ডেস্ক রিপোর্ট
১৮ এপ্রিল ২০২১, ১০:০৫ অপরাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক:: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে বেতনভাতাসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনরত নিরীহ শ্রমিকদের উপর পুলিশের বর্বরোচিত গুলিবর্ষণের ঘটনায় অন্তত ৫ জন শ্রমিককে হত্যা এবং আরও অন্তত শতাধিক শ্রমিক আহত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ ১৮ এপ্রিল রবিবার সকাল ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশ করে।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম-সম্পাদক প্রকাশ দত্তের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখের জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল(অবঃ) জাহাঙ্গীর হোসাইন, বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি আখতারুজ্জামান খান, বাংলাদেশ সিএনজি অটো রিক্সা চালক সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক শেখ হানিফ, ঢাকা পোশাক প্রস্তুতকারক শ্রমিক সংঘের সভাপতি মাহবুবুল আলম মানিক প্রমূখ।
এছাড়াও সভায় সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন।
সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, এস আলম গ্রুপের মালিকাধীন বাঁশখালীর কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থানীয় শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বেতনভাতা প্রদান, ৫ তারিখের মধ্যে বেতন পরিশোধ, কর্মঘন্টা ১০ থেকে কমিয়ে ৮ ঘন্টা নির্ধারণ, রমজান মাসে ইফতার ও নামাজের জন্য সময় নির্ধারণ, বাথরূমের জন্য পানির ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। এমন কি শ্রমিকরা শুক্রবারেও শান্তিপূর্ণ কর্মবিরতি পালন করেছেন। শনিবার সকালে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা করার কথা বলা হলেও মালিকপক্ষ পুলিশ ডেকে জোরপূর্বক শ্রমিকদের কাজে যোগদানের চাপ দিতে থাকে। শ্রমিকরা কাজে যোগদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে দাবি আদায়ে অনড় থাকলে পুলিশ বিনাউস্কানিতে নিরীহ শ্রমিকদের উপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে। গণমাধ্যমে ৫ জন শ্রমিক নিহত হওয়ার সংবাদ আসলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিকদের অভিযোগ পুলিশ ও মালিকপক্ষ অনেক শ্রমিকের লাশগুম করে ফেলেছে। শ্রমিক আন্দোলন দমনে এবং মালিকপক্ষের স্বার্থরক্ষায় সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবের উলঙ্গ বহিঃপ্রকাশ এই মর্মান্তিক ঘটনার মাধ্যমে আরও একবার দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হলো।
নেতৃবৃন্দ এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন করোনা অতিমারির সময়ে যখন শ্রমিকদের বেতনভাতার সমস্যা সমাধানে সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের এগিয়ে আসার কথা সেই সময় পুলিশ অতীতের ন্যায় মালিকপক্ষের স্বার্থরক্ষায় গুলি করে শ্রমিক হত্যা করেছে। যেমনটা ২০১৬ সালেও পুলিশ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণে মালিকপক্ষের পাশে দাড়িয়ে ৪ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করেছিল। এছাড়া ২০১৭ সালে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে একজনকে হত্যা করা হয়েছিল। অথচ একটি হত্যাকান্ডেরও বিচার হয়নি। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের তাৎক্ষণিক মন্তব্য ‘ঘটনার সাথে স্থানীয়দের ইন্ধন আছে’ এবং ডিআইজি’র মন্তব্য ‘পুলিশ সবোর্চ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। নিরুপায় হয়ে গুলি করেছে।’ থেকেই বুঝা যায় সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির ফলাফল কি হবে! নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে মালিকদের স্বার্থরক্ষাকারী এই সমাজ ব্যবস্থায় কোন শ্রমিক হত্যাকান্ডের বিচার আশা করা যায় না। সমাবেশে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন করোনা অতিমারির সময়ে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল বন্ধ করে শ্রমিকদের পথে বসিয়েছে; চিনিকল বন্ধের পাঁয়তারা চালাচ্ছে। আর এখন বেতনভাতা চাওয়ায় শ্রমিকদের বুকে গুলি চালিয়েছে। শুধু তাই নয় সরকার শ্রমিকদের বেতনভাতা নিশ্চিত করতে না পারলেও মালিকদের স্বার্থরক্ষায় কর্মঘন্টা সংক্রান্ত শ্রমআইনের ১০০, ১০২, ১০৫ নং ধারা ৬ মাসের জন্য স্থগিত করেছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন , এমনিতেই অধিকাংশ মালিকরা শ্রমিকদের ৮ ঘন্টার অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করলেও ওভারটাইমে দ্বিগুণ মজুরি পরিশোধ করে না। তার উপর সরকারের শ্রমআইনের ১০০, ১০২, ১০৫ নং ধারার উপর স্থগিতাদেশের কারণে মালিকদের বেপরোয়া লুন্ঠন ও শ্রমশোষণের সুযোগ করে দিয়েছে। নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে শ্রমআইনের উপর এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের আহবান জানিয়ে বলেন শ্রম অসন্তোষ দমনে প্রচলিত ট্রেড ইউনিয়ন তৎপরতাকে অস্বীকার করে সরকার মালিকদের স্বার্থরক্ষায় সন্ত্রাস ও পুলিশী নির্যাতনের মাধ্যমে যে দমন পীড়ন চালাচ্ছে তা দেশের অর্থনীতি ও শিল্পের জন্য ভালো ফলাফল বয়ে আনবে না। বাঁশখালীতে শ্রমিক হত্যার দায় সরকার ও মালিককে নিতে হবে। শ্রমিক হত্যাকারী স্বৈরাচারী এই সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলার আহবান জানান।
সমাবেশ থেকে বিতর্কিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স বাতিল, আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা ও ক্ষতিপুরণ প্রদান, মৃত শ্রমিকদের আজীবন আয়ের সমপরিমান ক্ষতিপুরণ পরিবারকে প্রদান, সকল ক্ষেত্রে অবাধ ট্রেড অধিকার নিশ্চিত করা এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে এই ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট সকলের দুষ্ঠান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।