ডেস্ক রিপোর্ট

৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৫:৪৯ অপরাহ্ণ

‘লাখো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ধ্বংসের দায় সরকারকে নিতে হবে’

আপডেট টাইম : সেপ্টেম্বর ৪, ২০২১ ৫:৪৯ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

ছাত্র ইউনিয়নের ‘সর্বজন শুনানী’তে বক্তারা

অধিকার ডেস্ক:: বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার কোনো যৌক্তিকতাই সরকারের কাছে নেই জানিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস রোধে দ্রুততম সময়েই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ছাত্র ইউনিয়নের আয়োজনে ‘সর্বজন শুনানী’তে বক্তারা।

আজ শনিবার (০৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার যৌক্তিকতার প্রশ্নে ছাত্র ইউনিয়নের আয়োজনে ‘সর্বজন শুনানী’ অনুষ্টিত হয়।

ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি অনিক রায়ের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক রাগিব নাঈমের সঞ্চালনায় শুনানী’তে অংশ নেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক তানজীম উদ্দীন খান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী, অ্যাড. ইমতিয়াজ মাহমুদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন, অ্যাড. হাসনাত কাইয়ুম, শিক্ষা আন্দোলন কর্মী রাখাল রাহাসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দ।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, করোনা সরকারের প্রকৃত রূপ দেখিয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের ভঙ্গুর অবস্থা করোনা উন্মোচন করেছে। দেশের সংক্রমণের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম হলেও এখানে মানুষ মারা যাচ্ছে, এমনকি এই করোনায় অন্যান্য রোগের রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেননা। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক থেকে করোনার শুরুতেই সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছিলাম অনলাইনে ক্লাস যদি চালাতে হয় তাহলে কি কি করা উচিত এই পরামর্শ দিয়ে। অনেকেরই নেটওয়ার্ক এর সমস্যা, অনেকের ডিভাইস এর সংকট আর বিদ্যুৎ এর সমস্যা তো আছেই। এত কিছুর মধ্যে একজন শিক্ষার্থীর স্বাভাবিকভাবেই ক্লাস করা সম্ভব হয়ে উঠে না। এরই মধ্যে তাদেরকে তাদের অ্যাসাইনমেন্ট অনলাইনে জমা দিতে হচ্ছে। করোনায় সরকারের এই অব্যবস্থাপনা শিক্ষকদেরও দুর্দশা বয়ে এনেছে। তাদের অনেকেই পেশা পরিবর্তন করছেন। রূপগঞ্জের হাশেম ফুডসে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া অনেকেই শিক্ষার্থী ছিলেন। তারা অর্থনৈতিক সংকটের এর মধ্যে টিকে থাকবার জন্যই চাকরি নিয়েছেন। অথচ এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় এর ভেতর স্থাপনা নির্মাণ, হল নির্মাণ, মেট্রোরেল নির্মাণ কাজ চলছে। এই কাজগুলো সরকারদলীয় লোকেরাই করছে। আর বর্তমানে সরকারের গু-াবাহিনী ছাত্রলীগ যারা আইয়ুব খান এর সময়কার এনএসএফ এর উত্তরসূরী তারাও এরই মধ্যে তাদের সকল কুকর্ম নির্বিঘে চালাচ্ছে। সরকার তাদের কে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরালে অনেক সমস্যাই সমাধান হবে।

তিনি আরও বলেন, গণরুম থেকে শিক্ষার্থীদের বসবাস করার জায়গা অনেকটুকু সংকটই নিরসন হয়ে যাবে। সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আদতেই ব্যাক্তিগত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। আর তাই কোনো প্রহসন, প্রতারণা করবার সুযোগ না নিয়ে সরকারের এখনি তাদের দায় স্বীকার করে, সকলের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিতে হবে।

অ্যাড. হাসনাত কাইয়ুম তার বক্তব্যে বলেন, আমাদের এই সরকারের বিচার করা উচিত। এই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার অন্যতম কারণ এই অপরাধ কাঠামো টিকিয়ে রাখা। তারা ডিজিটাল বাংলাদেশের নাম বলে কিন্তু এই দেশের অনলাইন ক্লাসের সময়েও শিক্ষার্থীরা কোনো ভালো ইন্টারনেট সুবিধা পায় না। শিক্ষার্থীরা যে সুবিধা পায়, সেই ইন্টারনেট এর গতি উগান্ডার থেকেও খারাপ। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকার যা যা বলেছে, তার সবই মূল্যহীন। এরই মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন বেড়েছে কিন্তু কোন প্রকারের শিক্ষার উন্নয়ন ঘটেনি। অবিলম্বেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া উচিত।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. লেলিন চৌধুরী বলেন, মানুষের জীবন ধারণের ৫টি মৌলিক শর্তের সবগুলোই খোলা রেখে মানুষ জীবন নির্বাহ করে কিন্তু বাংলাদেশে করোনা মহামারীতে ৪টি মাত্র শর্ত পূরণ করা হচ্ছে কিন্তু শিক্ষা লাভের যে মৌলিকতা, সেটা অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। করোনা এখনি পৃথিবী থেকে চলে যাবেনা, একে নিয়েই আমাদের এই নব্য স্বাভাবিকতায় বসবাস করতে হবে। তাই, সংক্রামন এর উপর নির্ভর করেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে হবে এবং বন্ধ করতে হবে। ১০ শতাংশের নিচে সংক্রমণ হার হলেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুর করে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে এবং ২০ শতাংশের উপর হলে আবার বন্ধ করতে হবে। এভাবেই মানিয়ে নিয়ে আগামীতে আমাদের এগোতে হবে। কেউ যদি মনে করেন একবারেই বন্ধ করে রাখতে হবে তাহলে উনি মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। কেউ যদি মনে করেন ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০০ জন আক্রান্ত হলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হবে, তাহলে তারা নন্দদুলাল হয়েই বসে থাকুক। যারা অসুস্থ, তাদের চিকিৎসা করতে হবে এবং সারিয়ে তুলতে হবে এবং
যারা সুস্থ তাদের কে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। সরকারের এমন অবস্থান, পুরোপুরি শিক্ষাবিরোধী অবস্থান। এনজিওদের ‘সবার শেষে বন্ধ, সবার আগে খোল’ এমন বিমূর্ত কথা বলার সুযোগও তাই নেই। শিক্ষার কাজ বোধ তৈরি করা, পাঠ ঘরে বসেও সম্ভব, কিন্তু বোধ তৈরি করা সম্ভব নয়। সরকারের তাই বোধোদয় হওয়া দরকার যে অবিলম্বেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে হবে।

অ্যাড. ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, এই আশু সমস্যার দ্রততম সমাধান করা চাই। করোনা মহামারীতে হওয়া উচিত ছিলো হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে আলোচনা আগানো কিন্তু ঘটেছে অন্য। রেস্টুরেন্ট, সিনেমা হল, কল-কারখানা, ব্যবসা সব খোলা রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। এর কারণ, এই গোষ্ঠী কোনো প্রকার কেয়ারই করে না। শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে, নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকতে হবে বিদ্যার জন্য। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা জানালা বন্ধ রেখে শিক্ষা পাঠ হয়, সেখানে ট্রেইনিং হয়, জ্ঞান লাভ হয় না। করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প নেওয়া জরুরি এখনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়াটাও তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক তানজিম উদ্দীন খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কথা বলার জায়গা, সিনেট মিটিং যেমন ব্যাক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণিত হয়েছে একইভাবে বাংলাদেশের সরকারো ব্যাক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ডোপ টেস্ট নামক কথা বার্তা বলে দৃষ্টি সরানোর চেস্টা চলছে। অথচ, বোট ক্লাবের অপরাধীদের ডোপ টেস্ট করা হচ্ছেনা। অপরাজনীতি, হল কেন্দ্রিক ব্যবসা আর রাজনৈতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বানিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষিত হয় না। শিক্ষকরা সরকারের পক্ষের লোকদের নিজেদের দলের হয়ে এখানে ৬ বছরে অধ্যাপক হয়ে যাচ্ছেন এখানে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে এই সকল অপরাধ কমে যাচ্ছেনা বরং এখান থেকে চোখ সরানো হচ্ছে, আন্দোলন এর ভয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাই অতি দ্রুত খুলে দিতে হবে।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫.১ শতাংশ মানুষ টিকার আওতায় এসেছেন। একই সময়ে, মুনাফালোভী মালিকদের সরকারও করোনাকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক সকল সমস্যার কোন দেখভাল না করেই উলটো বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল কলেজ সব বন্ধ রেখেছে সরকার। মেডিকেল শিক্ষার্থী, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পক্ষে অনলাইনে কোনোভাবেই দক্ষতা অর্জন সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের এই ক্ষতিপূরণ সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এরই প্রথম পদক্ষেপ
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব কিছু এখনি খুলে দেওয়া।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল্লাহ ক্বাফি রতন বলেন, লেখাপড়ার বন্ধ রাখার কারণে শিক্ষার্থীরা এখন মানসিকভাবে ভেংগে পড়ছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই গ্রামে থাকেন, শহরের শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছেন কিন্তু গ্রামে টাকা উপার্জন এর প্রয়োজনে শিক্ষা হারাচ্ছেন অনেকেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অনেকেক ঝরে পড়বার ঝুঁকিতে আছেন। সরকারের এদিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কোনভাবেই যাতে কোন শিক্ষার্থী ঝরে না পড়ে, ড্রপআউট না হয়। এর জন্য হলেও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবিলম্বে খুলে দেওয়া উচিত।
শিক্ষা আন্দোলন কর্মী রাখাল রাহা জানান, করোনার ব্যাপারে সরকারের দেওয়া কোন আপডেটের উপরেই আস্থা রাখার সুযোগ নেই। সরকারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা বা বন্ধের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে জাতির সাথে তামাশা করা হচ্ছে, ভারতে সংক্রমণ পিকআপে থাকাকালীন সময়েই তারা পরিকল্পনা নিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে। বাংলাদেশের সরকার চাইলে গত সেপ্টেম্বরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে পারতো কিন্তু তারা সেটা করেনি।

একইসাথে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেখানে চাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হোক, সেখানে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ তারিখ থেকে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, ছাত্রলীগের হুঁশিয়ারির কারণে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাই অতি দ্রুতই শিক্ষার্থীদের দাবির সাথে একমত হয়ে খুলে দিতে হবে।

শেয়ার করুন