ডেস্ক রিপোর্ট

১৩ জুন ২০২১, ৭:৩০ অপরাহ্ণ

৬ দফা দাবিতে মন্ত্রণালয় বরাবর পাটকল শ্রমিকদের স্মারকলিপি পেশ

আপডেট টাইম : জুন ১৩, ২০২১ ৭:৩০ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

অধিকার ডেস্ক:: পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল আধুনিকায়নসহ চালু, বদলি শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধসহ ৬ দফা দাবিতে করিম ও লতিফ বাওয়ানী জুট মিলের চাকরিচ্যুত শ্রমিকবৃন্দ আজ ১৩ জুন ২০২১ বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন(বিজেএমসি) ও পাট মন্ত্রণালয় বরাবর স্মারকলিপি পেশ করেছে।

সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে করিম জুট মিলের শ্রমিকনেতা মোহাম্মদ গোফরানের সভাপতিত্বে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি জহিরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সদস্য ফখ্রুদ্দিন কবির আতিক, করিম জুট মিলের শ্রমিকনেতা জাফর উল্লাহ, এরশাদ-উজ-জামান, লতিফ বাওয়ানী জুট মিলের শ্রমিকনেতা মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, মোস্তফা কামাল প্রমুখ।

সমাবেশ শেষে একটি মিছিল বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন অভিমুখে যায় এবং সেখানে একটি প্রতিনিধি দল বিজেএমসি চেয়ারম্যান আবদুর রউফের কাছে স্মারকলিপি পেশ করেন।

পাটকল করপোরেশনের সামনে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাওয়ানী জুট মিলের শ্রমিকনেতা গোলাম মাওলা বাহার, করিম জুট মিলের হাসি বেগম, জাফর উল্লাহ, শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি রাজু আহমেদ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাসুদ রানা, শ্রমিকনেতা তসলিমা আক্তার, ভজন বিশ্বাস প্রমুখ। পরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি পেশ করা হয়।

সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, “করোনা মহামারির মধ্যে গত বছর ২০২০ সালের ২ জুলাই রাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকলে উৎপাদন বন্ধের নোটিশ টাঙ্গানো হয়। এর ফলে স্থায়ী, বদলি ও দৈনিকভিত্তিক মিলিয়ে এক ধাক্কায় প্রায় ৫৭ হাজার শ্রমিকের কর্মক্ষম হাতকে বেকারের হাতে পরিণত করা হয়েছে। শুধু শ্রমিক নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাটচাষি-পাটশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার ও তাদের পরিবারসহ লক্ষ লক্ষ মানুষ। সরকারী পাটকল বন্ধের সময় বলা হয়েছিল – ৩ মাসের মধ্যে শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকজনিত ক্ষতিপূরণসহ সকল পাওনা মিটিয়ে দিয়ে পাটকলগুলো পুনরায় চালু করা হবে। কিন্তু ১ বছর হতে চললেও এখনো সমস্ত স্থায়ী শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ হয়নি। বদলি শ্রমিকদের পাওনা দেয়া এখনো শুরুই করা হয়নি। করোনা মহামারীজনিত লকডাউনের মধ্যে বিকল্প কাজ ও আয়ের অভাবে এই শ্রমিকদের দুর্দশা বর্ণনাতীত।

পাওনার টাকাটুকু হাতে পেলে এই অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে তাঁরা কোনমতে চলতে পারতেন। স্থায়ী শ্রমিকরা যারা তাদের পাওনা-র অর্ধেক নগদে পেয়েছেন, তাঁদেরও কিছু অসন্তোষ রয়ে গেছে। ২০১৯ সালের কয়েকটি সপ্তাহের বকেয়া মজুরি, ২০২০ সালের ১ও ২ জুলাই কাজের মজুরি-ঈদ বোনাস, ২০১৫ সালের মজুরি কমিশন অনুযায়ী (যা পাটকলে ২০১৯ থেকে কার্যকর হয়েছে) ২০১৫-১৯ পর্যন্ত বোনাস ও ছুটির টাকার ডিফারেন্স, বৈশাখী ভাতার টাকা ইত্যাদি তারা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারী ঘোষণা অনুযায়ী পাওনার বাকী অর্ধেক টাকার সঞ্চয়পত্রের ত্রৈমাসিক সুদও বেশিরভাগ স্থায়ী শ্রমিক এখনো পাচ্ছেন না।

এদিকে, ১ বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকায় মিলগুলোর যন্ত্রপাতি অচল-নষ্ট, জমে থাকা কাঁচামাল-উৎপাদিত পণ্য লুটপাট এবং জায়গা-জমি বেদখল হওয়ার আশংকা বাড়ছে। শোনা যাচ্ছে সরকার রাষ্ট্রীয পাটকলগুলো ব্যক্তিমালিকদের কাছে লীজ দেওয়ার চেষ্টা করছে। অতীতে পাটকলগুলোর বেসরকারিকরণের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বেসরকারীকরণের নামে সস্তায় জমি ও যন্ত্রপাতি লুটপাট করা, বিশাল জমি দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ নেয়া, খন্ড খন্ড বিক্রি করে আবাসন ব্যবসার দৃষ্টান্তই আমরা দেখেছি। বন্ধ করা ২৫টি সরকারী পাটকলে ১২০০ একর জমি, কারখানার অবকাঠামো, গোডাউন, যন্ত্রপাতি আছে। মোট সম্পত্তির পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বেসরকারীকরণের নামে জনগণের সম্পদ লুটপাটের আয়োজন করা হচ্ছে কি না – সে আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে।”

বক্তাগণ আরও বলেন, “রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের পেছনে সরকারের বড় অজুহাত লোকসান। কিন্তু কেন লোকসান, কাদের কারণে লোকসান, লোকসান কাটাতে কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল – সে সব প্রশ্নের উত্তর নেই। এর দায় কার, শ্রমিকের না কি ম্যানেজমেন্ট ও নীতি নির্ধারকদের, শ্রমিক একা কেন শাস্তি পাবে – এই প্রশ্ন আমরা দেশবাসীর কাছে রাখতে চাই।

পাটকে বলা হতো বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। পরিবেশ সচেতনতার কারণে ক্ষতিকর পলিথিন-প্লাস্টিক পণ্যের পরিবর্তে বিশ^ব্যাপী পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। চাল-গম-আটা-চিনিসহ ১৮টি পণ্যের মোড়ক ব্যবহারে পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার আদেশ ‘ম্যানডেটরি প্যাকেজিং অ্যাক্ট ২০১০’ বাস্তবায়ন হলে দেশের বাজারে পাটের বিপুল চাহিদার সৃষ্টি হবে। ফলে পাটশিল্পের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। সম্ভাবনা আছে বলেই বেসরকারি পাটকলগুলো লাভ করছে। আমরা মনে করি, আধুনিকায়ন করে পুনরায় চালু করলে ও লোকসানের কারণগুলো দূর করে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে, দুর্নীতিমুক্তভাবে পরিচালনা করতে পারলে রাষ্ট্রীয় খাতে রেখেই পাটকলগুলো লাভজনক করা সম্ভব।”

সমাবেশে নেতৃবৃন্দ ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ সব গণআন্দোলনে পাটকল শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য সংগ্রামী ভূমিকার কথা তুলে ধরে বলেন, “বর্তমান সরকার পাটের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কারের কৃতিত্ব দাবি করে পরিবেশবান্ধব পাটখাত পুনর্জাগরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এসব স্মরণে রেখে ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প ও পাটকলশ্রমিকদের রক্ষায় ৬ দফা দাবি পূরণে আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আগামী জুলাই মাসের মধ্যে যাবতীয় পাওনা পরিশোধসহ শ্রমিকদের বাঁচার দাবি বাস্তবায়ন না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে নামা ছাড়া বিকল্প থাকবে না।”

শ্রমিকদের ৬ দফা দাবি :

১. রাষ্ট্রীয় পাটকলের বদলি শ্রমিকদের সকল বকেয়া পাওনা অবিলম্বে পরিশোধ কর।

২. নামের ভুল দ্রুত সংশোধন করে অবশিষ্ট স্থায়ী শ্রমিকদের পাওনা অবিলম্বে পরিশোধ কর।

৩. ২০১৯ সালের বকেয়া সপ্তাহের মজুরি দিয়ে দাও।

৪. ২০১৫ সালের মজুরি কমিশন অনুযায়ী গত ৪ বছরের ছুটি ও ৯টি বোনাস, চিকিৎসা-শিক্ষা ভাতার ডিফারেন্স, বৈশাখী ভাতার টাকা পরিশোধ কর।

৫. বেসরকারি পাটকলে ২০১৫ সালের মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন কর।

৬. রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ নয়, আধুনিকায়নসহ চালু কর। ক্যাজুয়াল ভিত্তিতে নয়, বদলি/স্থায়ী হিসাবে পুরনো শ্রমিকদের অগ্রাধিকারে নিয়োগ দিতে হবে।

 

 

শেয়ার করুন