ডেস্ক রিপোর্ট
২৪ আগস্ট ২০২১, ২:১৪ অপরাহ্ণ
আবু হাসনাত মুহাম্মদ সাজু ::
২৪ আগস্ট ইয়াসমিন হত্যার ২৬ তম বছর। এই দিনটি নারী নির্যাতন দিবস হিসেবে বাংলাদেশে পালিত হয়ে আসছে। কে এই ইয়াসমিন? কিভাবে ঘটেছিল তার হত্যাকাণ্ড? তা আজ নতুন প্রজন্মের জানা অন্তত জরুরী।
দিনাজপুরের একটি দিনমজুর পরিবারের সন্তান ইয়াসমিন। বয়স ১৪ বছর। অভাবের তাড়নায় ঢাকায় গিয়ে গৃহকর্মীর কাজ করতো। মায়ের অসুখের কথা শুনে বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ২৩ আগস্ট বিকেলে বাসে উঠে ইয়াসমিন। ভুল গাড়িতে উঠেছিল সে। তার গন্তব্য দিনাজপুর। কিন্তু সে উঠেছিল ঠাকুরগাঁও এর বাসে। বাসটি রাত ৩টায় রংপুর- ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের দশমাইল মোড়ে এসে পৌছালে হেলপার তাকে একটি চায়ের দোকানের সামনে নামিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর সেখানে টহল পুলিশের একটি গাড়ি আসে। ইয়াসমিনকে বাড়িতে পৌছে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের গাড়িতে তুলে নেয় পুলিশ সদস্যরা। কিছুদূর যাওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা ইয়াসমিনকে গণধর্ষণ করে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং তার লাশ পাশের জঙ্গলে ফেলে দিয়ে চলে যায়। পরদিন সকালে মানুষ তার লাশ দেখে এবং বৃত্তান্ত শুনে দিনাজপুরের পুলিশ ফাঁড়ি ঘেড়াও করে ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে। পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলে নির্মমভাবে গুলি চালায়। বোনের সম্মানের জন্য লড়াই করে শহিদ হন ৭জন লড়াকু ভাই। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। বিদ্যুৎ বেগে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এই আন্দোলনের চাপে পড়ে সরকারকে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হয়। নতুন আইনে ইয়াসমিন হত্যাকারী পুলিশদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। জনতার আন্দোলনের বিজয় রচিত হয়। এর পর থেকে ২৪ আগস্ট পালিত হয়ে আসছে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস।
ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের এতো বছর পরেও কি আমরা পেরেছি নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন বন্ধ করতে? না পারিনি বরং বেড়েছে। প্রতিনিয়ত টিভি নিউজ ও সংবাদপত্র খুললে নারী ধর্ষণ ও সহিংসতার চিত্র দেখে আমারা আতকে উঠি। সারাদেশের থানাগুলোতে দায়ের হওয়া মামলার ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর অপরাধের যে পরিসংখ্যান তৈরি করেছে, তাতে দেখা যায়, গত বছর ২০২০ সালে সারাদেশে ৬ হাজার ৫৫৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। করোনা মহামারীতে ধর্ষণ ও নির্যাতনের সংখ্যা বেড়েছে আরও কয়েকগুণ। অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে বাল্যবিবাহ। বিভিন্ন পত্রিকা রিপোর্টে থেকে পাওয়া, করোনার ১৮ মাসে শুধু যশোরের কেশবপুর উপজেলায় বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার। ভাবুন তো সারা দেশে তাহলে কত হতে পারে!
নারীরা নিজ ঘর থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, বাস, ট্রেন, লঞ্চ সব জায়গায় ধর্ষণ ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এর শেষ কোথায়? ধর্ষণরোধে গড়ে তোলা প্রয়োজন গণ আন্দোলন, জনসচেতনতা, আইনের সঠিক প্রয়োগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নাটক-সিনেমা- বিজ্ঞাপনে নারীকে ভোগ্য পণ্যরূপে ব্যবহার বন্ধ করা, ওয়াজে মাধ্যমে নারী সম্পর্কে কুরুচিসম্পন্ন বক্তব্য বন্ধ করা, পর্ণগ্রাফি সাইটগুলো বন্ধ করা। সব থেকে বড় প্রয়োজন হলো দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো। নারীকে নারী নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। এই হোক ইয়াসমিন দিবস তথা নারী নির্যাতন দিবসের শিক্ষা। নইলে থেকে যাবে ৭জন বীর ভাইয়ের রক্তের ঋণ।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রণ্ট, দিনাজপুর সরকারি কলেজ, দিনাজপুর।