ডেস্ক রিপোর্ট
২২ অক্টোবর ২০২৩, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ
রাজেকুজ্জামান রতন:
অক্টোবর ২৮ তারিখের মহাসমাবেশ নিয়ে উৎকণ্ঠা আর নভেম্বর মাসে কী হবে তা নিয়ে আশঙ্কায় এখন দেশের জনগণ। রাজনীতিতে কথার লড়াই থাকবে, তবে বাংলাদেশে তা যে কোনো সীমা বা সৌজন্য বজায় রাখে না, জনগণ সেটা প্রতিদিন শুনছে। পায়ের নিচে মাটি থাকবে না, মাথায় ইউরেনিয়াম ঢেলে দেওয়া আর হুমকি-পাল্টা হুমকি, আলটিমেটাম-পাল্টা আলটিমেটাম নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়ছে। একপক্ষ বলছে, ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হবে না। অন্যপক্ষ বলছে, রাস্তায় নামতে দেওয়া হবে না। এসব কিছুই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।
সংঘাতের আশঙ্কা, নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে বিতর্ক তো ছিলই। এখন মনে হয়, উত্তেজনার চূড়ান্ত মাত্রা যুক্ত হয়েছে। ১৮ অক্টোবর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ করেছে শান্তি সমাবেশ আর আন্দোলনরত বিএনপি করেছে সমাবেশ। দুই জায়গা থেকে যেসব বক্তব্য এসেছে, তা শান্তিরও নয়, স্বস্তিরও নয়। আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে বলা হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে শেষ বার্তা হলো নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আর বিএনপির সমাবেশ থেকে বলা হয়েছে সিদ্ধান্ত নিন, পদত্যাগ করে সসম্মানে সেফ এক্সিট নেবেন নাকি জনগণ দ্বারা বিতাড়িত হবেন? দেখা যাচ্ছে, দুই সমাবেশ থেকে শুধু পরস্পরবিরোধী অবস্থানই নয় বরং যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে।
জনমনে আশঙ্কা, কী হবে তাহলে? নির্বাচন যদি হয় তাহলে তা সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য হবে কীভাবে? নির্বাচনে যদি ক্রিয়াশীল ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো অংশগ্রহণ না করে তাহলে তা কি গ্রহণযোগ্য হবে? এটা তো ঠিক, যদি নির্বাচন বর্জন সত্ত্বেও প্রশাসনের শক্তিতে নির্বাচন করা হয় তাহলে অরাজকতা ও সংঘাত তীব্র হয়ে উঠবে। আর যদি সরকার পদত্যাগের আন্দোলন তীব্র হয় তাহলেও সংঘাত অনিবার্য। অর্থাৎ রাজনীতিতে সহিংসতা আর সংকটের ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে ক্রমাগত।
সবাইকে বাদ দিয়ে নির্বাচন আর সবাইকে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন যাই হোক না কেন, নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি পাল্টাবে কি? পাল্টানোর অর্থ আবার এত সরল নয়। শুধু শাসনক্ষমতা পাল্টাবে কিনা তার চেয়েও বড় বিষয়, যে পদ্ধতিতে চলছে দেশটা সেই পদ্ধতি পাল্টাবে কিনা? দুর্নীতি এবং দুঃশাসনের যত অভিযোগ উঠেছে উভয়পক্ষ থেকে, সে বিষয়ে কি তাৎপর্যপূর্ণ কোনো পরিবর্তন হবে? এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর পাওয়া কঠিন। কিন্তু একটা ব্যাপারে সবাই একমত যে, নির্বাচন যদি সুষ্ঠু হয় তাহলে যে দলই নির্বাচিত হয়ে আসুন না কেন, একটা জবাবদিহির পরিবেশ থাকবে। নিয়মিত নির্বাচন হলে পাঁচ বছর পর তাকে তো আবার জনগণের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। যদিও টাকা, পেশিশক্তি, প্রচার মাধ্যম, সাম্প্রদায়িক শক্তিকে কাজে লাগানো, আঞ্চলিকতা নিয়ে আবেগের ব্যবহার করার কারণে নির্বাচনের গণতান্ত্রিক চরিত্রকে নষ্ট করা হয়। তারপরও জনগণের একটা সরল প্রত্যাশা থাকে, হার-জিত যাই হোক না কেন, নির্বাচনটা সুষ্ঠু হোক, মানুষ রাজনীতি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করুক, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটকেন্দ্রে যেতে পারুক এবং প্রত্যাশা পূরণ না হলে প্রতিবাদ করার পরিবেশ থাকুক। রাজনীতিতে এই চাওয়াটা খুবই সরল এবং সহজ। কিন্তু এই সরল চাওয়াটাও ভীষণ কঠিন হয়ে উঠেছে গত ৫২ বছরে।
নির্বাচনকালীন সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য। বিগত ১১টি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে বাংলাদেশে। প্রতিটি নির্বাচন নিয়ে কমবেশি বিতর্ক আছে। স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১১টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে চারটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬-এর ১২ জুন, ২০০১-এর ১ অক্টোবর এবং ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে মাঠ প্রশাসন আপাত নিরপেক্ষতা দেখিয়েছিল। আর দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যেমন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১৯৭৩-এর ৭ মার্চ, বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় পার্টির শাসনামলে ১৯৮৬-এর ৭ মে ও ১৯৮৮-এর ৩ মে এবং বিএনপি শাসনামলে ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি ও ২০১৮-এর ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মাঠ প্রশাসন নিরপেক্ষতা রক্ষা করেনি। প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারগুলোর পক্ষে কাজ করার অভিযোগ ও প্রমাণ আছে মাঠ প্রশাসনের বিরুদ্ধে। ফলে অতীত উদাহরণ থেকে বলা যায়, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি এবং এসব নির্বাচনে ক্ষমতাসীন কোনো দলীয় সরকার পরাজিত হয়নি। আর যে ৪টি নির্বাচন আপাত সুষ্ঠু হয়েছে বলে মনে করা হয়। যেগুলো হলো, ১৯৯১ সালের নির্বাচন, ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন, ২০০১ সালের নির্বাচন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচন। একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, এসব নির্বাচন কোনো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়নি। সে কারণেই এই দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে যে, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য দলীয় সরকার নয়, একটি গ্রহণযোগ্য তদারকি সরকার দরকার।
কিন্তু কি হবে সেই সরকারের রূপরেখা? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে এক সময় উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক অঙ্গন। রক্তক্ষয়ী সেই আন্দোলনে দাবি আদায় হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। কিন্তু সেই আন্দোলনে যে রাজনৈতিক দলের আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা ছিল তারাই এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবল বিরোধিতাকারী। হাইকোর্টের রায়ের উদাহরণ দিয়ে তারা নাকচ করে দিচ্ছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ধারণা। ফলে নির্বাচন হবে কী হবে না তার সঙ্গে নির্বাচনকালীন সরকার কী হবে আর সে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কীভাবে অর্জিত হবে, এটাই এখন বিতর্কের প্রধান ইস্যু।
রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে এ কথা বলেন সবাই। কিন্তু সংঘাত বাড়ানো নাকি আলোচনা করে সমাধানের পথ খোঁজা হবে এই প্রশ্নের উত্তর পেতে বিভক্ত হয়ে পড়েন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহল। চূড়ান্ত সংঘাতে একটা ফয়সালা করা বা এসপার ওসপার একটা কিছু হয়ে যাক অথবা আলাপ-আলোচনা করে কিছু ধরে কিছু ছেড়ে একটা আপাত সমাধান করা দরকার এই দুই ধরনের মতামত দিতে থাকেন তারা। তবে সংঘাত সহিংসতা এড়িয়ে আপাত সমাধানের জন্য সংলাপের বিকল্প নেই এ ব্যাপারে তারা একমত। কিন্তু জনসভাগুলোতে উত্তেজক বক্তৃতা করে সংলাপকে নাকচ করে দিচ্ছেন দুই দলের শীর্ষনেতারা।
নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এ যাবৎকাল প্রতিটি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের যতটুকু ক্ষমতা আছে সেটা প্রয়োগে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ সব সময় উঠেছে। তারপরও যখন নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয় তখন আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়। নির্বাচন নিয়ে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে সেখানে হস্তক্ষেপ করা এবং প্রয়োজনে নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল নির্বাচন কমিশনের। উনিশশ বাহাত্তর সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৭ম অধ্যায়ের ৯১(ক) ধারায় বলা হয়েছে যে, নির্বাচনে বলপ্রয়োগ, ভীতি-প্রদর্শন ও চাপ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন বিরাজমান অপকর্মের কারণে যুক্তিযুক্ত, ন্যায়সঙ্গত এবং আইনানুগভাবে নির্বাচন পরিচালনা নিশ্চিত করতে, নির্বাচন কমিশন যে কোনো ভোটকেন্দ্র বা (ক্ষেত্রমতে সম্পূর্ণ নির্বাচনী এলাকায়) নির্বাচনের যে কোনো পর্যায়ে ভোট গ্রহণসহ নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সংশোধনী এনে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার সংকোচন কেন করা হলো তা নিয়ে সন্দেহ এবং বিতর্ক এখন তুঙ্গে।
সাধারণভাবে এটা ধরে নেওয়া হয় যে, ক্ষমতা পরিবর্তনের দুটি পথ, নির্বাচন আর অভ্যুত্থান। এক্ষেত্রে সংঘাতের আশঙ্কা এড়িয়ে ক্ষমতার পালাবদল করার জন্য নির্বাচনকেই অনেকেই গ্রহণযোগ্য পথ মনে করেন। কিন্তু এর ফলে তো ব্যবস্থা বদলায় না, শুধু ক্ষমতার পালাবদল হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটাও আর স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে না। ফলে গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা আর বর্তমানের মারমুখী পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট যে, নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার আনা অপরিহার্য।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার দূরের বাদ্যের ক্ষীণ শব্দ মনে হতে পারে। কারণ এটা নিয়ে বামপন্থিরা ছাড়া আর কেউ ভাবছে না। ইতিমধ্যে ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। আর ক্ষমতাসীনরা বলেছে, পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তারা প্রস্তুত। তাহলে কী হবে ২৮ অক্টোবরের দিন এবং তারপর? এই মহাসমাবেশ থেকে আন্দোলনের মহাযাত্রার যে ঘোষণা আছে তা মোকাবিলা করা হবে কেমন করে? বিরোধীদের মহাসমাবেশ দমনে অতীত ভুলে যাওয়ার কথা নয় কারও। বাস, ট্রেন, লঞ্চ বন্ধ করে দেওয়া, ব্যাপক ধরপাকড় করা আর পুরনো মামলা পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠার পুনরাবৃত্তি ঘটবে নিশ্চয়ই। সঙ্গে সঙ্গে অতীতের সেই ঘটনাও তো মনে পড়ে যায়। ২০০৬ সালে ২৮ অক্টোবর বঙ্গভবনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার শপথ নেওয়ার কথা ছিল। ২৭ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদের বিলুপ্তি ঘটে। তখনকার বিরোধী দল ঘোষণা দিয়েছিল, যদি অগ্রহণযোগ্য প্রধান উপদেষ্টা দায়িত্ব নেয় তাহলে সারাদেশ থেকে তাদের কর্মীরা যেন ঢাকায় চলে আসে। এরপরের ঘটনাবলি সবার জানা। ফলে অজানা আতঙ্ক কি ছায়া ফেলছে আবার?
এসব উত্তেজনার মধ্যেই জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার লক্ষ্যে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তারা চাইছেন, নভেম্বরের মাঝামাঝি ভোটের তফসিল ঘোষণা করবেন। কিন্তু ভোটের পরিবেশসহ নির্বাচন সম্পর্কে আস্থা তৈরির ক্ষেত্রে খুব যে অগ্রগতি নেই, তা বোঝা যায় নির্বাচন কমিশনের আগাম নিরাপত্তার প্রার্থনা দেখে। তারা নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা চাইছেন, নির্বাচনের পরেও যেন পনেরো দিন পুলিশি নিরাপত্তা থাকে সে কথাও ভাবছেন। সব ভাবনাই এখন ক্ষমতাকেন্দ্রিক নির্বাচন নিয়ে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ আর গণমানুষের কী হবে সে ভাবনা যেন আড়ালেই চলে গেছে। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে যে জনগণের দিনবদল হয় না, তা কি বুঝতে আরও সময় লাগবে?
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট