ডেস্ক রিপোর্ট
১৪ আগস্ট ২০২১, ৯:৫৪ অপরাহ্ণ
আবু নাসের অনীক::
সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলির প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, আমরা অপরাধ-বিচ্যুতি-অনৈতিকতা সবগুলিকে একটি গ্লাসের মাধ্যে গুলিয়ে ককটেল বানিয়ে ফেলেছি। এর ফলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, এটা একক একটি পানীয়। কিন্তু বিষয়গুলির পারস্পরিক একটা সম্পর্ক থাকলেও এদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্য না বুঝে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার কারণে সমাজে একটা ভুল ম্যাসেজ যাচ্ছে।
কিছু নিয়ম-কানুন রক্ষা করে মানুষকে সমাজে টিকে থাকতে হয়। সমাজে বসবাসকারী মানুষরাই এইসব নিয়ম-কানুন তৈরি করে থাকে। কখনো কখনো মানুষ সমাজের নির্ধারিত নিয়মের বাইরে যেয়ে নিয়মবর্হিভূত আচরণ করে, তখন তাকে সমাজতত্ত্বের ভাষায় বিচ্যুতি বলে। এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, সমাজের নিয়মগুলি কিন্তু তৈরি হবার ক্ষেত্রে ঐ সমাজের প্রভাবক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আধিপত্য বিস্তার করে।
নৈতিকতা হচ্ছে, উদ্দেশ্য, সিদ্ধান্ত এবং কাজের মধ্যকার ভালো-খারাপ, উচিত-অনুচিত এর পার্থক্যকারী। আর এর বাইরে যা সকল নেতিবাচক তাকেই অনৈতিক বলা হয়। কোনটি নৈতিক ও কোনটি অনৈতিক এটা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। সমাজে সেই অনুযায়ী এটা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করে।
উপরে আলোচিত বিচ্যুতি ও অনৈতিকতার মধ্যে যে কাজগুলির জন্য আইন দ্বারা শাস্তি নির্ধারিত আছে তাকেই মূলত অপরাধ বলা হয়ে থাকে। সকল অপরাধই বিচ্যুতি ও অনৈতিক, সকল বিচ্যুতি ও অনৈতিকতা কিন্তু অপরাধ নয়। পরীমণি ইস্যুতে এটাকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে গুলিয়ে ফেলে জনগণের সামনে এটা প্রতীয়মান করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, সকল বিচ্যুতি ও অনৈতিকতা অপরাধ!
অপরাধকে ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রে আইন তৈরি করা হয়। সেই আইনের ধারা অনুসারে এটা প্রমাণিত হতে হয় সংঘটিত ঘটনাটি অপরাধ। অর্থাৎ যে ঘটনা সংঘটিত হলে তার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে আইনে শাস্তি বরাদ্দ থাকে সেটি অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। বিচ্যুতি আর অনৈতিকতা ঠেকানোর জন্য সমাজ-রাষ্ট্রে সামাজিক অনুশাসন থাকে। সেটার মাধ্যমেই এটা প্রতিরোধ করা হয়। তার জন্য মানসিক চিকিৎসাও চলতে পারে।
সামাজিক অনুশাসনগুলি তৈরি হয় ঐ সমাজের অভ্যন্তরে যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চিন্তার আধিপত্য আছে তা উপর ভিত্তি করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিচ্যুতি ও অনৈতিকতার সংজ্ঞা একধরনের অন্যদিকে একটা লুটেরা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সেটি অন্য ধরনের। এ কারণে সমাজ-রাষ্ট্র-দর্শন ভেদে এর পার্থক্য বিদ্যমান। আপেক্ষিকও বটে!
গত কয়েকদিনে পরীমণিসহ অন্য কয়েকজন নারীকে গ্রেপ্তার ও গ্রেপ্তার পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যা করছে তার ভেতর দিয়ে এটা অনেকটাই পরিস্কার হয়ে উঠেছে আমরা কোন ধরনের সমাজ-রাষ্ট্রে বাস করছি। আমরা যে সমাজে-রাষ্ট্রে বাস করছি, এটা ইতিমধ্যে পঁচে-গলে নষ্ট হওয়ার দ্বার প্রান্তে! এমন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে যা নাকে রুমাল বা টিস্যু চেপে ধরেও এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
একটি লুটেরা-পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এমনটি ঘটবে সেটাই অবশ্য স্বাভাবিক। এ ধরনের সমাজে ক্ষমতাতন্ত্রের হাত ধরে পুরুষতান্ত্রিকতা আধিপত্য বিস্তার করে থাকে। যা যেকোন ভাবেই হোক নারীর সাথে যা ইচ্ছা তাই করার লাইসেন্স-পারমিট দেয়। এ ধরনের সমাজে নারীকে অন্য আর দশটি কমোডিটির মতো মনে করা করা হয়। নারীদের ব্যক্তি জীবনকে হাটে তুলে সওদা করে। সমাজে টাকার বিনিময়ে নারীরা সঙ্গ দেয়। একই রকম ভাবে পুরুষরাও কিন্তু টাকার বিনিময়ে সঙ্গ দেয়। অথচ সে বিষয়টি আমাদের সমাজে একেবারেই অনুচ্চারিত থাকে!
সারাবিশ্বে বিশেষকরে পুঁজিবাদী দেশগুলিতে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সাথে মাফিয়াদের একটি সংযোগ আছে। বিশ্বের বড় দুটি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হলিউড ও বলিউডে এই মাফিয়াদের দৌরাত্বের নানা ধরনের উদাহরণ দেওয়া যায়। এদের সাথে শিল্পীদেরও নানামুখী সম্পর্ক আছে। বলা চলে সম্পর্কগুলি এক ধরনের বাধ্যতার মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠে। ঢালিউডও এর বাইরে নয়। এদেশের বহু মাফিয়া/লুটেরা তাদের কালো টাকা সাদা করার জন্য সিনেমায় ইনভেষ্ট করে। এরা এমন একটি চক্র, যেখানে একজন নবাগতার প্রতিভার চাইতে বিছানায় সঙ্গ দেওয়াটাকে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসাবে নির্ধারণ করে রেখেছে।
বাংলাদেশে লুটেরা-পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তৈরি হয়েছে অবক্ষয়। সেই অবক্ষয় প্রভাবিত করেছে আমাদের সামাজিক জীবন। মানুষের মননে-চিন্তায় বাস করছে এক ঘুন পোকা। যে পোকা ভিতর থেকে কাটতে কাটতে এক অন্ত:সার শূন্য অবস্থায় নিয়ে গেছে। পুরুষতান্ত্রিকতা একজন নারীকে অন্য একজন নারীর চরিত্রহননে লেলিয়ে দিচ্ছে। নারীরাও বুঝে না বুঝে এই অনৈতিক যুদ্ধে নিজেদের ব্যস্ত করছে।
আমরা এমন এক সমাজ-রাষ্ট্রে বাস করি যেখানে সাম্রাজ্যবাদ আর দেশীয় লুটেরা পুঁজিবাদ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প-সংস্কৃতি সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের অধীন। আমরা এক অবক্ষয়মূলক সংস্কৃতির মধ্যে নিপতিত। এই সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে ভোগের প্রবণতাকে এমনভাবে উসকে দেয় যা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তোলে। আমাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত লোভ-লালসায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। পারিবারিক-সামাজিক সকল দায়বদ্ধতাকে পায়ে মাড়িয়ে চলতে শেখায়। ভোগ-বিলাসিতাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
সমাজের মধ্যে এই লুটেরা ভোগের সংস্কৃতির হেজিমনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই হেজিমনিই ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র জারি রাখে, যাতে অবাধে সবকিছু ভোগ করা যায়। এটা এই সমাজের সংক্রমণ ব্যাধি। যে ব্যাধিতে সমাজের অধিকাংশই কম-বেশি আক্রান্ত। সংক্রমণ যাতে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে ঠিক সেই দায়িত্বটি পালন করে থাকে মাফিয়া গোষ্ঠী। এমনকি রাষ্ট্রের বাহিনীকেও তাদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যবহার করে।
পূর্বেই আমি এই সমাজের ব্যাধির কথা উল্লেখ করেছি। সেই সমাজের একজন সদস্য হিসাবে পরীমণিও সেই ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হবে এটাই তো স্বাভাবিক। কারণ, সংক্রমণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বলা চলে হাল আমলের করোনা সংক্রমণের চাইতেও এটা অধিকতর ভয়াবহ হয়ে উঠছে!
দেশীয় লুটেরা পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবে এখানে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে স্বাস্থ্যবিভাগের মতো জায়গায় নয়ছয় ঘটছে। কেনো হচ্ছে এসব?? সবই ভোগ-বিলাসিতার জন্য। পরীমণির যে জীবনাচরণ, সেটা তার ভোগের আকাঙ্খা থেকেই। সেটাকে হাই লাইট করা হচ্ছে। কিন্তু যারা রাষ্ট্রের, জনগণের লক্ষ-কোটি টাকা লুটপাট করছে ভোগের উদ্দেশ্যে, তাদের তুলনায় পরীমণির ভোগের আকাঙ্খা তো কিছুই না! চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললে আগে তাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। অথচ সমাজে সেটি নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। কারণ এই নষ্ট-পঁচা-গলা সমাজই ঠিক করে দেয় কোনটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে, কোনটি নিয়ে নয়!!
যারা লক্ষ কোটি টাকা লুটপাট করে তাদের প্রতি সমাজ ঘৃণা ছড়ায় না, ছড়ায় পরীমণি-মুনিয়া-তনু-নুসরাত’দের প্রতি। কারণ তাদের পরিণতির জন্য সেই লুটপাটকারী প্রতিভূদের দিকে আঙ্গুল ওঠে। এই লুটপাটাকারীদের মুখে ঘৃণার থুতু ছিটানো উচিত, কিন্তু থুতু ছিটানো হচ্ছে পরীমণিদের দিকে। রেইন্ট্রি হোটেলে ঘটে যাওয়া ঘটনা, কুমিল্লার মেয়ে তনু, মুনিয়া নিশ্চয়ই এখনো ভুলে যাননি। এদের প্রত্যেকের চরিত্রহনন করা হয়েছে। কারণ তাদের ব্যক্তি জীবনের ঘটনা প্রকাশের মাধ্যমে নিজেদের দায়কে এড়িয়ে সকল দায় তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল!
রাষ্ট্র কারা পরিচালনা-নিয়ন্ত্রণ করবে এরাই ঠিক করে। রাষ্ট্রের সমস্ত কম্পোনেন্টে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে, তাদের অঙ্গুলিহেলনে বিষয়গুলি নির্ধারিত হয়। যে প্রতিষ্ঠান শত শত একর খাস জমি দখল করে নিচ্ছে, প্রান্তিক মানুষকে তাঁর ঘর-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার পরেও সরকার নিশ্চুপ থাকে, তারাই তো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আনভীর, রন হক’রা অনায়েসেই চার্জশিট থেকে নাম কাটিয়ে নিচ্ছে! লুটেরাদের পক্ষ নিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী গুলি করে শ্রমিক হত্যা করে।
পরীমণি’দের জীবন দর্শন এমন হবার দায় কার?? এই অসুস্থ সমাজের!! এই সমাজকে অসুস্থ করে তোলার দায় কার?? লুটেরা পুঁজিবাদের। যাদের লুটপাটের সীমা-পরিসীমা নেই, ভোগ-বিলাসের শেষ বলে কোন শব্দ নেই। এদের ভোগের বলি হয়ে আগুনে পুড়ে মরতে হয় নিরীহ শ্রমিকদের, মুনিয়া-পরীমণিসহ আরো অনেকের। পরীমনি’দের জীবনযুদ্ধে যেনতেনভাবে জয়ী হবার মানসিকতার দায় এই নষ্ট-পঁচা-গলা সমাজের। এই সমাজকেও কাঠগড়ায় তুলতে হবে। এই সমাজ যারা টিকিয়ে রাখে আমি তাদের প্রত্যেকের বিচার দাবি করি। জানি, এই রাষ্ট্রে-সমাজে সেটি সম্ভব নয়। সেজন্যই প্রত্যাশায় থাকি এক নতুন সমাজের।
লেখক : সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী