ডেস্ক রিপোর্ট
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক:: আফগানিস্তানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্রিটিশ নাগরিকদের আটক করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। শনিবার দেশটির তালেবান কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানায় তারা।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির সাবেক সাংবাদিকসহ আরো দুই বিদেশী সাংবাদিককে মুক্তির এক দিন পর ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। তবে কতজন নাগরিককে আটক করা হয়েছে তার সংখ্যা জানানো হয়নি। এদিকে আফগানিস্তানে আটকের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। শনিবার জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা এবং আফগান নারী, বালিকা ও মানবাধিকার বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত রিনা আমিরি এক টুইট বার্তায় জানান, ২৯ জন নারীকে তাদের পরিবারসহ আটক করেছে বলে অভিযোগ করেছে।
গত দুই মাসে আফগানিস্তানে বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত আটজন পশ্চিমা নাগরিককে তালেবানরা গ্রেপ্তার করে রেখেছে। সিএনএন জানতে পেরেছে, দেশে বসবাসকারী পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তালেবানদের তৎপরতা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আটক করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়নি বলে মনে হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য – এর সূত্র মারফত খবর, সাতজন বৃটিশ নাগরিক সহ একজন আমেরিকান আইনী বাসিন্দা এবং একজন মার্কিন নাগরিককে আটক করে রাখা হয়েছে আফগানিস্তানে ।
আফগানিস্তানের প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট, আমরুল্লাহ সালেহ টুইট করেছেন যে “নয়জন” পশ্চিমীকে তালেবানরা “অপহরণ” করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক অ্যান্ড্রু নর্থ যিনি আগে বিবিসি – র জন্য কাজ করতেন এবং পিটার জুভেনাল যিনি BBC এবং CNN উভয় প্রতিষ্ঠানেই কাজ করেছেন এবং দুজনেই বৃটিশ নাগরিক। এই ৯ জনকে কেন তালেবানরা আটকে রেখেছে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
জুভেনালের আটকের বিষয়টি তার পরিবার এবং বন্ধুরা সিএনএনকে নিশ্চিত করেছে। ডিসেম্বরের শুরুতে আফগানিস্তানে কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করার পর পিটার জুভেনালের বন্ধুরা তার নিরাপত্তার জন্য গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বৃটিশ-জার্মান নাগরিক পিটার ফ্রিল্যান্স ক্যামেরাম্যান, ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারী হিসাবে চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আফগানিস্তানে ভ্রমণ করেছেন।
সেখানে তিনি একটি বিয়েও করেছেন এবং তাঁর তিনটি কন্যা সন্তানও আছে। তাকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক করা হয়েছে এবং তার পরিবার বা আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনো সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। পিটারের স্বাস্থ্যগত জটিলতা তার আটককে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁর বন্ধুরা।
পিটারের পরিবার এবং বন্ধুরা বিশ্বাস করে যে, তাকে ভুলবশত আটক করা হতে পারে, কারণ তিনি আফগানিস্তানে দীর্ঘদিন আছেন। আফগানিস্তানের খনি শিল্পে বিনিয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনার উদ্দেশে তাঁর আফগানিস্তান ভ্রমণ । গ্রেপ্তারের আগে, তিনি প্রকাশ্যেই কাজ করতেন এবং তালেবানের সিনিয়র কর্মকর্তাদের সাথে ঘন ঘন বৈঠক করতেন। পিটারের পরিবারের কাতর অনুরোধ ,আফগান কর্তৃপক্ষ যেন পিটারকে মুক্তি দেয়। আফগান কারাগারে কোভিড সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে, এদিকে পিটারের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে বলে তাঁর পরিবারের উদ্বেগ আরো কিছুটা বেশি।
নাটালিয়া আন্তেলাভাও সিএনএনকে নিশ্চিত করেছেন যে, তার স্বামীকে আটক করা হয়েছে। তাঁর স্বামী অ্যান্ড্রু নর্থ কাবুলে ছিলেন আফগানিস্তানের জনগণকে সাহায্য করার জন্য, ইউএনএইচসিআরের জন্য কাজ করছিলেন তিনি ,আন্তেলাভা শুক্রবার টুইট করে একথা জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে UNHCR একটি বিবৃতে জানিয়েছে , ”আমরা অন্যদের সাথে সমন্বয় করে পরিস্থিতি সমাধানের জন্য আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। পরিস্থিতির প্রকৃতি দেখে আমরা আর কোনো মন্তব্য করব না।”
তালেবানদের ক্ষমতা বৃদ্ধি
বর্তমানে বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনের সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ছয় মাস আগে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেন, যা তালেবানদের দেশ দখলের পথ প্রশস্ত করে। মার্কিন নাগরিকদের আটক আসলে আফগানিস্তানে বসবাসকারী পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তালেবানের পদক্ষেপের তীব্র বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করে । গত আগস্টে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবান আবার ক্ষমতায় আসার পর থেকে, তারা আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি চাইছে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র এমিলি হর্ন, এই ধরণের আটককে “অগ্রহণযোগ্য” বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তালেবানের সাথে যোগাযোগ করছে পশ্চিমাদের মুক্তির বিষয়টি নিয়ে । সিএনএন জানিয়েছে , এই সাতজনকে ডিসেম্বরে কাবুল থেকে পৃথক ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং গত দুই মাস ধরে তাদের আটক করে রাখা হয়েছে। তালেবান প্রকাশ্যে বলেনি যে, তারা কাউকে আটকে রেখেছে , যদিও তারা কাতারের একজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে কাবুলে আটক কয়েকজনের সাথে দেখা করার অনুমতি দিয়েছিল।
কাতারি কর্মকর্তা আটককৃত পুরুষদের সাথে সুস্পষ্ট দুর্ব্যবহারের কোন লক্ষণ দেখেননি বলে সিএনএনকে জানিয়েছেন। একজন সিনিয়র বৃটিশ কর্মকর্তাও এই মাসে কারাগারে থাকা কয়েকজন পুরুষের সাথে দেখা করেছেন, দুটি সূত্র সিএনএনকে এ বিষয়ে জানিয়েছে।
বন্দিদের সবাইকে সেখানে একসঙ্গে রাখা হচ্ছে না বলে জানা গেছে। যুক্তরাজ্য সরকার এবিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি । ২০০২ থেকে জুভেনাল কাবুলের গ্যান্ডাম্যাক লজ হোটেলের মালিক ছিলেন, ২০১৪ সালে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আফগান যুদ্ধের কভার করা সাংবাদিকদের মূল ঠেক ছিল তাঁর হোটেলটি ।জুভেনাল সিএনএন-এর জন্য ১৯৯৭ সালে ওসামা বিন লাদেনের সাথে প্রথম টেলিভিশন সাক্ষাৎকারটিও চিত্রায়িত করেছিলেন। সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময়, ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে জুভেনাল বিভিন্ন পশ্চিমা সংবাদ সংস্থার জন্য সংঘর্ষের চিত্রায়ন করতে৭০বারের বেশি আফগানিস্তানে ভ্রমণ করেছিলেন। ৯-১১ র আগে শেষবার যখন আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতায় ছিল জুভেনাল কাবুলে একটি বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করছিলেন। তিনি তালেবান নেতাদের সাথে বারবার দেখাও করেছেন।কাতারি কর্মকর্তারা যারা তালেবানের সাথে ঘন ঘন যোগাযোগ করছেন -তারা তালেবান কর্মকর্তাদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে সিএনএন তালেবানদের হাতে বন্দী, পশ্চিমী বন্দীদের সম্পর্কে প্রতিবেদন বন্ধ করে দিয়েছে কারণ আমেরিকান, বৃটিশ এবং কাতারি কর্মকর্তারা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তাদের মুক্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যা এখনো সফল হয়নি।
তালেবানদের সাথে আলোচনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ
মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং কূটনীতিকরা আগস্টে কাবুল ছাড়ার সাথে সাথে, আফগানিস্তান থেকে বিদেশী এবং আফগানদের সরিয়ে নেওয়ার সুবিধার্থে তালেবানদের সাথে কাজ করেছিল। প্রত্যাহারের পর থেকে, মার্কিন কর্মকর্তাদের এবং তালেবানদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হয়েছে, কিন্তু সম্পর্কের গতিপথ এখনও অস্পষ্ট। এই বছরের শুরু পর্যন্ত প্রায় ৮০ জন আমেরিকান যারা আফগানিস্তান ছেড়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু পারেননি কারণ ফ্লাইটগুলি নিয়মিত দেশ ছেড়ে যাচ্ছে না। তালেবান- এর হাক্কানি নেটওয়ার্ক মার্কিন ঠিকাদার মার্ক ফ্রেরিচসকেও ধরে রেখেছে, যিনি পূর্ব আফগানিস্তানে দুই বছর আগে অপহৃত হয়েছিলেন। কোনো বিদেশী দেশ তালেবানকে আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, এবং তাই তালেবানরা পশ্চিমা কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে প্রকৃত সরকারের স্বীকৃতি পেতে চায়। ক্রমবর্ধমান মানবিক সঙ্কটের মুখোমুখি আফগান জনগণকে সহায়তা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারিতে আফগানিস্তানে ৩০৮ মিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তা দিয়েছে। বাইডেন শুক্রবার একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন যাতে আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার জমাকৃত সম্পদ দেশে মানবিক সহায়তার জন্য অনুমোদন দেয় এবং ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার শিকারদের জন্য সেই অর্থ বিতরণ করার অনুমতি দেয়। তালেবান চায় এই সহায়তা অব্যাহত থাকুক কারণ লক্ষ লক্ষ আফগান এই শীতে অনাহারে পড়ার সম্ভাবনার মুখোমুখি। তবে পশ্চিমাদের মুক্ত করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বেশ জটিল কারণ তালেবানের মধ্যে বিভিন্ন দল রয়েছে। যেমন ; হাক্কানি নেটওয়ার্ক যা সামরিক দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী দল; “দোহা তালেবান” যেটি সবচেয়ে বাস্তববাদী দল; এবং “কান্দাহার তালেবান”, দক্ষিণ আফগানিস্তানের সেই অঞ্চলের নামে নামকরণ করা হয়েছে যেখানে ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে তালেবানের উৎপত্তি হয়েছিল। এই দলগুলো প্রায়ই নীতিগত বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে। তালেবানের ভারপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। তার কাজ অনেকটা ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং এফবিআই এর মতো। গত বছর জাতিসংঘ জানিয়েছে যে, হাক্কানি “বিস্তৃত আল-কায়েদার সদস্য। “হাক্কানি এফবিআই-এর মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাতেও রয়েছে, যার গ্রেপ্তারের জন্য মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ১০ মিলিয়ন ডলার অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করেছে ।
সূত্র : সিএনএন