ডেস্ক রিপোর্ট

২১ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

সংসদ কি শুধু ব্যবসায়ীদের না বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার হবে?

আপডেট টাইম : জানুয়ারি ২১, ২০২৪ ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

শেয়ার করুন

মঞ্জুরে খোদা টরিক::

দ্বাদশ সংসদের নির্বাচিত (?) তিনশো সদস্যের দুইশো জনই ব্যবসায়ী। শতকরা হিসেবে সংসদের ৬৭ শতাংশ তাঁরাই। এই ধারা অব্যাহত থাকলে শতভাগ পূর্ণ হতে খুব বেশী সময় লাগবে না। তারমানে ভবিষ্যতে সংসদে ব্যবসায়ী ছাড়া অন্য কোন পেশার অস্তিত্ব থাকবে না। রাজনীতি থেকে রাজনীতিবিদ বিলীন হয়ে যাবে। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ করবে ব্যবসায়ীরা।

মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে অগ্রনী ভূমিকা রেখেছিলেন কৃষক পরিবারের সন্তানেরা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এই সংগ্রামের মূল নায়ক, যুদ্ধ পরিচালনা, অস্থায়ী সরকার, সেক্টর কমান্ডার ও বিভিন্ন বাহিনীর ভূমিকা, মুক্তিযোদ্ধা ও আত্মদাকারীদের নাম-পরিচয় সামাজিক অবস্থানই সে কথা বলে দেয়। কয়জন ব্যবসায়ী ও উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তান সেদিন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন? কিন্তু আজ তাঁরাই অবহেলিত তার আত্মত্যাগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা।

২০০৪ সালে সংবিধান সংশোধন করে নারী আসন ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত নারী সদস্যদের সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। সংসদ লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে যদি নারীদের ৫০টি আসন সংরক্ষিত থাকতে পারে তাহলে- অন্যান্য পেশার কেন কোন প্রতিনিধিত্ব সেখানে থাকবে না? অন্যান্য পেশার জন্য সংরক্ষিত আসনের কথা বলছি না, বলছি দলগুলোর মধ্যে এই বাধ্যবাধকাতা তৈরী করা দরকার যাতে তারা নির্বাচনে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মনোনয়ন নিশ্চিত করেন।

রাজনৈতিক দলগুলো শুধু ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করে না, তাঁরা বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। দলগুলোর সদস্য-সমর্থক ও কর্মীবাহিনীর উৎসও নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। যে কারণ রাজনৈতিক দলগুলোতে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার সংগঠনও আছে। এই পেশাজীবীরা রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তির অন্যতম উৎস। কিন্তু সংসদে তাদের কোন প্রতিনিধিত্ব ও অবস্থান নেই। সেটাই যদি না হবে তাহলে দলগুলোর কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-যুব, নারী, পরিবহন প্রভৃতি সংগঠনের দরকার কি?

এই সংগঠনগুলোরও এ বিষয়ে কোন বক্তব্য শুনি না্। তাঁদের এ নিয়ে কোন দাবী উত্থাপন করতে দেখি না। কখনো বলতে শুনিনি যে, নির্বাচনে তাদেরও ১০-২০ জনকে মনোনয়ন দিতে হবে। সংসদের তাদেরও প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। সেটা না করতে পারলে তাদের কাজ কি? শুধু কি উপরের হুকুম পালন করা? দলের মিছিল, সভা-সমাবেশে কর্মী সাপ্লাই দেয়া ও প্রতিপক্ষের সাথে লাঠালাঠি করা? ক্ষমতা দখল ও রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃদ হওয়া?

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেক কৃষিতে নিয়োজিত। জিডিপিতে তাদের ভূমিক ১৫ শতাংশ। অথচ সংসদে কৃষকের কোন প্রতিনিধি নেই। শুধু কৃষক নয় শ্রমিকসহ অন্যান্য শ্রেণী-পেশারও কোন প্রতিনিধিত্ব সংসদে নেই। সেবা ও শিল্প খাতের যে অধিক জিডিপি’র কথা বলা হয় তা আসলে শ্রমিক ও কর্মজীবীদের অবদান।

ভারতের সর্বশেষ নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে তাদের লোক সভায় যে সব পেশা থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন তাদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ সমাজকর্ম ও রাজনীতি থেকে এসেছেন। ৩৮ শতাংশ কৃষিকাজের সাথে যুক্ত, ২৩ শতাংশ ব্যবসায়িক সম্প্রদায় থেকে এবং ৪ শতাংশ আইনপেশা থেকে এসেছে।

কানাডার প্রধান সংবাদ মাধ্যম সিটিভি’র এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কানাডায় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের কত শতাংশ কি কি পেশা থেকে এসেছেন। তাদের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ৩৩৮ টি আসনের মধ্যে ২৭ শতাংশ এসেছেন ব্যবস্যা, ২২ শতাংশ সরকার ও রাজনীতি থেকে, ১১ শতাংশ আইন পেশা থেকে এসেছেন। বাকিরা কৃষি, সমাজকর্ম, শিক্ষা, হেলথ কেয়ার, সাংবাদিকতা, পুলিশ-মেলিটারি, উদ্যক্তা-দোকানী, ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠন থেকে এসেছেন।
সংসদ যদি লিঙ্গ অসমতার কথা বলে নারীদের জন্য ২৫ বছর মেয়াদি ৫০টি আসন (এক সপ্তমাংশ) বরাদ্দ থাকতে পারে তাহলে আর্থিক বৈষম্য ও বঞ্চনার স্বীকার শ্রমিক-কৃষক, অন্যান্য পেশা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কেন কোন বিশেষ কোটা ও প্রতিনিধি থাকবে না? চাকরিতে যদি পিছিয়ে পড়া, সুবিধা বঞ্চিত, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটা থাকে তাহলে সংসদে কেন তাদের জন্য সে সুবিধা থাকবে না?

২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তনে অংশ নিয়ে লিখিত বক্তব্যের বাইরে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘গ্রামে প্রবাদ আছে, গরিবের বউ নাকি সবার ভাউজ (ভাবী)। রাজনীতিও হয়ে গেছে গরিবের বউয়ের মতো। যে কেউ যেকোনো সময় ঢুকে পড়তে পারে, বাধা নাই।’

তিনি বলেন, ‘সবাই…ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি ডাক্তারি পড়ি…ভিসি সাহেবও অবসরের পর রাজনীতি করবেন। যাঁরা সরকারি চাকরি করেন…জজ সাহেব যাঁরা আছেন ৬৭ বছর চাকরি করবেন। অবসরের পর বলবেন, আমিও রাজনীতিবিদ। আর্মির জেনারেল হওয়া, সেনাপ্রধান হওয়া, সরকারি সচিব, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, কেবিনেট সেক্রেটারি অবসর কইরা বলেন, আমি রাজনীতি করব। কোনো রাখঢাক নাই। যার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা তখনই রাজনীতিতে ঢুকে…।’

‘চাকরি করে যা করার করছে। এরপর বলছে রাজনীতি করব। আমার মনে হয় সব রাজনৈতিক দলকে এটা চিন্তা করা উচিত। হ্যাঁ বিশেষজ্ঞের দরকার আছে। অনেক সময় বলা হয় পেশাভিত্তিক পার্লামেন্ট। হ্যাঁ পেশাভিত্তিক করেন। এমবিবিএস পাস করে সরাসরি রাজনীতি করেন। কোনো অসুবিধা নেই। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে চাকরিতে না ঢুকে সরাসরি রাজনীতিতে ঢোকেন,’ যোগ করেন রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতি হামিদ বলেন, ‘ছোট থেকে বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা রাজনীতি করছে, তাদেরই রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া উচিত। এটা হয় না বলেই রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন হয় না আর।’ রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের মতে, যাঁরা বিশেষজ্ঞ, তাঁদের মতামত নেওয়া যেতে পারে বা বিশেষ উপদেষ্টা কমিটিতে রাখা যেতে পারে, কিন্তু সরাসরি রাজনীতিতে তাঁদের আশা উচিত না।”

জাতীয় সংসদের ব্যবসায়ীদের যেভাবে একচেটিয়া প্রাধান্য তৈরী হচ্ছে তাতে রাজনীতি অচিরেই পুরোপুরি তাদের হতেই চলে যাবে। সেটা হতে পারে না। সংসদে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার অবস্থান থাকা বাঞ্চনীয়। সেটা করতে হলে অবশ্যই এই বিষয়ে একটা নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা জরুরী। দেশে শুধু ব্যবসায়ীরা বাস করেন না, অন্যান্য পেশার নাগরিকরাও বসবাস করেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ও শ্রেণীপেশার স্বার্থে তারা কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না। সংসদে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংবিধান সংশোধন ও রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার প্রয়োজন।

লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

শেয়ার করুন