ডেস্ক রিপোর্ট

৯ আগস্ট ২০২৪, ৩:৪৫ অপরাহ্ণ

নিহত ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে শ্রমজীবীসহ প্রতিটি হত্যার বিচার দাবি

আপডেট টাইম : আগস্ট ৯, ২০২৪ ৩:৪৫ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সৃষ্ট সহিংসতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনি ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নিপীড়ন ও পাল্টা হামলায় সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুসারে সারাদেশে ছয় শতাধিক মানুষের জীবনহানি আর হাজার-হাজার মানুষের পঙ্গু, মারাত্মক আহত বা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে যাদের সংখ্যাগরিষ্ট অংশ শ্রমজীবী মানুষ। গণ অভ্য্যূত্থানের পূর্বে হত্যার প্রকৃত তথ্য গোপনের উদ্দেশ্যে সরকার সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন অসহোযোগিতা আর অভ্যূত্থান পরবর্তী সংকটে বহু মৃতদেহ ময়নাতদন্ত বা কোনো রেকর্ড সংরক্ষণ ছাড়াই সৎকার করা হয়েছে, হচ্ছে। ফলে, অনুসন্ধানের মাধ্যমে নিহত ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা না হলে ক্ষতিগ্রস্থ অসহায় শ্রমজীবী পরিবারগুলি বিচার ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত হবে।

এই প্রেক্ষিতে, পরিবহন শ্রমিক, রিক্সা চালক, হোটেল ও পর্যটন কর্মী, হকার, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কর্মী, নির্মাণ শ্রমিক, ক্যামিকেল শিল্পের শ্রমিক, দিনমজুরসহ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সকল শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জোট “জাতীয় শ্রমিক-কর্মচারী আন্দোলন” শ্রমজীবীসহ নিহত ও আহতদের তালিকা প্রকাশ, প্রতিটি হত্যার বিচার, নিহত-আহতদের ক্ষতিপূরণ, সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন, সকল শ্রমিকদের কারফিউ ও সাধারণ ছুটির সময়ের পূর্ণ মজুরি এবং চাকরির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার দাবিতে আজ ০৯ আগষ্ট ২০২৪, শুক্রবার, সকাল ১১ টায়, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে।

প্রবিণ শ্রমিক নেতা আব্দুল কাদের এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশ পরিচালনা করেন গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের সহ-সভাপতি খালেকুজ্জামান লিপন।

বক্তব্য রাখেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব বুলবুল, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টি.ইউ.সি) এর নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী রুহুল আমিন, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সহ-সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, রি-রোলিং ও স্টীল মিলস শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম খান বিপ্লব, টেক্সটাইল শ্রমিক নেতা জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশ ট্যুরিজম এন্ড হোটেলস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের যুগ্ম আহবায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ রিমেল, ক্যামিকেল শিল্পের নেতা হুমায়ুন কবির, হালকাযান ড্রাইভার ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক, রিক্সা-ভ্যান, ব্যাটারী রিক্সা ও ইজিবায়িক চালক সংগ্রাম পরিষদের ঢাকা নগরের আহবায়ক জালাল আহমেদ, পরিবহন শ্রমিক ফ্রন্টের মোহাম্মদ সেলিম প্রমুখ।

উপস্থিত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের প্রচার সম্পাদক জুলফিকার আলী, আইন সম্পাদক অ্যাড. বিমল চন্দ্র সাহা, নির্বাহী সদস্য আফজাল হোসেন, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি ইদ্রিস আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল আলম মিন্টু, এম.এ শাহীন, গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের দপ্তর সম্পাদক হাসনাত কবির, আনোয়ার খান, রুহুল আমিন সোহাগ, ট্যুরিজম এন্ড হোটেলস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের শরিফ আহমেদ, ইজিবাইক চালক সংগাম পরিষদের দাউদ আলী মামুন, নাঈম উদ্দিন, নির্মাণ শ্রমিক ফ্রন্টের বাবু হাসান প্রমুখ।

বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, গত ১৬ আগস্ট থেকে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে কত মানুষ হতাহত হয়েছে তার সঠিক হিসাব আজ পর্যন্ত আমরা জানিনা। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে নিহতের
সংখ্যা সাড়ে পাঁচ শত থেকে ছয় শত বা আরো বেশি এবং আহতের সংখ্যা দশ হাজারের বেশি। গণ অভ্যূত্থানের একদিন পূর্বেই সাড়ে তিনশোর বেশি মানুষ নিহত হলেও স্বৈরাচারী সরকার মাত্র ১৫০ জন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছিল। আর গণ-অভ্যূত্থানের মুখে বিদায়ী স্বৈরাচার সরকারের সহচর প্রশাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পরার কারণে হতাহতদের তথ্য সুনির্দিষ্ট ভাবে সংরক্ষণ করা না হওয়ায় অসংখ্য ক্ষতিগ্রস্থের তথ্য আড়াল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, সংবাদ মাধ্যম এবং আমাদের সংগঠকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে নিহত এবং আহতদের তালিকায় শিশু, কিশোর, শিক্ষার্থী ছাড়াও রয়েছে হোটেল ও পর্যটন কর্মী, গাড়ীচালক, রিক্সা চালক, হকার, গার্মেন্টস ও
টেক্সটাইল কর্মী, নির্মাণ ও ক্যমিকেল শ্রমিক, দোকান কর্মচারী, দিনমজুরসহ অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের নাম। নিহত এবং আহতদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ শ্রমজীবী মানুষ। কর্মস্থলে যাওয়া-আসার পথে বা কর্মরত অবস্থায় পুলিশ, আওয়ামী
সন্ত্রাসীদের গুলিতে কিংবা অভ্যূত্থান পরবর্তী সহিংসতায় জীবন হারিয়েছে বা আহত হয়েছে এই সকল শ্রমজীবী। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী এই শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু, আহত বা গ্রেফতার হয়ে পুলিশি নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েছে এদের পরিবারের হাজার হাজার সদস্য। পূর্বের সরকার, নিহত এবং আহতদের প্রকৃত সংখ্যা স্বীকার না করায় এবং বর্তমানে তথ্য সংরক্ষণ প্রক্রিয়া ভেঙ্গে পরায় নতুন সরকার অবিলম্বে অনুসন্ধানপূর্বক নিহত ও আহতদেও পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি ও প্রকাশ করায় উদ্যোগী নাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও এই সকল শ্রমজীবীদের অনেক পরিবার ন্যায়বিচার এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকার নির্দেশনা দিলেও এখনো গ্রেফতারকৃত শ্রমজীবীরা সকলে মুক্তি পায়নি, অবিলম্বে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি, প্রতিটি হতাহতের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে
দায়িদের চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান, নিহতদের পরিবারকে নামমাত্র অনুদান নয়, যথাযোগ্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। নেতৃবৃন্দ সাধারণ ছুটির সময়ের মজুরি না
কাটা, চাকরিচ্যূত না করা এবং বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের কর্মসংস্থান না থাকায় প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।

নেতৃবৃন্দ, আরো বলেন গণ অভ্যূত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া দুর্ণীতিবাজ সরকার তাদের স্বৈরাচারী শাসন কে বাধামুক্ত করতে পুলিশ, শিল্প পুলিশ, কল-কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর, শ্রম দপ্তরসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কে দুর্ণীতিগ্রস্থ এবং দুর্বলের ওপর নিপীড়ক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। পুলিশকে যেভাবে জনগণের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করানো হয়েছিল একইভাবে শিল্প পুলিশ, কল-কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর, শ্রম দপ্তর শিল্প মালিকদের ভাড়াটিয়া বাহিনির মতো শ্রমজীবী মানুষদের উপর নিপীড়কে রুপান্তরিক হয়েছিল।

সংখ্যাগরিষ্ট শ্রমিক শ্রম আইনের স্বীকৃত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার কে, অসাধু উপায়ে মালিকদের নিয়ণÍ্রীত ইউনিয়ন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে, নীতি নির্ধারণী
ক্ষেত্রে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি, বিভিন্ন কাঠামোয় শ্রমিক প্রতিসিধি মনোনয়নে মতামত প্রদানের সুযোগ ছিলনা। দেশের অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এই সকল অব্যবস্থাপনা আর অনাচার সমূলে উৎপাটন করতে হবে।

নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, ৭ কোটি ৩৫ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের সাথে তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা যুক্ত করলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ শ্রমজীবী। তাই শ্রজীবীদের প্রতিনিধি শ্রমিক নেতাদের পরামর্শ গ্রহণ ছাড়া অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা দুরহ। অথচ, গণ অভ্যূত্থান পরবর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের পরামর্শ শোনা হয়নি
বরং এই অভ্যূত্থানে যাদের কোনো অংশগ্রহণ ছিলনা, যারা দেশে ধর্মিয় বিভাজন টেনে নারীর ক্ষমতায়ন কে বাধাগ্রস্থ করে, সংখ্যালঘুদের কোনঠাসা করে তাদের প্রতিনিধি কে যুক্ত করা হয়েছে। তারপরেও, যেহেতু মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা
প্রতিটি ঘড়ে নতুন স্বাধীনতা পৌঁছে দেওয়া এবং বাক স্বাধীনতার প্রতিশ্রæতি ব্যক্ত করেছেন, তাই আমরা প্রত্যাশা করি, শ্রমজীবীদের জন্য মানবিক মর্যদা সম্পন্ন উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে এবং শ্রমিকদের কন্ঠস্বর শুনতে নীতি নির্ধারণী প্রতিটি পর্যায়ে শ্রমজীবী মানুষের গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।
কারণ একচ্ছত্র মালিকদের নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে স্বাধীনভাবে যৌথ দরকষাকষির মাধ্যমে ভাড়সাম্যপূর্ণ শিল্প সম্পর্ক চর্চার সংস্কৃতি গড়ে তোরা বৈষম্য মুক্ত সমাজ গড়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম শর্ত।

নেতৃবৃন্দ, আগস্ট মাসব্যাপী সারাদেশে ও শিল্পাঞ্চলে সামাবেশ, মিছিল, মানববন্ধনসহ প্রচারমূলক কর্মসূচী পালনের ঘোষণা দেন এবং বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্থ শ্রমজীবীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর
জন্য নেতা-কর্মীদের প্রতি আহবান জানান।

শেয়ার করুন