ডেস্ক রিপোর্ট

২৫ জুলাই ২০২৪, ১১:২৩ অপরাহ্ণ

দমানো যাবে, নিভানো যাবে না

আপডেট টাইম : জুলাই ২৫, ২০২৪ ১১:২৩ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

বেদানন্দ ভট্টাচার্য : 

সরকারি চাকুরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র সমাজের আন্দোলন দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে। ২০১৮ সালে তা ব্যাপক আকার ধারণ করলে সরকার পুরো ব্যবস্থাকেই বাতিল করে এক প্রজ্ঞাপন জারি করেন। এর বিরুদ্ধে মামলা হলে বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। ২০২৪ সালে ছাত্ররা আবার আন্দোলনে নেমে পড়ে। আন্দোলনের চরিত্র ছিল মূলত: অরাজনৈতিক, সাধারণ ছাত্ররাই প্রধানত সেখানে অংশ গ্রহন করে। বলাবাহুল্য, আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল। এবার সরকার ধৈর্য হারালে বিপত্তি ঘটে। দায়িত্বশীল মহল থেকে ছাত্রদেরকে ঢালাও ভাবে “রাজাকার” অ্যাখ্যায়িত করার ইঙ্গিতবহ মন্তব্য আন্দোলনকারীদেরকে ব্যাপক অসন্তোসের দিকে ঠেলে দেয়। তারা তাদের ক্ষোভ, বেদনা ও হতাশার প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে ‘কিছুটা অনিয়ন্ত্রিত ভাষা প্রয়োগ করে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সরকারি ছাত্র সংগঠন সাধারণ ছাত্রদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক প্রতিরোধে অবর্তীর্ণ হয়। এতে সাধারণ ছাত্রদের ক্ষোভ চরমে উঠে এবং দুই পক্ষের সংঘর্ষ বাধে এবং রাষ্ট্রের নিগ্রহ বলের অপপ্রয়োগ বহু প্রাণহানির কারণ ঘটায়। পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে তৃতীয় পক্ষ ব্যাপক হানাহানি, সরকারি সম্পত্তি নির্বিচারে ধ্বংস সাধন, এমন কি জেল ভেঙ্গে আসামি বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটায়। শুক্রবার দিন ও তার পরের দিন হতে সংঘটিত পরিকল্পিত হিংসাত্মক ঘটনার সাথে কোটা বিরোধী আন্দোলনের কোন যোগাযোগ ছিল এমন কথা বলার কোন প্রমাণ সিদ্ধ উপায়ও নেই। সরকার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে সারাদেশকে গুজব প্রচার ও সৃষ্টির উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত করে। কারফিউ জারি ও অনা তলব করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

গত শতাব্দী ৫০ ও ৬০ এর দশকে এদেশে চর্চিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক কার্যাক্রম জনমনে সমতা ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের একটি অঙ্গিকার গড়ে তোলে, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে সেই অঙ্গিকারের অনুরণন বিদ্যমান, সমতা ভিত্তিক সমাজ গঠনের সাধু উদ্দেশ্যে সংবিধানে ইতিবাচক বৈষম্যের সুযোগ রাখা হয়। নারী, ক্ষুদ্র জাতিস্বত্বা, জাতিগত সংখ্যালঘু কিংবা অনুরূপ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্টি যাতে ক্রমান্বয়ে মূল স্রোতধারার গতি ও সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে অভ্যস্থ হয়। সেজন্যে চাকুরিতে কোটা ব্যবস্থা কিংবা কোটার হার কোনটিই স্থায়ী বিষয় নয়, সমাজ প্রতাতির ধারার সাথে সংঙ্গতিপূর্ণভাবে এর পরিবর্তন যাতে করা যায় সেজন্যেই কোটা ব্যবস্থা সরকারের পরিপত্র নির্ভর একটি বিষয়। কোন সাংবিধানিক বিধান অলঙ্ঘ্যনীয় বা আইন নয়। আওয়ামীলীগের সরকার ক্ষমতার আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা নির্ধারণ করেছে।

‘৭২ এর সংবিধানের বিধান মতে, বাংলাদেশের উন্নয়নে গতিমুখ সমাজতন্ত্রের লক্ষাভিসারী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর জাতীয় নেতৃত্ব প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এ বিষয়ে খুব একটা মনোযোগী ছিলেন না বলে অনেকেই মনে করেন। ‘৭৫ পরবর্তী সকল সরকারেরই উন্নয়ন দর্শন ব্যক্তিখাতের বিকাশ কেন্দ্রিক, এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট ও অন্যান্য অনৈতিক উপায়ে ব্যক্তিখাতে অর্থ পুঞ্জিভূত হলেও তো উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ হয়নি, বরং বৈধ অবৈধ, নানা চ্যানেলে বিদেশে পাচার হয়েছে দেদার। ফলে ব্যক্তিখাতে কোন উল্লেখযোগ্য চাকুরী বাজার সৃষ্টি হয়নি। অন্যদিকে অগনিত শিক্ষিত বেকার যুবক চাকুরি বাজারে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে দেশে ৪ কোটিরও বেশি শিক্ষিত বেকার, এই অবস্থায় যে কোন সমাজের জন্য আগ্নোয়গিরির উপর বসে থাকার সামিল। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক দূর্বলতার ফলে শিক্ষিত যুব সমাজের মধ্যে দক্ষতা ও সুশিক্ষার ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় তুলনামূলক ভাবে মেধাবি যুব সমাজ সরকারি খাতে চাকুরি বাজারে নিজেদের জন্য একমাত্র আশা ভরসা হিসেবে দেখতে পায়। কোটা ব্যবস্থা দ্বারা নিজেদের ভবিষৎ জীবনের সীমিত সম্ভাবনার জন্য ক্ষতিকর মনে করে।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। নির্বাচন, সংসদ, রাজনৈতিক দল কোন কিছুই আর সেভাবে কার্যকর নেই। মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ায় ও নির্বাচন ব্যবস্থার বর্তমান হাল হকিকতের কারণে সচেতন মহল হতাশ এবং কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত উর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, লুটপাট জনজীবনের সংকট প্রতিনিয়ত জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ সমাজের সামাজিক সংকট সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সংঘটিত করে একটি ইতিবাচক ধারা সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে নানা ইস্যুতে অরাজনৈতিক অসংঘটিত স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন গাড়ে উঠেছে। এরকম আন্দোলন বান্ধাবাজ, মতলববাজদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় সহজতর কোটা বিরোধী আন্দোলনে পুলিশ ও সরকার দলের অবিমূষ্যকারীতার ব্যাপক প্রানহানি জনগণকে ক্ষুব্দ করেছে। জনগণের আবেগ ক্ষোভ দুর্বৃত্তদের জন্য সুযোগ করে দিয়েছে এবং তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আন্দোলনকারীদের এজেন্ডা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তা ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। স্পর্শকাতর সরকারি স্থাপনা সমূহের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকালো কেন এই প্রশ্নের উওর তো সরকারকেই দিতে হবে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালগুলোর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন যে সকল শিক্ষকরা করেন তাঁদের আচরণ শিক্ষিক সুলভ নয়, সরকারি দলের আনুকূল্যে তারাও ক্ষমতাসীন হন এবং খোল্লামুখলা সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনকে অনুকুল্য দিয়ে থাকেন। সাধারণ ছাত্ররা সরকার সমর্থকদের দ্বারা অবিরাম নির্যাতিত অত্যাচারিত হন, গনরুম, র‍্যাগিং ইত্যাদি কোন গোপন সংবাদ নয়। এ সমস্ত আচার-অনাচারের প্রতিকার করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগ্রহ দেখান না। সরকার ও সরকারি দলের বিরুদ্ধে ছাত্র সাধারণের ক্ষোভের মাত্রা কিছুটা হলেও কম হতো বলে মনে করার সংঙ্গত কারণ আছে।

যা হোক লুটপাট, নিয়ন্ত্রণ, বৈষম্য নিরসনের কার্যকার ব্যবস্থা গ্রহণ, চাকুরি বাজার সম্প্রাসারণ বাগাড়ম্বর নিয়ন্ত্রণের সচেতন প্রচেষ্টাসহ সামগ্রিক উদ্যোগ ব্যতিরেকে দেশে সৃষ্ট অষন্তোষের আগুন দমানো যেতে পারে, নিভানো যাবে না।

শেয়ার করুন