ডেস্ক রিপোর্ট

১০ এপ্রিল ২০২১, ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ

করোনা: শত্রুর সাথে বসবাসের ১৩ মাস

আপডেট টাইম : এপ্রিল ১০, ২০২১ ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক::

করোনা সংক্রমণের ১৩ মাস পার করেছি আমরা। গত বছরের এপ্রিল-মে’র কথা স্মরণ করুন, রোগী টেস্ট করাতে পারছেনা, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ঘুরে ভর্তি হতে পারছে না, এম্বুল্যান্সেই মারা যাচ্ছে। এই সময়ে এসে একই চিত্র! মানুষ চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছে কিন্তু চিকিৎসা পাচ্ছে না, অক্সিজেন পাচ্ছে না, আইসিইউ নেই। হাসপাতালের বারান্দায় অথবা এ্যাম্বুলেন্সেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

গত ১৩ মাস ধরে এই ‘বায়োলজিক্যাল ওয়ারে’ এটিই আমাদের অর্জন। আমরা খাঁদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছি। চারপাশে নিকষ কালো অন্ধকার, সামনে-পিছনে হাতড়িয়ে অবলম্বন হিসাবে কিছুই ধরতে পারছি না, নিমজ্জিত হচ্ছি খাঁদে। কে টেনে তুলবে আমাদের? সেখানেও আশার আলো নেই।

দেশে সংক্রমণ শুরুর পর থেকে আজকে পর্যন্ত যদি বিশ্লেষণ করি, অনায়াসেই বলা যায় আজকের অবস্থার সম্মুখীন হবার কথা ছিলো না। চাইলেই এই যুদ্ধে বিজয় অর্জন আমরা করতেই পারতাম। সেনাপতির ভুল রণকৌশল, ভুল অস্ত্রের ব্যবহার, শত্রুকে অধিকতর দূর্বল মনে করা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, আত্মতুষ্টি, তথ্য গোপন করা, যুদ্ধের সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতি এই সবকিছু মিলিয়ে আজকের এই পরিণতি। আমাদের প্রধানতম সমস্যা পূর্বের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করা। অবশ্য ‘ভুল’ কে সঠিক মনে করলে তো আর শিক্ষা গ্রহণের কিছু থাকে না!

বর্তমানে যুক্তরাজ্য, দ: আফ্রিকা ও ব্রাজিল এই তিনটি দেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের তিনটি ভ্যারিয়েন্ট সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে ২ টি ভ্যারিয়েন্ট (যুক্তরাজ্য ও দ: আফ্রিকা) ইতিমধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। আইসিসিডিআরবি, আইইডিসিআর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ গবেষণায় ১২-১৭ মার্চ ৯৯ জন আক্রান্ত রোগীর নমুনার মধ্যে ৬৫% দ: আফ্রিকা ও ১২% ইউকে ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়। ১৮-২৪ মার্চ ৫৭ জন আক্রান্ত রোগীর নমুনা বিশ্লেষণে ৮১% দ: আফ্রিকা, ১৫% ইউকে ও ৪% অন্য ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয় (আইসিডিডিআরবি)। অর্থাৎ দ: আফ্রিকা ভ্যরিয়েন্ট স্পষ্টতই সংক্রমণে আধিপত্য বিস্তার করেছে। সাথে ইউকে ভ্যারিয়েন্ট!

দ: আফ্রিকা ভ্যারিয়েন্টের দুই ধরনের মিউটেশন ঘটেছে এখন পর্যন্ত। এই ভ্যারিয়েন্টটি অত্যন্ত সংক্রমণশীল। বয়স্ক যারা এবং পূর্ব থেকে অসুস্থ তাদের জন্য মৃত্যু ঝুঁকি অনেকগুণ বেশি বাড়িয়ে দেয়। তরুণদেরও আক্রান্ত করে। এটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বিভ্রান্ত করে ফেলে, যেখানে বাধা প্রাপ্ত হয় সেখানেই রুপ পরিবর্তন করে। অর্থাৎ যাদের পূর্বে আক্রান্ত হয়ে প্রাকৃতিকভাবে ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে বা বর্তমানে অক্সফোর্ড আ্যাষ্ট্রেজেনেকার টিকা পুরো ডোজ গ্রহণ করেছেন তারাও আক্রান্ত হতে পারেন। Oxford University তাদের জার্নালে উল্লেখ করেছে,‘The south African variant carries a mutation, called N501Y, that appears to make it more contagious or easy to spread. Another mutation called E484K, could help the virus dodge a person’s immune system and may affect how well coronavirus vaccines work.’ বোঝায় যাচ্ছে এটা কতোটা অশনিসংকেত আমদের জন্য।

করোনা নিয়ন্ত্রণে ন্যাশনাল অ্যাডভাইজারি কমিটি, জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি সহ ৪৩ টি কমিটি করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক কমিটি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। যে সমস্ত কমিটিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ রয়েছে তাদের কোন প্রস্তাবনায় সরকার গ্রহণ করে না। জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি গঠনের পর থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করোনা নিয়ন্ত্রণে করণীয় বিষয়ে ২৬ টি প্রস্তাবনার মধ্যে সরকার ২৩ টি প্রস্তাবনায় ইগনোর করেছে। সর্বশেষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটির ১৮ দফা প্রস্তাবনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় খারিজ করে দেয় । জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ইগনোর করে যখন আমলানির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তখন এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি হওয়াটাই স্বাভাবিক, যেমন ব্রাজিল, ভারত এর পরিস্থিতি! প্রশ্ন হচ্ছে, এই দায় বহন করবে কে??

আশঙ্কা করা যায়, আগামী সপ্তাহ আর তার পরের সপ্তাহে সংক্রমণ বর্তমানের তুলনায় আরো বেশি দেখা যাবে, সাথে মৃত্যু। মেডিক্যালের ভর্তি, লকডাউন শুনে মানুষের ঢাকা ছেড়ে যাওয়া, গণপরিবহন খুলে দেওয়া, দোকান খোলার দাবিতে বিক্ষোভ এর সবকিছুরই অনিবার্য প্রতিক্রিয়া আছে। মার্কেট খুলে দেওয়া হলো এর প্রভাব টের পাওয়া যাবে মাসের শেষ সপ্তাহে। মোটামুটি সংক্রমণ ছড়িয়ে নেওয়ার এক মাসের প্যাকেজ রেডি। এবার সরকার ও জনগণ একই সাথে ‘বগল বাজাতে’ই পারেন!

টেনশনের কোন কারণ নেই! হাসপাতালে বেড পাবো না, অক্সিজেন থাকবে না, আইসিইউ হবে না! এতো ‘না’র মধ্যে একটি জিনিস হবে সেটি মৃত্যু। অন্যদিকে যারা বাসা থেকে বের হতে পারছিলেন না, তারা মনের আনন্দে শপিং মলে যাবেন, যারা ১ লা বৈশাখ আর ঈদের কাপড় বিক্রি করতে পারছিলেন না বলে না খেয়ে মারা যাচ্ছিলেন, তারা পেট পুরে খাবেন, আর আপনাদের কাছে তো ‘না খেয়ে মরার চেয়ে করোনায় মরা ভালো’। সুতরাং করোনায় মৃত্যু হলেও তো আপনার বা আপনার পরিবারের কারো মন খারাপ হবে না। কারণ না খেয়ে তো আর মারা যাবেন না!!

খারাপ লাগাটা আমাদের মতো মানুষদের যারা স্বাস্থ্যবিধি মেনেও আপনাদের কারণে সংক্রমিত হবো, সংক্রমিত হয়েও চিকিৎসা পাবো না, আর আইসিইউ এর তো প্রশ্নই ওঠে না, এমনিতেই নেই, আর ওখানে সেবা নেবার মতো একদিনের টাকাও আমাদের নেই!! এই তো জীবন!!

সরকার যেমন নির্লিপ্ত হয়ে আছে তেমনি থাকবে। জনস্বাস্থ্যবিদদের পাশ কাটিয়ে আমলাদের কথায় প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। কিন্তু এটাও ঠিক নিজেরা যতোই সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে অবস্থান গ্রহণ করুন না কেনো এটা এমন এক চক্র যদি এক পক্ষ ভিষণভাবে মানে আর অন্য পক্ষ না মানে তবে সুরক্ষা বলয় তৈরি হবে না। সুতরাং বুমেরাং টা কিন্তু ঘুরে মাননীয়গণ আপনাদের দিকে ফিরে আসার যথেষ্ঠ সম্ভাবনা আছে।
আপনারা গত দুই সপ্তাহ ধরে ১৮ দফা, ১১ দফা আর লকডাউনের নামে অতি নিম্নমানের যে নাটক মঞ্চস্থ করলেন, এটা না করলেও পারতেন! পূর্ব থেকেই বুঝেশুনে পরিকল্পনা মাফিক এমনভাবে ঘোষণা দিলেন যাতে জনগণ এটা না মানে। যার প্রেক্ষিতে আপনারাও বলতে পারেন, ‘আমরা দিয়েছিলাম তোমরা মানো নাই’। অর্থাৎ যেকোন পরিস্থিতিতে যাতে দায় টা জনগণের কাধে যেয়ে বর্তায়। তবে আপনাদের নাটকের মঞ্চায়ন ছিলো অতি দূর্বল প্রকৃতির।

সিনেমা হল, বই মেলা, ষ্টেডিয়ামে খেলা চালু রেখে, বেসরকারি অফিস খোলায় নমনীয় থেকে লকডাউন এর ঘোষণা দিলেন। যাতে যে সেক্টরগুলো বন্ধ ঘোষণা করলেন সেই সেক্টরগুলো এগুলোকে এড্রেস করে লকডাউন বিরোধী কথা বা মুভমেন্ট করার সুযোগ পায়, যেমনটি আপনারা চাইছিলেন! অফিস খোলা ইস্যু মিটিগেশন করতে যেয়ে ‘জনস্বার্থ’ বিবেচনায় বন্ধ গণপরিবহণ চালু করে দিলেন। এবার বই মেলা খোলা, গণপরিবহণ খোলা এটাকে এড্রেস করে সারাদেশে মার্কেট ও দোকান মালিক সমিতি (যার নেতৃত্বে সরকার দলীয় লোকজন) রাস্তায় লাঠি-সোটা নিয়ে নেমে এসে দাবি তুল্লো, ‘মার্কেট-দোকান খুলে দিতে হবে’। এটাই তাদের একমাত্র দাবি!!

অথচ বৃহত্তর জনস্বার্থ বিবেচনায় তাদের প্রথম ও প্রধান দাবি হওয়া উচিত ছিলো, বর্তমান সংক্রমণের এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে জারিকৃত লকডাউনের জন্য তাদের সবকিছু বন্ধ রাখতে হচ্ছে, সেই বিবেচনায় যাতে সরকার তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করে। আমরা বিষয়টি নিয়ে লিখছি, কিছু বামপন্থী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এই দাবি উত্থাপন করা হলেও যারা লাঠি নিয়ে মাঠে নামলো তারা ঘুনাক্ষরেও একবারের জন্যও এই দাবি উত্থাপন করেনি। পূর্ব নির্ধারিত ইস্যু (গণপরিবহণ, বই মেলা খোলা) সামনে নিয়ে সরকারের প্রিপ্লান্ড ওয়েতে তার অনুগত মালিক সমিতির নেতৃত্বে লোকজন মাঠে নামিয়ে আবারো সেই ‘জনস্বার্থে’ তাদের দাবি মেনে নিয়ে মার্কেট দোকান খুলে দিলেন!! সেখানে এখন ব্যাপক স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে!

মনে করলেন, আমাদের মতো গন্ডমূর্খ নাগরিকেরা ভেবে নিলো সরকার চাইলো, কিন্তু জনগণ চাইলো না। ফলাফলে পরিস্থিতি যতোই খারাপ হোক না কেনো এর দায় জনগণের!! দ্বান্দ্বিকতা বলে, বিপরিতমুখী জনস্বার্থ কখনও একই উদ্দেশ্যে এক সাথে রক্ষা করা যায় না। সেটা করতে চাইলে বিকল্প কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। সরকার একই সাথে একই উদ্দেশ্যে সকল ‘জনস্বার্থ’ রক্ষা করলো, কী চমৎকার তাই না!!

জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ বর্তমান পরিস্থিতিতে বলেন,‘এ বিধিনিষেধ যে কতোটা অপরিপক্ব তা প্রথম দিন থেকেই স্পষ্ট হয়েছে। দেশে যখন প্রথমবারের চেয়ে খারাপ অবস্থা তখন এ ধরনের আধাপাকা সিদ্ধান্ত আমরা আশা করি না। এটা এখন হাস্যকর হয়ে উঠছে। এটার সাথে কোন জনপ্রতিনিধি যুক্ত নেই। মন্ত্রী, মন্ত্রণালয় এমপিরা নেই। তারা তাদের পছন্দ মতো একটা বিধি নিষেধ দিয়েছেন। এখন জরুরি ভিত্তিতে ১৪ দিনের লকডাউন দিয়ে করোনার বিস্তার ঠেকাতে হবে’।

১২তম মাসের সংক্রমণের তুলনায় ১৩তম মাসে বেড়েছে ৭৪৪%, মৃত্যু বেড়েছে ২৮০%। সাত দিনে শনাক্ত ৪৯ হাজার, মৃত্যু ৪২৯ (রেকর্ড), আজকের সংক্রমণ ৭ হাজার ৪৬২, মৃত্যু ৬৩, সংক্রমণের হার ২৩.৫৭%(করোনা.গভ.ইনফো)। গত ৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত জাতীয় পরামর্শক কমিটির ৩০তম সভার প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহ সর্বাত্বক লকডাউন ব্যতীত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। অনেক তো হলো, এবার দেশের আর মানুষের প্রতি নজর দিন। ইতিহাস ক্ষমা করবেনা।

‘আয় কালবৈশেখী হাওয়া, উড়িয়ে নে শুকনো আবর্জনা, ধুলো, মৃত্যু অপমান। আন বুকে স্পর্ধা আনকণ্ঠে জীবনের গান বোবা অন্ধ আমার স্বদেশ।’

লেখক : সাবেক সভাপতি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যুব পরিষদ

শেয়ার করুন