ডেস্ক রিপোর্ট

১৬ এপ্রিল ২০২১, ২:৩৩ অপরাহ্ণ

“২০২০ রুদ্ধশ্বাস ৪ মাস” তৃতীয় ও শেষ পর্ব

আপডেট টাইম : এপ্রিল ১৬, ২০২১ ২:৩৩ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

ছায়েরা খুকু::

আছিম উদ্দীন যখন সামনে এগোতে থাকে তখন একজন পুলিশ সদস্য এসে বললেন যে রিক্সা চলবেনা কারণ লকডাউন চলছে। সেতো হতবাক আর ভাবে লকডাউন এটা আবার কি। জিজ্ঞেস করে বসলো পুলিশ সদস্যটিকে, “স্যার, লকডাউন কি?” পুলিশ উত্তরে বললেন, “ কোনো জরুরী পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষকে কোনো জায়গা থেকে বের হতে না দেওয়া।“ আছিমউদ্দীন জিজ্ঞেস করলেন আবার, “কিন্তু স্যার আমি কি করবো আমারতো ঘরে কোনো খাবার নেই। কাজ না করলে আমার স্ত্রী বাচ্চাগো পেটে কিছু পরবেনা। তাদের পেটে সকাল পর্যন্ত কোনো দানা পানি পরে নাই। রিক্সাটাও মহাজনের। দিনশেষে মহাজনকে রিক্সার ভাড়া মিটাইতে হইবো।“ পুলিশ সদস্য এটার কোনো সঠিক জবাব দিতে পারলেননা। শুধু দিলেন কিছু শুকনো খাবার। আছিমুদ্দীন তা হাতে নিয়ে মলিন মুখে বললেন, “স্যার, এরকম কতদিন চলবে? পুলিশ সদস্যের তার কোনো উত্তর জানা নেই তিনি শুধু বললেন, “বাসায় যাও , বাইরে বের হইয়োনা ।”

আছিমউদ্দীন বাসায় বন্দী হয়ে রইলো। কোনো কাজ কাম নেই সারাদিন বসে থাকা আর আইনুনের ঘ্যানঘ্যানানি শুনা ছাড়া কোন উপায় নেই । পান থেকে চুন খসলেই আইনুনের আপত্তিকর সব কথা। সন্তানদের মুখের দিকে সে তাকাতে পারেনা। না খেয়ে সন্তানগুলোর শরীর যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। তার উপর ছোট ছেলেটার ও কেমন জানি শরীরটা ভালো যাচ্ছেনা। জ্বর জ্বর ভাব। টাকার অভাবে ডাক্তারও দেখাতে পারেনা। এমন করে একরকম ঝগড়াঝাটি, মারামারি, ভথ্সনা তিরস্কারের মধ্য দিয়ে কোনোরকমে যাচ্ছে আইনুন ও আছিমউদ্দীন এর জীবন। মাস দেড়েক পর হঠাৎ একদিন আছিমউদ্দীনের বড় ছেলের শুরু হলো বমি, পাতলা পায়খানা। তিন তিন বার টয়লেট করার পর ছেলে পড়লো লুটিয়ে। আছিমউদ্দীনতো চোখে সরষে ফুল দেখছে কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা।

স্ত্রী আইনুন কেঁদে বলে উঠলো, “ কিলো সাবিবের বাপ ,কিছু করো আমার পোলাতো মরে গেলো বলে।“ আছিমউদ্দীন কি করবে হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলো। পকেটে নেই টাকা পয়সা, হাঁড়িতে নেই ভাত। কোথায় যাবে সে , কার কাছে যাবে। এতদিন যা চলেছিল এলাকার স্বেচ্ছাসেবীরা দিয়েছিল বলে। ওরাই বা আর কত দিবে। সাত পাঁচ আর না ভেবে স্ত্রীকে বললো, “চল আইনুন, সরকারী হাসপাতালে যায়। সাবিবকে ওঠা।“ সাবিবতো আধমরা হয়ে বিছানায় পরে আছে, নিজের অজান্তে টয়লেট করছে। সাবিবকে ডাকলো কিন্তু সাবিবের কোনো সাড়া নেই। আছিমউদ্দীন ডুকরিয়ে কেঁদে উঠলো আর বললো, “আইনুন, আমার সাবিব মনে হয় আর নাই , আমাগো ছাইড়া চলে গেছে , কাউরে ডাক।” কিন্তু কাকে ডাকবে তারা। কারো বাসায় কেউ তো যেতে পারছেনা। তবুও তাদের কান্নার আওয়াজ পেয়ে পাশের ঘরের রিক্সাচালক জব্বার বের হল। এসে দেখলো আছিম উদ্দীনের ছেলে মাটিতে মৃত প্রায় । জব্বার তাড়াতাড়ি ছেলেটাকে কোলে নিয়ে বললেন, “আছিম , চল হাসপাতালে।“ কিন্তু বিধির বিধাণ খন্ডাবে কে? ছেলে মাঝপথে জব্বারের কোলে ঢলে পড়লো। আছিম উদ্দীন যেন নির্বাক চেয়ে রইলো ছেলের চলে যাওয়া। তার আশায় পরলো যেন ছাই। ছেলেকে বড় করতে পারলোনা। মেডিকেলে যখন ছেলেকে নিয়ে গেল কর্তব্যরত ডাক্তার তার ছেলেকে মৃত ঘোষনা করলেন। আছিম উদ্দীনের কান্না যেন ফুরিয়ে গেল, চোখের পানি যেন হাওয়াই মিলিয়ে গেল। কি করবে ভেবে পায়না। আইনুনকে কি জবাব দিবে সে। নির্বাক হয়ে আকাশ পানে চেয়ে শুধু বললো, “হে খোদা, কি করলা? এইটা কি করলা? আমার সাবিবকে কেন নিয়ে গেলা।“ ছেলেকে নিয়ে এলো বাসায়। আইনুনের সে কাক ফাঁটা চিৎকার ,”আল্লাগো, আমার সাবিবরে ফিরিয়ে দাও। কেন আমার বুক খালি করলা?” শোকে দুঃখে আছিম উদ্দীনের দিনগুলো যেন যেতেই চায়না। বসে বসে নিজেকে গালি দেয়, কান্না করে, ধিক্কার দেয়। একরকম রুদ্ধশ্বাস জীবন যাপন তাদের চলতে লাগল। আইনুনটা কেমন জানি আরো ক্ষেপাটে হয়ে যাচ্ছে। এক রুমের ভিতর বন্দী আর কতইবা থাকা যায়। গ্রামেও তো কোনো ভিটে বাড়ি নেই ,কোথায় যাবে আর। ছেলেমেয়ে আর যে দুটো বেঁচে আছে তারা রোগা হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। ওদেরই বা দোষ কি? সব দোষ তো তার ,ভাবে আছিমউদ্দীন মনে মনে। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠে তার মন না জানি এই অবস্থা চলতে থাকলে হয়তো ছেলে মেয়ে আর দুটাকেও হারাতে হবে।

এভাবে হারানো, পাওয়া , হাসি, কান্নার মধ্য দিয়ে চলেছে রুদ্ধশ্বাস চার মাস। অকল্পনীয় মানসিক যন্ত্রণা। কারো হলো কাছে আসা আবার কেউ বা হারালো প্রাণপ্রিয় স্বজন। রোগটা যেন ধনী গরীব সমাজের প্রত্যেকটা মানুষকে দেখিয়ে দিল সময়টা কারো একার নয়। সারা বিশ্বকেই কব্জা করে নিয়েছে। করোনা যেন বলে যাচ্ছে , শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে কোনো অহংকার নয়। একজনকে একজন ভালোবাসতে শিখ, সম্মান দিতে শিখো। যে যে স্থানে আছো সে স্থানের মুল্য দিতে শিখো। ২০২০ রুদ্ধশ্বাস চার মাস আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। তা কাজে লাগিয়ে যেন আমরা এগোতে পারি। সামনের বিপদে আগের বিপদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারি যেন। সন ২০২১। এসেছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন , মাস্ক পরবেন। সবাই সবার খেয়াল রাখবেন।

শেয়ার করুন