ডেস্ক রিপোর্ট
১৬ আগস্ট ২০২১, ৯:৪২ অপরাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক:: নারায়ণগঞ্জে জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে অর্ধশতাধিক শ্রমিক গণহত্যার বিচার, নিহতদের পরিবারকে এক জীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ, আহত-পঙ্গু শ্রমিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন; রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল-চিনিকল আধুনিকায়ন করে চালু, অটোরিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল, শ্রমজীবীদের করোনা টিকা প্রদানে অগ্রাধিকার নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি দাবিতে শ্রম অধিদপ্তরে স্মারকলিপি পেশ করেছে শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ।
আজ সোমবার (১৬ আগস্ট) শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে সকাল সাড়ে ১১টায় এই স্মারকলিপি পেশ করা হয়।
স্মারকলিপি পেশ করার সময় উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক নেতা জহিরুল ইসলাম, উজ্জ্বল রায়, এএএম ফয়েজ হোসেন, আলিফ দেওয়ান, আবু হাসান টিপু, শামীম ইমাম, বিধান দাস, হারুনার রশিদ ভুঁইয়া, আব্দুল আলী প্রমুখ।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জে সজিব গ্রুপের হাসেম ফুড লিমিটেডের সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জন মানুষ পুড়ে নিহত হয়েছে। ঐ কারখানায় শিশু শ্রম নিয়োজিত ছিল। ঐ কারখানার মধ্যে পযার্প্ত অগ্নি নিবার্পন ব্যাবস্থাপনা না থাকা সত্ত্বেও তারা ফায়ার লাইসেন্স পেয়েছিল। কারখানা পরিদর্শক কি জানতেন যে ওখানে এত উচ্চ মাত্রার দাহ্য পদার্থ কেমিকেল ও প্লাস্টিক ব্যবহৃত হতো, যার ফলে অগ্নিকাণ্ডের তিনদিন পরেও সংবাদকমীর্রা সেখানে আগুন ও ধেঁায়া দেখেছে। অথচ আজ পর্যন্ত আপনারা ঠিক কি পরিদর্শন করেছিলেন তার কোনো বিবৃতি গণমাধ্যমে দেশবাসী দেখেনি। যারা পুড়ে কয়লা হলো তাদের পরিবার শুধু যে তাদের হারালো তাই-ই নয়, উপার্জনক্ষম মানুষটির অবর্তমানে তাদের ভিক্ষাতে বসে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকলো না। অর্ধশতাধিক শ্রমিক গণহত্যার বিচার, নিহতদের পরিবারকে এক জীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান, ক্ষতিপূরণ আইন সংশোধন ও যুগোপযোগীকরণ, আহত—পঙ্গু শ্রমিকদের উপযুক্ত চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন আমরা চেয়েছি। আপনারাও জানেন রানা প্লাজার শ্রমিক মৃত্যুতে ১৪ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকার রায় দিয়েছিল হাইকোর্ট। রানা প্লাজার শ্রমিকরা ১০ লক্ষ ৬৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ও অনুদান পেয়েছিল। এমতাবস্থায় আপনারা কি বসে থেকে শ্রমিকের দুই লক্ষ টাকা পেয়ে আর কোনো দাবি নেইÑমর্মে মুচলেকা নেওয়ার ব্যবস্থায় শরিক বা দর্শক থাকতে পারেন? আমরা আপনাদের ভূমিকার ষ্পষ্টতা চাই।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল-চিনিকল আধুনিকায়ন করে চালু করতে হবে। আপনারা কি সরকারকে অবগত করেছিলেন যে, করোনাকালে পৃথিবীর কোনো দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো রাষ্ট্রীয় কারখানা মহামারিতে বন্ধ করা যায় না বা কোনো দেশে করেনি। আমাদের পাটকল সবকটা এবং চিনিকল কয়েকটা বন্ধ করেছে এ বিষেয়ে আপনাদের বক্তব্য কী? সরকার বলেছিল, দুই মাস পরেই বন্ধ কারখানা চালু করবে। আজ চৌদ্দমাস পার হবার পরও সকলে আজও সম্পূর্ণ বকেয়া বেতনই পায়নি। ওদিকে কারখানার সকল যন্ত্রপাতি এমনিতই পুরনো ছিল, তার উপর গত দেড় বছর পরিচযার্র অভাবে বাতিল হয়ে গেল। এই কোটি কোটি টাকার যন্ত্রের নষ্ট হওয়ার দায় আপনাদের নিতে হবে, কেননা আপনারা সরকারকে যথাযথ পরামর্শ তড়িৎ কারখানা চালুর বিষয়ে দেননি। চিনিকল চালু করার এক বছর পূর্বে যথাযথ রোডম্যাপ না দিলে আখচাষিরা কি সাকুর্লার যাবার সাথে সাথেই চিনিকলে আখ দিতে পারবে নাকি ? এক বছরের পূর্ব প্রস্তুতি লাগবে সে বিষয়ে আখচাষের উদ্যোগ কোথায়?
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়েছে, দেশে ব্যাটারিচালিত-রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল আমরা চাই। যে রিকশা শুধু একটা মানুষের জীবিকা নয়। এই ঢাকা দক্ষিণ সিটিতেই ৬ লক্ষ অযান্ত্রিক যান চলছে মানে, পুরো ঢাকায় বারো লক্ষ হলে সারাদেশে পঁচিশ লক্ষ যানবাহন তার পাঁচ লক্ষ গ্যারেজ ধরলে ৩০ লক্ষ মানুষের পোষ্য পরিবার ধরে দেড় কোটি মানুষের স্বপ্ন কি রাষ্ট্র বুলডুজার—রোলারে পিষ্ট করে ফেলতে পারে? এই দেড় কোটি মানুষের স্বপ্নের অপমৃত্যুর নিবারণের ক্ষেত্রে শ্রম অধিদপ্তর কি ভূমিকা পালন করছে? এই যানবাহন আসলে রাষ্ট্র বন্ধ করতে পারবে না। কারণ এই যানবাহন আমদানিতে সরকার বাধা দেয়নি। দেশে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে ব্যাটারিচালিত রিকশা উৎপাদনে সরকার মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে বাধা দেয়নি , বিক্রি করার কোনো দোকানকে সরকার বাধা দেয়নি। শুধু পথ চলতে মানা এইটা কেমন কথা। আমেরিকা ইউরোপ দিল্লী সবর্ত্রই এই ব্যাটারিচালিত রিকশা নানা নামে চলছে এবং দিল্লীসহ নানা দেশে সরকারের পৃষ্টপোষকতায় তাদের চার্জিং স্টেশন পার্কিং স্টেশন করা আছে। আমাদের দেশে তাদের বে—আইনি বলে তাদের লাইসেন্স ও রুট পারমিট না দেবার সুযোগে পুলিশ ও শাসকদলের কমীর্রা মিলে অবৈধ চিরকুট দিয়ে তাদের নিকট থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করছে এবং এই অযান্ত্রিক যানবাহনগুলি চলছে আর শ্রম অধিদপ্তর তামাশা দেখছে এটা কি হতে পারে? স্থানীয় সরকারের কাছে কি শ্রম অধিদপ্তর জানতে চেয়েছে যে, ৬ লক্ষ অযান্ত্রিক যানের মধ্যে কেন মাত্র ৩০ হাজার নিবন্ধিত, কেন সকলকে নিবন্ধন দেওয়া হচ্ছে না? আমরা অবিলম্বে সারা দেশের সকল ব্যাটারিচালিত রিকশার বৈধ নিবন্ধন চাই। সরকারি উদ্যেগে তাদের জন্য আলাদা চার্জিং ও পার্কিং স্ট্যান্ড চাই। এ বিষয়ে আপনাদের যথাযথ কর্মতৎপরতা চাই।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, শ্রমজীবীদের টিকা প্রদানে অগ্রাধিকার নিশ্চিতকরণের দাবি আপনাদের কাছে পেশ করছি। কারণ আপনাদেরই সরকারকে বুঝিয়ে বলতে হবে করোনা বিস্তারের জন্য সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ মানুষ হলো নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ। কাজের জন্য তাদের ছুটোছুটি বেশি করতে হয়। ফলে রিকশাচালকগণ, পরিবহনের ড্রাইভার, কন্ডাকটর, হেলপারের, হোটেল মেসিয়ারের মাধ্যমেই করোনা বেশি ছড়াতে পারে। তাই এইসব জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে করোনা টিকা দেওয়ার বিষয়ে তো আপনাদেরই জোর দিয়ে সরকারকে বলা দরকার। শ্রম এবং শ্রমিকের পরিচযার্র জন্যই কিন্তু রাষ্ট্র আপনাদের বেতন নিশ্চিত করে অথচ তাদের বিষয়ে আপনাদের করণীয় আপনারা যথাযথভাবে করেছেন না, এটা নোটিশ করার জন্য আজ আমরা স্বারকলিপি দিয়ে গেলাম।
আশা করব আপনারা অতিদ্রুত সবকটা বিষয়ে যথাযথ ব্যাবস্থা নেবেন। নইলে শ্রমিকরা দুবার্র আন্দোলন গড়ে তুলে তাদের দাবি তারা আদায় করবে।”