানা কথা পাঠকদের সামনে নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন। বিশ্বপরিসরে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট বিতর্কেও তিনি সব সময় সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থরক্ষাকারী সুবিধাবাদী ক্রশ্চেভ সংশোধনবাদ, তিন বিশ্ব তত্ত্ব ও মাওসেতু চিন্তাধারাসহ সকল প্রকার সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও দৃঢ়।
বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে অনেকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হলেও আদর্শ ও রাজনৈতিক প্রশ্নে তিনি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লবী বিকল্পধারা প্রতিষ্ঠায় তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক বাতিল করতে এতটুকু দ্বিধা করেননি। এখানেই ছিলেন ডাঃ এম এ করিম অনন্য ব্যতিক্রম। গণমানুষের চিকিৎসা সেবায় ডাঃ এম এ করিম অদ্বিতীয় দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি আজীবন অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে গিয়েছেন। শ্রমিক দিনমজুর নি¤œবিত্তদের চিকিৎসক হিসেবে তিনি ছিলেন সমধিক পরিচিত। তিনি মওলানা ভাসানীরও একান্ত চিকিৎসক ছিলেন। তাছাড়া প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীসহ অন্যান্য রাজনীতিকদেরও তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করেছেন। সস্তা ও অল্প ঔষধ এবং সাধারণ রোগে অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে প্যাথলজিও করতেন রোগীদের খরচ বাঁচাতে। এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে তিনি সাম্রাজ্যবাদের মুনাফা লুটার বাজার হিসেবে দেখতেন। তাই তিনি গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি হিসেবে বুঝতেন সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজি তথা সকল প্রকার শোষণ-শাসনমুক্ত স্বাস্থ্য ও সমাজ ব্যবস্থাকে। আর তাই চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন দেশের শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনগণ আজ স্বৈরচারী শাসন-শোষণে দিশেহারা। চাল, ডাল, তেল, চিনি, শাক-সবজিসহ দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে জর্জরিত জনগণের উপর ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য বৃদ্ধি ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে। সরকার এক লাফে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য লিটার প্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে মালিকদের সাথে যোগসাজসে ধর্মঘটের নামে জনগণকে জিম্মি করে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বাস ও লঞ্চের ভাড়া শতকরা প্রায় ২৭-৩৫% বৃদ্ধি করেছে। সরকার দায়হীনভাবে পানি, সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় অটোগ্যাস, ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য বৃদ্ধি করেছে, আগামীতে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে । বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ১৩ বছরে ১৪ দফায় পানি, ৭ দফায় গ্যাস, ১০ দফায় খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৯০ শতাংশ, একাধিকবার জ্বালানি তেলে মূল্য বৃদ্ধি করে শ্রমিক, শ্রমজীবী, স্বল্প আয়ের মানুষ ও ব্যাপক জনগণের জীবন ও জীবিকাকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দফায় দফায় গ্যাস, বিদ্যুত, পানিসহ নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে জনগণ আজ দিশেহারা। অথচ সরকার একদিকে উন্নয়নের বাজনা বাজাচ্ছে আবার একই সাথে জীবন জীবিকার সকল প্রয়োজনীয় বিষয়কে রাষ্ট্রীয়, দলীয় ও ব্যবসায়ীদের অবাধ লুটপাট ও লাগামহীন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরিণত করে চলেছে। ফলশ্রুতিতে করোনা মহামারিতে জনগণের দুর্ভোগ বাড়ার সাথে সাথে লুটপাটকারীদের অর্থবিত্ত বৈভব বেড়ে যাওয়ায় দেশে ২০২০ সালেই ১০ হাজার ৫১ জন নতুন কোটি পতির সৃষ্টি হয়েছে। পক্ষান্তরে একই সময়ে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন প্রায় ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ। অথচ সরকারের মন্ত্রীরা নির্লজ্জদের মতো বলে বেড়াচ্ছেন জনগণ নাকি ঘুমের মধ্যে বড়লোক হয়ে যাচ্ছেন। নয়াউপনিবেশিক আধাসামন্ততান্ত্রিক এদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় এ যাবত অধিষ্টিত সকল সরকারই হচ্ছে সামন্ত আমলা মুৎসুদ্দি শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী সরকার। তারা কখনোই জনগণের কথা ভাববে না এটাই স্বাভাবিক। তাই জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আমলা দালাল পুঁজি বিরোধী শ্রমিক-কৃষক জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে বিকল্প নেই-এটাই ডা. এম এ করিমের শিক্ষা।