ডেস্ক রিপোর্ট

৩০ জুন ২০২৩, ১১:৪৯ অপরাহ্ণ

আমরা বিষ গ্রহণ করছি আমাদের নিশ্বাসে

আপডেট টাইম : জুন ৩০, ২০২৩ ১১:৪৯ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক::
মানুষ বায়ু (অক্সিজেন) গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। কিন্তু আমরা এমন একটা সময় পার করছি যখন এই বাতাসই আমাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাত আমরা এখন আর নির্মল-বিশুদ্ধ বাতাস শ্বাসের জন্য গ্রহণ করতে পারছি না। যে বায়ু আমরা গ্রহণ করছি তা ব্যাপক মাত্রায় দূষিত হয়ে গেছে।

প্রায় ২.৪ বিলিয়ন মানুষ দূষণকারী জ্বালানী দিয়ে রান্না করে এবং প্রতি বছর ৩.২ মিলিয়ন মানুষ ঘরের অভ্যন্তরের বায়ু দূষণের কারণে অকালে মারা যায়। জনসংখ্যার ৯৯% এরও বেশি মানুষ এমন এলাকায় বাস করে যেখানে বায়ু দূষণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ু মানের নির্দেশিকাগুলির উপরে। এবং প্রতি বছর ৪.২ মিলিয়ন মৃত্যু পরিবেষ্টিত বায়ু দূষণের জন্য ঘটে।

পরিবেষ্টিত অর্থাত বাইরের এবং গৃহস্থালী বায়ু দূষণ একইধরণের প্রক্রিয়া থেকে আসতে পারে যেমন জ্বালানীর অসম্পূর্ণ দহন বা গ্যাসের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া। যেমন অনুন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে রান্না করা, কেরোসিন এর ব্যবহার গৃহস্থালির কাজ গৃহের অভ্যন্তরে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক দূষক নির্গত করে।

জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক দূষণকারীগুলির মধ্যে রয়েছে কণা পদার্থ (PM), কার্বন মনোক্সাইড (CO), ওজোন (O3), নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড (NO2) এবং সালফার ডাই অক্সাইড (SO2)। এই বিভিন্ন দূষণকারীর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। কিছু দূষণকারীর জন্য, এমন কোন প্রতিকার ব্যবস্থা নেই যার মাধ্যমে বিরূপ প্রভাব ঠেকানো সম্ভব হয়।

পার্টিকুলেট ম্যাটার (PM) বলতে বোঝায় সালফেট, নাইট্রেট, অ্যামোনিয়া, সোডিয়াম ক্লোরাইড, ব্ল্যাক কার্বন, খনিজ ধূলিকণা বা পানির সমন্বয়ে গঠিত নিঃশ্বাসযোগ্য কণা। PM বিভিন্ন আকারের হতে পারে এবং সাধারণত তাদের অ্যারোডাইনামিক ব্যাস দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়, পিএম ২.৫ এবং পিএম ১০ নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে সবচেয়ে সাধারণ এবং স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগি।

মোটা কণা (২.৫ µm এবং ১০ µm এর মধ্যে ব্যাসযুক্ত কণা) নামক বৃহত্তম কণার প্রধানত উৎসসমূহ হলো ফুলের পরাগ, সমুদ্রের স্প্রে, মাটির ক্ষয়, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট এবং খনির কাজের সময় বায়ু-প্রবাহিত ধুলো। সূক্ষ্ম কণাগুলি (অর্থাৎ,পিএম ২.৫) প্রাথমিক উৎস (যেমন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প বা যানবাহনে জ্বালানীর দহন) এবং গৌণ উৎস (যেমন, গ্যাসের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া) থেকে প্রাপ্ত হতে পারে।

বাড়ির চারপাশে কণা পদার্থের সবচেয়ে বড় উৎস হল সাধারণত খোলা চুলা, অকার্যকর চুলা বা স্পেস হিটারে দূষণকারী জ্বালানীর দহন। রান্না, ঘর গরম করা এবং আলোর মতো গৃহস্থালির কাজকর্ম ছাড়াও, অন্যান্য ক্রিয়াকলাপগুলি বাড়ির পরিবেশে কণা দূষণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসাবে ভুমিকা রাখে।

পিএম ফুসফুসের গভীরে এবং রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে সক্ষম যার ফলে কার্ডিওভাসকুলার (ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ), সেরিব্রোভাসকুলার (স্ট্রোক) এবং শ্বাসযন্ত্রে প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদী এবং স্বল্প-মেয়াদী উভয় প্রভাবে কণার সংস্পর্শে কার্ডিওভাসকুলার এবং শ্বাসযন্ত্রের রোগ থেকে অসুস্থতা এবং মৃত্যু ঘটে। এটি বায়ু দূষণের সংস্পর্শে আসার স্বাস্থ্যের প্রভাবগুলি মূল্যায়নের জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত সূচক। বায়ু দূষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ঝুঁকির কারণ এবং এজন্য প্রতি বছর প্রায় ৭ মিলিয়ন মৃত্যু ঘটে।

নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড (NO2) হল একটি লালচে-বাদামী গ্যাস যা পানিতে দ্রবণীয় এবং একটি শক্তিশালী অক্সিডেন্ট। NO2 এর পরিবেষ্টিত উৎসগুলি হচ্ছে শিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াতে জ্বালানীর উচ্চ তাপমাত্রার দহন ও পরিবহনের জ্বালানী দহনের ফলে হয়।

নাইট্রোজেন অক্সাইডের (NOx) গৃহস্থালীর উৎসগুলির মধ্যে রয়েছে এমন জিনিস যা জ্বালানী পোড়ায় যেমন গ্যাস-কয়লা-কেরোসিন এমন চুলো, ফায়ারপ্লেস ইত্যাদি। নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের প্রভাবে শ্বাসনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং শ্বাসযন্ত্রের রোগ বাড়িয়ে তোলে।

গ্রাউন্ড-লেভেল ওজোন (O3) ধোঁয়ার একটি প্রধান উপাদান। এটি পরিবহন ও শিল্প থেকে নির্গত ধোয়ার মধ্যে কার্বন মনোক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOx) এর সাথে আলোক রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে গঠিত হয়। আলোক-রাসায়নিক প্রকৃতির কারণে, রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার সময় ওজোনের সর্বোচ্চ মাত্রা দেখা যায়। অত্যধিক ওজোনের প্রভাবে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস করে এবং ফুসফুসের রোগ হয়।

কার্বন মনোক্সাইড (CO) হল একটি বর্ণহীন, গন্ধহীন গ্যাস যা কাঠ, পেট্রোল, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সাধারণ চুলা, খোলা আগুন, চুল্লি, ফায়ারপ্লেসের মতো কার্বনসিয়াম জ্বালানীর অসম্পূর্ণ দহনের ফলে উৎপন্ন হয়। পরিবেষ্টিত বাতাসে কার্বন মনোক্সাইডের (CO) প্রধান উৎস হল যানবহন।

কার্বন মনোক্সাইড ফুসফুসের টিস্যু জুড়ে এবং রক্ত প্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে, যা শরীরের কোষগুলির জন্য অক্সিজেনের সাথে আবদ্ধ করা কঠিন করে তোলে। অক্সিজেনের এই অভাব টিস্যু এবং কোষের ক্ষতি করে। কার্বন মনোক্সাইডের সংস্পর্শে শ্বাস নিতে অসুবিধা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা এবং অন্যান্য ফ্লু-এর মতো লক্ষণ দেখা যায়। কার্বন মনোক্সাইডের উচ্চ মাত্রার প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।

সালফার ডাই অক্সাইড (SO2) একটি বর্ণহীন গ্যাস যা পানিতে সহজেই দ্রবণীয়। এটি প্রধানত ঘর গরম, শিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানীর দহন থেকে উদ্ভূত হয়। SO2-এর প্রভাবে অ্যাজমা এতোটা ভয়াবহ হয় যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

পেইন্ট, সিরামিক, পাইপ এবং প্লাম্বিং উপকরণ, সোল্ডার, পেট্রল, ব্যাটারি, এবং প্রসাধনী সামগ্রীর মতো পণ্যগুলির দূষিত ধুলোতে সীসা (পিবি) এবং সীসা কণা যৌগগুলি পাওয়া যায়। সীসা সহ যানবাহনের জ্বালানী নিষ্কাশন থেকে পরিবেষ্টিত বায়ুতেও সীসা পাওয়া যায়।

সীসা শিশু এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিশেষভাবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। সীসার সংস্পর্শে আসা শিশুদের আচরণ এবং শেখার সমস্যা, নিম্ন আইকিউ এবং হাইপারঅ্যাকটিভিটি, ধীর বৃদ্ধি, শ্রবণ সমস্যা এবং রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। গর্ভবতী মহিলাদের জন্য, স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ভ্রূণের বৃদ্ধি হ্রাস এবং অকাল জন্ম। সীসার সংস্পর্শে আসা প্রাপ্তবয়স্কদেরও প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধির ফলে কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা, কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস এবং পুরুষ ও মহিলা উভয়ের মধ্যে প্রজনন সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন (PAH) কণা আকারে বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত থাকে। এগুলি হল একদল রাসায়নিক পদার্থ যা প্রাথমিকভাবে জৈব পদার্থের অসম্পূর্ণ দহন (যেমন মাংস রান্না) এবং সেইসাথে কোক ওভেন, ডিজেল ইঞ্জিন এবং কাঠ-পোড়া চুলায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি হয়। এছাড়া তামাকের ধোঁয়া থেকেও নির্গত হয়। স্বল্পমেয়াদী প্রভাবে চোখ এবং শ্বাসের প্যাসেজে সমস্যা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে ফুসফুসের ক্যান্সার হয়।

বায়ুদূষণকারীরা শুধুমাত্র স্বাস্থ্যকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতি করে না, পৃথিবীর জলবায়ু এবং বিশ্বব্যাপী বাস্তুতন্ত্রকেও ধ্বংস করে। বিশ্বব্যাপী পরিবেষ্টিত বায়ু দূষণের জন্য মোট মৃত্যুর ৪৩% মৃত্যু ঘটে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ এ, ২৫% মৃত্যু ঘটে ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ রোগে, ২৪% মৃত্যু ঘটে স্ট্রোকে , ১৭% মৃত্যুর কারণ তীব্র নিম্ন শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ থেকে, ২৯% মৃত্যু হয় ফুসফুসের ক্যান্সারে।

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে বসবাসকারী মানুষরা সাধারণত বায়ু দূষণের উচ্চ মাত্রার কারণে বায়ু দূষণের জন্য বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বায়ু দূষণের স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলি দারিদ্র্যের সাথে দৃঢ়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।

বাংলাদেশের বায়ু দূষণের পরিস্থিতি কী? বাংলাদেশে একিউআই নির্ধারণ করা হয় দূষণের ৫টি বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে, সেগুলো হলো: বস্তুকণা (পিএম১০ ও পিএম২.৫), এনও২, সিও, এসও২ ও ওজোন (ও৩)। সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউএয়ার’ প্রকাশিত বৈশ্বিক বায়ুর মানসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বিশ্বে ২০২২ সালে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর তালিকায় বাংলাদেশের নাম পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে।

এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে পিএম–২.৫-এর মাত্রা ছিল ৬৫ দশমিক ৮ মাইক্রোগ্রাম। ১৭ মার্চ,২০২৩ সকাল ৯টায় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই)-এর সবশেষ আপডেটে দেখা যায়, ঢাকার স্কোর ১৫৭, যা অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রয়েছে।

ধারাবাহিকভাবে বৃক্ষনিধণ, ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া ও নির্মাণ সাইটের ধুলা এবং নিয়ম না মেনে প্রতিনিয়ত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা এখানকার বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ। কয়েক বছর ধরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে নগরবাসী মাত্র ২০ দিনের মতো স্বাভাবিক বায়ুগ্রহণ করে বলেও জানা গেছে গবেষণায়।

আমাদের পৃথিবী বিপণ্ন। একইসাথে আমাদের দেশ আর শহরও বিপণ্ন। এই পৃথিবীতে বাস করার অন্যতম শর্ত স্বাস্থ্যকর একটি পরিবেশ।

শেয়ার করুন