ডেস্ক রিপোর্ট
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৫৭ জন মারা গেছেন। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ৪০৩ জন। তাঁদের অধিকাংশই বিদেশি পর্যটক বলে জানা গেছে। বুধবার দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় আকস্মিক এ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।
নেপালের পুলিশের পক্ষ থেকে স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত পাওয়া অনুযায়ী, বন্যা ও ভূমিধসকবলিত এলাকাগুলো থেকে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রসুয়ায় একজন, নুয়াকোটে ১১ জন, ধাদিংয়ে ১৮ জন, চিতওয়ানে ৩৩ জন, গোর্খায় ১৯ জন, তানাহুঁ সাতজন এবং নওয়ালপুরে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্যমতে, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ। ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২৬টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৬১ জন নেপালিও।
ট্যুর অপারেটরদের বরাত দিয়ে দেশটির পর্যটন বোর্ড আরও জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ভারত ও নেপালের সীমান্তবর্তী মানস সরোবরের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন।
রাজু ভাদেল (৫৬) নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘আজ (বুধবার) সকালে আমার ভগ্নিপতি আমাকে ফোন করেছিলেন। তাঁরা কাঁদছিলেন এবং বলছিলেন যে তাঁদের পুরো বাড়িটি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা গেলেও তাঁর ভাই এখনো নিখোঁজ।’
নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা গেছে, নদীর তীব্র পানির তোড়ে বাড়িঘর ভেসে যাচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির ছবিতে দেখা যায়, কাদামাটির নিচ থেকে একটি বাড়ির শুধু ওপরের অংশটি দেখা যাচ্ছে।
দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে তাদের প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, এই দুর্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় পুলিশের একজন মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে তাঁরা সতর্ক করেছেন। নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা উপদ্রুত এলাকায় হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলাকর্মী মোতায়েন করেছে।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, আকস্মিক এই বন্যায় তিব্বতের গিরংয়ে তিনজন মারা গেছেন। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২৬৫ জন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নেপাল সীমান্তের তিব্বত বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ‘ব্যাপক হতাহতের’ ঘটনা ঘটেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ উদ্ধার অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন।
কেন হঠাৎ এমন বন্যা
এবারে এ বন্যা ও ভূমিধসকে ২০১৫ সালের প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর নেপালে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে। ঠিক কী কারণে হঠাৎ এমন বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, বুধবার তিব্বত অঞ্চলে ভূমিকম্পের পরই এর সূত্রপাত।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল গতকাল দেশটির পার্লামেন্টে বলেন, ভূমিকম্পটি হয় স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে। এর ৩ মিনিটের মাথায় অর্থাৎ ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তিনি বলেন, ‘তবে এটা আমাদের যাচাই করে দেখতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে প্রায়ই প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রকোপ এবং ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে।
দ্রুত আরেকটি বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং। তিনি এএফপিকে বলেন, নেপাল-চীন সীমান্ত নদীর উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে রয়েছে। ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার ঘটনায় তাঁর হৃদয় ভারাক্রান্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে পুরো জাতি স্তম্ভিত ও গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি এই দুর্যোগকে ‘আকস্মিক’ ও ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেন।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, উদ্ধার অভিযান শুরু করতে সরকার কোনো ধরনের বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিক সব ধরনের সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে।