ডেস্ক রিপোর্ট
৭ মে ২০২১, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ
আবু নাসের অনীক::
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের, জন্মের পটভূমিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একটি অবিচ্ছেদ্য ঐতিহাসিক স্থান। সারাদেশে উন্নয়নের নামে যে বিষাক্ত বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে সেটি এখন এই উদ্যানটির দিকে ধেয়ে আসছে। ইতিমধ্যে অর্ধশত বছরের শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। যে গাছগুলির আর বাংলাদেশের জন্ম একইসাথে। উন্নয়নের জোয়ার দেখানোর অভিপ্রায়ে ঘটা করে স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করা হয়, আর একই সময়ে জন্ম নেওয়া সেই ঐতিহাসিক উদ্যানের গাছগুলিকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়।
দিনে দিনে আমরা এক নৃশংস জাতিতে পরিণত হচ্ছি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো একটি ঐতিহাসিক স্থানে গাছ কাটা হচ্ছে ভাতের হোটেল স্থাপনের যুক্তিতে। এই লুটেরাগোষ্ঠী লুটপাটের জন্য কোথায় নামিয়েছে নিজেদের!! এই উদ্যানের চারপাশের এলাকায় এ ধরনের প্রচুর হোটেল আছে। তারপরেও গাছ কেটে হোটেল স্থাপন, অর্থাৎ কোন লুটেরাগোষ্ঠীকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়াই লক্ষ্য। এভাবেই তো চলছে উন্নয়নের জোয়ার। যতো বড় মেগা প্রকল্প ততোই কমিশন আর লুটপাট। উদ্যানটিতে ২০ বছর আগেও যে পরিমান গাছ ছিলো এখন তার অর্ধেকও নেই। আরো ২০ বছর পর হয়তো দেখা যাবে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, আছে সারি সারি দেওয়া ভাতের হোটেল।
এই শহর বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে বায়ু দূষণে প্রথম তিনটি শহরের একটি। একইসাথে শহরের তাপমাত্রাও ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে। করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী লকডাউনে কার্বন নির্গমন ৪.৬% কমে গেছে। ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমে গেলেও ঢাকা শহরের তাপমাত্রা কিন্তু কমেনি। তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমান বৃদ্ধি ও বৃক্ষ নিধন। এই দুটি বিষয় ঢাকা শহরে প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।
একটি আদর্শ শহরের ২৫% মুক্ত এলাকা থাকা প্রয়োজন। এবার ভাবুন, ঢাকা শহরের মুক্ত এলাকার পরিমান!! একটি দেশে ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন, সেখানে আছে ১৭%। আর ঢাকা শহরে সবুজ অঞ্চলের পরিমান ৭% এরও কম। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বাস করছে ৫৫ হাজার মানুষ। এই শহরে একদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এসির ব্যবহার। আমরা এক দুষ্টচক্রের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছি। অবশ্য সরকারের তাতে বিশেষ মাথা ব্যাথা আছে বলে মনে হয় না। থাকলে ভাতের হোটেলের জন্য গাছ কাটতো না।
এই সরকার লুটপাটের স্বার্থে তাদের তৈরি করা আইনকেও তোয়াক্কা করে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সংরক্ষণের নির্দেশনা চেয়ে ২০০৯ সালে হাইকোর্টে একটি রিট হয়। রিটের প্রেক্ষিতে রায়ে মহামান্য আদালত নির্দেশনা প্রদান করেন।
রায়ে নির্দেশনায় বলা হয়,‘রমনা তথা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকা নিছক একটি এলাকা নয়। এই এলাকাটি ঢাকা শহর পত্তনের সময় থেকেই এ পর্যন্ত একটি বিশেষ এলাকা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে এবং এর একটি ঐতিহাসিক ও পরিবেশগত ঐতিহ্য আছে। শুধু তাই নয়, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্র এই এলাকা। এই পরিপ্রেক্ষিতেও সম্পূর্ণ এলাকাটি একটি বিশেষ এলাকা হিসাবে সংরক্ষণের দাবী রাখে। এখানে এমন কোন স্থাপনা থাকা উচিত নয় যা এই এলাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারে।’
‘পরিবেশগত দিক থেকে তা আরও বিধেয় নয়। কারণ রমনার উদ্যান রমনা রেসকোর্স ময়দান ঢাকা শহরের দেহে ফুসফুসের মতো অবস্থান করছে। কোনভাবেই একে রোগাক্রান্ত করা যায় না। যেহেতু স্মরণকাল থেকে এটা উদ্যান হিসেবে পরিচিত সেহেতু ২০০০ সালের ৩৬ নং আইন অনুসারে সোহরাওয়ার্দী ‘উদ্যান’ সংজ্ঞার আওতাধীন এবং এই জায়গার শ্রেণী সাধারণভাবে অপরিবর্তনীয়। এটা অনাবশ্যক স্থাপনা দিয়ে ভারাক্রান্ত করা অবৈধ হবে’। সেই অবৈধ কাজটিই সরকার অবলীলায় করছে, এটি আদালত অবমাননা।
২০০০ সালের ৩৬ নং আইনের ধারা ‘(৫) খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধারের শ্রেণী পরিবর্তনে বাধা-নিষেধ- এই ধারার উদ্দেশ্যে পূরণকল্পে, কোন উদ্যানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয় এইরুপে উহার বৃক্ষরাজি নিধনকে উদ্যানটির শ্রেণী পরিবর্তন রুপে গণ্য করা হইবে’। আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে গাছ কাটা যাবে না। এবং গাছ কাটা রীতিমতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কে কাকে শাস্তি দিবে??
এখানকার শাসকগোষ্ঠী উন্নয়ন বলতে বোঝে যেনতেন উপায়ে কিছু অবকাঠামো নির্মান, রাস্তা-বন্দর তৈরি, তাপ-কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প। যা আদৌও টেকসই উন্নয়নের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। টেকসই উন্নয়ন বলতে এমন ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডকে বোঝায়, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাও নিশ্চিত হবে অন্যদিকে প্রকৃতি এবং বাস্তুতন্ত্রে (ইকোসিস্টেম) কোন খারাপ প্রভাব পড়বেনা। যাতে আগামী প্রজন্মের জীবনযাত্রা কোন পরিবেশগত হুমকীর মুখে না পড়ে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের যে সমস্ত রাষ্ট্রে অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী সরকার রয়েছে তারা উন্নয়নের এই সংজ্ঞার ধারকাছ দিয়েও যায় না। ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হবে, তাদের পদ্ধতিতেই তারা উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করে। তাতে সুন্দরবন ধ্বংস হলে হোক, গাছ কেটে শহরকে বিষাক্তময় করে, পরিবেশ ধ্বংস করে, ঐতিহ্য নিশিচহ্ন করে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসতে হবে, কী বলেন, মাননীয়গণ!!
UNESCO বলছে,‘There are four dimensions to sustainable development- society, environment, culture and economy- which are intertwined, not separate. Sustainability is a paradigm for thinking about the future in which environmental, societal and economic consideration are balanced in the pursuit of an improved quality of life.’ এখানকার মেগা প্রজেক্টের ৮০ শতাংশই পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমকে ধ্বংসের মুখে ফেলেছে। খোদ ইউনেস্কোর প্রবল বিরোধীতা সত্বেও রামপাল তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। যা সুন্দরনবনকে ধ্বংস করবে।
বিশ্বব্যাপী এই করোনা মহামারীর সময়ে মানুষ অক্সিজেনের সংকটে ভুগছে, মৃত্যু হচ্ছে। পৃথিবীব্যাপী প্রাকৃতিক অক্সিজেনের আধার গাছকে রক্ষা করছে। আমাদের উন্নয়নখোর সরকার সেখানে অন্যায়ভাবে, আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাছ কাটছে। নাটোরের সিংড়া উপজেলার চামারী ইউনিয়নের গেটিয়া এলাকায় সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় রাস্তার দুইধারে লাগানো ২০০ গাছ কেটে নিয়েছে স্থানীয় সরকার দলীয় নেতা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছ কাটার ষড়যন্ত্র চলছে।
আধুনিক বিশ্বে গাছকে রক্ষা করেই যেকোন উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। স্থাপত্যবিদ্যা এখন অনেক এগিয়ে গেছে। উদ্যানের মধ্যে হাটার রাস্তা করতে চান, বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগকে ডিজাইন করার দায়িত্ব দেন। তারা অনায়াসেই গাছ রক্ষা করেই হাটার রাস্তার ডিজাইন দিতে পারবে। আসলে গাছ কাটতে হবে এটাই তো লক্ষ্য, সেটাই করছেন। আইনও মানছেন না! এতো ক্ষুধা আপনাদের!
কথা খুব স্পষ্ট, আইন ভঙ্গ করে উদ্যানের ভিতর গাছ কেটে ভাতের হোটেল স্থাপন করা বন্ধ করুন। অবশ্য যারা মানুষের কান্না বোঝে না, তাদের পক্ষে গাছের কান্না বোঝা তো অনেক দুরের ব্যাপার। মানুষকে তার নিজের বেঁচে থাকার রসদ রক্ষার জন্য এই গাছ কাটার প্রতিবাদে এগিয়ে আসতে হবে। স্বাধীনতার ৫০ বছরের অর্জন, গাছ রক্ষার জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে!!
লেখক : সাবেক সভাপতি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যুব পরিষদ