ডেস্ক রিপোর্ট
২৭ নভেম্বর ২০২১, ৮:২৭ অপরাহ্ণ
সিলেট প্রতিনিধি:: ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন উচ্ছেদ, গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলন ও সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে সংগ্রাম বেগবান করার আহবান জানিয়েছেন বাসদ (মার্কসবাদী)’র কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী কমরেড ফখরুদ্দিন কবির আতিক। তিনি আজ শনিবার, ২৭ নভেম্বর বাসদ(মার্কসবাদী) সিলেট জেলার জনসভায় এই আহবান জানান।
১০৪ তম রুশ নভেম্বর বিপ্লববার্ষিকী ও পার্টির ৪১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা শাখার আহবায়ক কমরেড উজ্জ্বল রায়। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক কমরেড ফখরুদ্দিন কবির আতিক, বক্তব্য রাখেন জেলা কমিটির সদস্য এডভোকেট হুমায়ুন রশীদ সোয়েব, জনসভা পরিচালনা করেন জেলা কমিটির সদস্য মোখলেছুর রহমান। জনসভার পূর্বে রেজিষ্ট্রারী মাঠ থেকে বিভিন্ন দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড, লাল পতাকা সহ লাল পতাকা মিছিল শুরু হয়ে কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার হয়ে শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়।
জনসভায় নেতৃবৃন্দ বলেন, শত শত বছর ধরে মানুষ স্বপ্ন দেখেছে একটি শোষণহীন সমাজের। যে সমাজে মানুষে মানুষে কোন বিভেদ বৈষম্য থাকবেনা। সে সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছিল মার্কস-এঙ্গেলসের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব। তাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে বিপ্লবের মাধ্যমে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাশিয়াতে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে। জমি-কারখানা-ব্যবসা সহ উৎপাদনের উপকরণসমুহের উপর ব্যাক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। অল্প সংখ্যক মালিকের মুনাফার পরিবর্তে বেশিরভাগ মানুষের প্রয়ােজন মেটানাের লক্ষ্যে পরিকল্পিত অর্থনীতি গড়ে তােলা হয়েছিল। এর ফলে পশ্চাৎপদ রাশিয়া খুব কম সময়ের মধ্যেই কমরেড স্টালিনের নেতৃত্বে পরিণত হয়েছিল শিল্পোন্নত দেশে। সবার জন্য কর্মসংস্থান-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যাবস্থা করেছিল, বেকারত্ব-ভিক্ষাবৃত্তি-পতিতাবৃত্তি নির্মূল করা হয়েছিল। নারীমুক্তি ও জাতি সমস্যা সমাধানের দৃষ্টান্ত তৈরী হয়েছিল। কমরেড স্টালিন ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সােভিয়েত জনগন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিরাট আত্মত্যাগের বিনিময়ে নাৎসি জার্মানিকে পরাস্ত করে দুনিয়াকে রক্ষা করেছিল ফ্যাসিবাদী দাসত্বের বিপদ থেকে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন ও যুদ্ধ চক্রান্তের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপি শান্তি আন্দোলন ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন ও প্রেরণা যুগিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক শিবির, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর প্রমাণ আমরা দেখেছি। আদর্শগত সংগ্রামের ঘাটতি ও স্টালিনের মৃত্যুর পর থেকে ক্রুশ্চেভ নেতৃত্বের সংশােধনবাদী পথ অনুসরণের ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে সােভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয় ঘটেছে। তা সত্বেও মহান রুশ বিপ্লব চিরঞ্জীব প্রেরণার উৎস, কারণ মানুষের মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসে তা এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
নেতৃবৃন্দ বলেন, আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পক্ষ থেকে দেশে উন্নয়ন’- এর বিরাট প্রচার চলছে। পরিকল্পনামন্ত্রী বলছেন আমরা প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই দেখছি আমরা বড়লােক হচ্ছি! করােনা মহামারীতে বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে প্রায় ২৩ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে যাদের অনেকেই প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছেন। ৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়ে দিশেহারা। গত ৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির অজুহাত দিয়ে ডিজেল ও কেরােসিনের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি করেছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে জনগণকে জিম্মি করে পরিবহন মালিকরা সরকারের সাথে পাতানাে আলােচনা করে পরিবহনের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়িয়েছে, আদায় করছে ৪০ শতাংশের বেশি। সিলেট থেকে ঢাকা বাস ভাড়া একসাথে ৭০ টাকা বেড়েছে। লঞ্চ ভাড়াও ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এলপি গ্যাসের ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩১৩ টাকা করা হয়েছে। চাল, ডাল তেল, চিনি, লবন, মাছ, মাংস, সবজি সবকিছুর দাম মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। টিসিবি কে কার্যকর করা হচ্ছে না বরং টিসিবির পণ্যও বাড়তি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে সকল ধরনের পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে জনজীবনকে দূর্বিসহ করবে। করােনাকালে বেকার হওয়া, আয় কমে যাওয়ায় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী ৫ কোটি অসহায় মানুষসহ দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষের জীবনে দুর্যোগ নেমে আসবে। গত ১৩ থেকে ১৭অক্টোবর ৫ দিনব্যাপী কুমিলা, চাঁদপুর, নােয়াখালী, চট্টগ্রাম, ফেনী, রংপুরসহ দেশের অন্তত ১৬টি জেলায় সাম্প্রদায়িক হামলা সংগঠিত হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিন কুমিলা শহরের একটি পূজামন্ডপে হনুমান মুর্তির পায়ের কাছে কোরান পাওয়ার মাধ্যমে ঘটনার সূত্রপাত। ফলে কোরান অবমাননার কথা বলে সারাদেশে এ হামলা সংগঠিত হলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে ঘটনা ঘটিয়েছে ইকবাল হােসেন নামে এক যুবক। সাম্প্রদায়িক এ ঘটনা প্রথম নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ বছরে এই দেশে ৩৬৮৯ বার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হয়েছে। কেন দেশে এভাবে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বাড়ছে? ভিন্ন ধর্ম ও জাতির প্রতি ঘৃণা কারা কি উদ্দেশ্য ছড়াচ্ছে? কেন ধর্মীয় অনুভূতি দিনদিন উগ্র হয়ে উঠছে? বাংলায় হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বাস করেও হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, অসহিষ্ণুতা ও অবিশ্বাস কিভাবে এই চেহারা নিল? এর ফলে কারা লাভবান হচ্ছে? এ প্রশ্নের মিমাংসা জরুরি। স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫০ বছর ধরে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, সেই আওয়ামীলীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি এদের সহযােগী হিসেবে জামাতে ইসলামি এরা সবাই দেশের আজকের পরিস্থিতির জন্য দায়ী। দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাকে বােঝা যাবে না । ১৯৫২-১৯৭০ ধারাবাহিক গণআন্দোলন ও ১৯৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে শােষণমুক্ত সাম্যের সমাজ, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের যে আকাঙ্খ সৃষ্টি হয়েছিল তা ধুলিস্যাত হয়েছে শাসকের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য। মুখে ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বললেও ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠান সমূহকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপােষকতা করা হয়েছে। বিপরীতে বাম-গণতান্ত্রিক শক্তি সমূহকে নির্মূল করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
জনসভায় নেতৃবৃন্দ বলেন, করােনাকালে প্রায় দুই বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন বিপন্ন হয়েছে, মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, এর বিরূপ প্রভাব যত দিন যাবে তত প্রকট হয়ে উঠবে। শুধু তাই নয় মহামারীকে পুঁজি করে শিক্ষাক্ষেত্র নিয়ে ব্যাবসা হয়েছে, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষত্মিস্থ অসংখ্য পরিবারের পাশে সরকার না দাঁড়ানাের কারণে সেসকল পরিবারের শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়েছে, বেতন-ফি মওকুফ না করার কারণে অনেকের ঝরে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের বিশেষ বৃত্তি প্রদান করা প্রয়ােজন। কোন আলােচনা ছাড়া জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২০ করা হয়েছে, যেখানে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে, অথচ ছাত্রসমাজ ও অভিভাবকরা দাবি করছে পিইসি-জেএসসি পরীক্ষা বাতিলের। এছাড়া নিরাপদ সড়ক ও গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ পাসের ন্যুনতম দাবিকেও বারেবারে নানা কৌশলে বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমরা অবিলম্বে গণপরিবহনে সকল শিক্ষার্থীদের হাফ পাস এবং নিরাপদ সড়কনিশ্চিত করা দাবি জানাই। আমরা দীর্ঘ দিন ধরে দাবি করছি সিলেট-ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে ডাবল লাইন চালু করার, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ কার্ডিয়াক সেন্টার আজও চালু হয়নি। নগরীতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন কাজের জন্য যানজট এখন নিত্যদিনের ঘটনা বিশুদ্ধ পানি সংকট তীব্র, হােল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানাে হয়েছে কোন নাগরিক মতবিনিময় ছাড়াই। বিকল্প আয়ােজন ছাড়া হকারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। ব্যাটারী চালিত রিক্সা উচ্ছেদ করা হয়েছে, নগরীর প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের উপর। দেশে পাটকল বন্ধ করা হয়েছে, চিনিকল বন্ধ করা হয়েছে, চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার ন্যায়সঙ্গত দাবি মানা হচ্ছে না, নারী নির্যাতন-ধর্ষণ-নারী ও শিশু পাচার বেপরােয়া ভাবে বাড়ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন লড়াই ছাড়া সম্ভব নয়। জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে ফলে জনগণের প্রতি তাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। ফলে এই ফ্যাসিবাদী স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের বিরূদ্ধে এবং তার পেছনে থাকা পুঁজিবাদি রাষ্ট্রকাঠামাের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে হবে। আমাদের দল বাসদ (মার্কসবাদী) গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা ও দেশের কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র সমাজ-পেশাজীবিসহ জনজীবনের সংকট নিরসনে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তােলার চেষ্টা করছি। আমরা মনে করি, ধারাবাহিক আন্দোলনের পথে একদিকে জনগণের ন্যায্য দাবি আদায় করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে জনগণের রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠবে।