ডেস্ক রিপোর্ট

৯ মে ২০২১, ১০:৫৫ অপরাহ্ণ

মৌলভীবাজারে চা-শ্রমিক সংঘের মে দিবস পালন

আপডেট টাইম : মে ৯, ২০২১ ১০:৫৫ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

মৌলভীবাজারে চা-শ্রমিক সংঘের মে দিবস পালন
অধিকার ডেস্ক:: আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস মহান মে দিবস উপলক্ষে ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ০৯ মে সকাল ১১ টায় চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির উদ্যোগে কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগরস্থ অস্থায়ী কার্যালয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক হরিনারায়ন হাজরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি কবি শহীদ সাগ্নিক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি মোঃ নুরুল মোহাইমীন, ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমলেশ শর্ম্মা, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের নেতা রজত বিশ্বাস, সুনছড়া ডিভিশন চা-শ্রমিক যুব সংঘের সভাপতি মিলন নায়েক ও সাধারণ সম্পাদক স্বপন নায়েক, চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক শ্যামল অলমিক, লংলা চা-বাগানের নেতা শিশুলাল লোহার, চাতলাপুর চা-বাগানের নারায়ন নাইড়–, রতিশ কীর্তি, সুনছড়া চা-বাগানের বীর্শা কর্মকার, শ্রীরাম ভূইয়া, মিলন ভূইয়া, জয়নাল আবেদীন, রাজকুমার ভূইয়া প্রমূখ।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ১৮৮৬ সালে রক্তঝরা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণি সামাজিক স্বীকৃতি এবং বিশ্বব্যাপী ৮ ঘন্টা শ্রম, ৮ ঘন্টা বিশ্রাম ও ৮ ঘন্টা বিনোদনের দাবি প্রতিষ্ঠিত করে। ৮ ঘন্টা শ্রম দিবস এবং মহান মে দিবসে ছুটি কারো দান নয় বরং শ্রমিক শ্রেণির রক্তস্নাত পথে অর্জিত অধিকার। প্রয়াত চা-শ্রমিকনেতা মফিজ আলীসহ তৎকালীন চা-শ্রমিক নেতৃবৃন্দের ভূমিকায় ১৯৬৪ সালে ৩ মে শমসেরনগরে পূর্ব-পাকিস্তান চা-শ্রমিক সংঘের উদ্যোগে প্রথম মহান মে দিবস পালন করে। সেই সময় মে দিবসে চা-শ্রমিকদের ছুটি ছিল না। পূর্ব-পাকিস্তান চা-শ্রমিক সংঘের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে চা-শ্রমিকরা মে দিবসে আজও ছুটি ভোগ করছেন। দেড়শ বছরের বেশি সময় চা-শ্রমিকদের ছুটির দিনের মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছিল, চা-শ্রমিক সংঘের আইনী ও প্রচার আন্দোলনের কারণে ২০১৬ সাল থেকে চা-শ্রমিকরা ছুটির দিনের মজুরি পাচ্ছেন, যদিও সে ক্ষেত্রেও রয়েছে বে-আইনী শর্ত।

বক্তারা বলেন, চায়ের আবাদ বাড়ছে, বেড়েছে চা-উৎপাদন ও মূল্য দুটোই, মালিকদের মুনাফাও প্রতিবছরই বাড়ছে; শুধু বাড়ছে না শ্রমিকের মজুরি। যখন মোটা চালের কেজি ৫০/৫২ টাকা, আলু ২০/২২ টাকা, পিয়াজ ৪৫/৫০ টাকা, খোলা সোয়াবিন তেল লিটার ১২০ টাকা, বুটের ডাল ৭৫ টাকা, লবন ৩০/৩৫ টাকা, বাজারে ৪০/৫০ টাকার নিচে কোন সবজি মিলছে না সেই সময়ে দৈনিক মাত্র ১২০ টাকা মজুরিতে কি করে একজন চা-শ্রমিক ৬/৭ জনের পরিবার চালাবে? বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশীয় চা-সংসদের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী চা-শ্রমিকদের মজুরি এ ক্লাস বাগানে দৈনিক ১২০ টাকা, বি ও সি ক্লাস বাগানে যথাক্রমে ১১৮ টাকা ও ১১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এই মজুরির মেয়াদ ৪ মাস আগেই উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও মালিকপক্ষ বা তথাকথিত নেতারা মজুরি বৃদ্ধির কোন উদ্যোগ নেননি। অথচ করোনাকালে বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন বন্ধ থাকলেও চা-শ্রমিকদের একদিনের জন্য ছুটি দেওয়া হয়নি। উপরন্ত বর্তমানে কাজের নিরিখ(টার্গেট) বাড়ানোর জন্য মালিকপক্ষ ও ইউনিয়নের নেতারা শ্রমিকদের উপর চাপ প্রয়োগ করছেন।

বক্তারা বলেন, পৃথিবীতে বাংলাদেশের চা-শ্রমিকরা সবচেয়ে কম মজুরি পান উল্লেখ করে বক্তারা বলেন প্রতিবেশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চা-শ্রমিকদের মজুরি দৈনিক ২০২ রূপি(২৩৫ টাকা), আসামের চা-শ্রমিকদের মজুরি দৈনিক ২১৭ রুপি(২৫১ টাকা), কেরালার চা-শ্রমিকদের বেসিক ৩৮০ টাকা যা সাকুল্যে দৈনিক ৬০০ রুপি(৬৯৪ টাকা), শ্রীলঙ্কায় চা-শ্রমিকদের মজুরি দৈনিক ১০০০ রুপি( ৪৬০.৪০ টাকা), নেপালে চা-শ্রমিকদের মজুরি দৈনিক ২৭৮ রুপি(১৯৮ টাকা), কেনিয়ার চা-শ্রমিকদের মজুরি মাসিক ১৫,৯৫০ শিলিং(১২৪৬৯ টাকা) থেকে ৫৩,৮৯৭ শিলিং(৪২১৩৩ টাকা), শীর্ষ চা উৎপাদনকারী দেশ চীনের শ্রমিকদের প্রদেশ ভিত্তিক নি¤œতম মজুরি ঘন্টা প্রতি ১৮.৪ থেকে ২৪ ইউয়ান(২৩৩ থেকে ৩০৫ টাকা)। করোনাকালে পশ্চিমবঙ্গের চা-বাগান বন্ধ থাকার পরও শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে দুর্গা পূজায় তাদের বোনাস ১৮.৫% হতে বৃদ্ধি করে ২০% এবং বোনাসের সিলিং বাড়িয়ে ১৪,৫০০ রুপি(১৬,৫৬০ টাকা) করা হয়। বলাবাহুল্য অন্যান্য দেশসমূহের চা-শ্রমিকরা আমাদের থেকে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও অনেক বেশি পেয়ে থাকেন। অথচ আমাদের দেশের সরকার কথায় কথায় তাদের তথাকথিত উন্নয়নের ফিরিস্তি দিতে গিয়ে প্রায়ই বলে থাকেন বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে প্রতিবেশিদের থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। সরকারি তথ্য মতে দেশে রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, মাথাপিছু আয় ২,০৬৪ ডলার(১,৭৫,৫২৪ টাকা); সেখানে একজন চা-শ্রমিকের সর্বোচ্চ আয় মাসিক ৩,৬০০ টাকা হিসেবে বার্ষিক ৪৩,২০০ টাকা মাত্র। এমতবস্থায় সরকার গঠিত নি¤œতম মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতিপূর্ণভাবে ৬/৭ জনের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য দৈনিক ৬৭০ টাকা মজুরিসহ চা-শিল্পে নৈমিত্তিক ছুটি(বছরে ১০ দিন) কার্যকর ও অর্জিত ছুটি প্রদানে বৈষম্যসহ শ্রম আইনের বৈষম্য নিরসন করে গণতান্ত্রিক শ্রমআইন প্রণয়ন এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মজুরি ও উৎসব বোনাস প্রদানে সকল অনিয়ম বন্ধ করে শ্রমআইন মোতাবেক নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, সার্ভিস বুক প্রদান এবং ৯০ দিন কাজ করলেই সকল শ্রমিককে স্থায়ী(পাক্কা দফা) করার দাবি জানানো হয়।

শেয়ার করুন