ডেস্ক রিপোর্ট
১৩ জুন ২০২৩, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ
আবু নাসের অনীক:
এই মুহুর্তে টক অব দ্যা কান্ট্রি দীর্ঘ ১০ বছর পর জামায়াতে ইসলামের কর্মসূচি পালন। নানা ধরনের আলোচনা বিভিন্ন পর্যায়ে। সরকারী দলের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন,‘যারা রক্তে রক্তে বাংলাদেশকে রক্তের দরিয়া বানাতে চায়, সেই অপশক্তি জামায়াত মাঠে নেমেছে। জামায়াতকে মাঠে নামিয়েছে তাদের বিশ্বস্ত ঠিকানা, তাদের আসল মুরব্বি বিএনপি।’
তার ভাষ্য অনুসারে, বিএনপি ইন্ধন দিলো আর তারা নেমে পড়লো, ইন্ধনের প্রতিক্রিয়ায় পুলিশ প্রশাসনও তাদের অনুমতি দিয়ে দিলো। কী চমৎকার বয়ান! যেখানে বিএনপি নিজেই কোথাও দাঁড়াতে পারছেনা।
জামায়াত যেখানে সমাবেশ করেছে সেই জায়গায় প্রায় ১ মাস পূর্ব থেকে বিরোধী দল (জাতীয় পার্টি) একটি অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল ১০ জুন তারিখ নির্ধারণ করে, পুলিশ প্রশাসন এক দিনের নোটিশে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে জামায়াতকে জায়গা করে দিয়েছে সমাবেশ করার জন্য। মাথায় গোবর ভরা জনগণ মনে রাখবেন (সরকারী দলের সাধারণ সম্পদক এমনটাই মনে করেন) এই সবকিছুই ঘটছে কিন্তু বিএনপি’র ইন্ধনে!!!
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকদের একজন আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন,‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে’ জামায়াতে ইসলামীকে ঢাকায় সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তারা (জামায়াত) রাজনৈতিক দল, হাই কোর্টের রায় ছিল সংবিধানের সঙ্গে তাদের গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক, গ্রনহণযোগ্য না। এই প্রেক্ষিতেও তাদের তো অনেক জনগণের সমর্থন আছে। এই পরিস্থিতির আলোকে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। আপনারা একটু অপেক্ষা করেন, আরও দেখবেন কী হয়?” আমরা বোকা জনগণ ইতিমধ্যে বুঝতে পারছি আরো কী কী হতে যাচ্ছে।
রাজ্জাক সাহেবের বক্তব্যের সাথে সুর মিলিয়ে মাননীয় তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘জামায়াত এখনও যেহেতু নিষিদ্ধ হয় নাই, রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা আবেদন করেছে, সেজন্য তাদেরকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’ কী চমৎকার পলাপলি খেলার আয়োজন!
নিশ্চয়ই এটি একটি গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ। কিন্তু এই পদক্ষেপ নিয়েছেন ১০ বছর পর হঠাত করে। এবং আপনার দলের সাধারণ সম্পাদক যাদের ইঙ্গিতে (বিএনপি) জামায়াত এর মাঠে নামার কথা বলেছেন, আপনারা এখনও তাদের প্রতি গণতান্ত্রিক আচারণ প্রদর্শন করতে পারলেন না! রাজনীতিতে কোন কিছুই হঠাৎ করে হয় না।
কিছুদিন আগে জামায়াতের কয়েক নেতাকে পুলিশ ধরে আবার ছেড়ে দিয়েছে। পুলিশের সন্দেহ ছিল, জামায়াতের ওই নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলেন। পরে সরকার জানতে পারে, ষড়যন্ত্র নয়, পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমাবেশের বিষয়ে কথা বলতে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে তাঁরা এক জায়গায় বসছিলেন। ইতিমধ্যেই জামায়াতের নেতারা ভিন্ন নামে নিবন্ধনের জন্য ইসিতে আবেদন করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, তাঁরা নিবন্ধন পেয়েও যাবেন।
আপনাদেরকে একটু অতীতে নিয়ে যেতে চাই। এরশাদের আমলে ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ ও জামায়াত অংশ নিয়েছিল পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে। ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জন্য জামায়াতের সমর্থন লাভের আশায় গোলাম আজমের সাথে সাক্ষাত করে। সমর্থন আদায় এবং জামায়াতকে তাদের পক্ষে আনার জন্য আওয়ামী লীগ প্রচেষ্টা চালায়।
১৯৯৫-৯৬ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন করেছিল, জামায়াত ছিলো সেই আন্দোলনের যুগপৎ অংশীদার। অর্থাৎ অতীত আমাদেরকে এটা স্পষ্টভাবেই বলে দেয় জামায়াত এর সাথে আওয়ামীলীগের বিভিন্ন সময়েই সখ্যতা গড়ে উঠেছে; এটা নতুন কিছু না।
অনেকেই ইতিমধ্যেই এই আলাপ তুলেছেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার যুদ্ধাপরাধীর বিচার করেছে। জামায়াত এর শীর্ষ অনেক নেতার ফাঁসি হয়েছে এই সরকারের আমলে। নিশ্চয়ই সেটি ঘটেছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তাদের সাথে জামায়েতের সকল ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে।
তারা কয়েকজন ব্যক্তির বিচার করার করেছে। এর মাধ্যমে দুইটি রাজনৈতিক বিজয় অর্জন তাদের হয়েছে। প্রথমত, জামায়াতকে সাংগাঠনিকভাবে কোনঠাসা করতে পেরেছে, যাতে তাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনে একটি পর্যায়ে বিএনপি থেকে বিছিন্ন করে দেওয়া যায়। দ্বিতীয়তো, তরুণ প্রজন্মের কাছে তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছিলো যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা সেটি তারা সফল হয়েছে।
তাদের কোন ভাবেই এটি উদ্দেশ্য ছিলোনা যে, জামায়াতকে তথা সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী রাজনীতির চর্চা বন্ধ করা। যে কারণে দলটি নিষিদ্ধ করতে আইন সংশোধনের প্রস্তাবটি আট বছর ধরে আইন মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। অপর দিকে নিবন্ধন বাতিলের আপিল শুনানিও নয় বছরে হয়নি! রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকলে তারা এই সময়ের মধ্যেই সেটি করতে পারতো অনায়াসেই। বাস্তবতা হচ্ছে, করেনি।
বাংলাদেশের নির্বাচনকালীন প্রেক্ষাপটে লক্ষ্য করুন,ধর্মভিত্তিক দলগুলিকে এখানকার লুটেরা শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দলগুলি (আওয়ামীলীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি) তাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে। সেই চেষ্টার ধারাবাহিকতাতে যখন যে ক্ষমতায় থাকে নানা ধরনের কৌশল ব্যবহার করে।
হেফাজত একটি সময় পর্যন্ত বিএনপি সমর্থিত এবং সরকারী দলের বিপক্ষে হলেও ক্ষমতাসীন সরকার তাদেরকে এখন বগল দাবা করেছে। তার জন্য কখনও বল প্রয়োগ করেছে কখনও তাদের দাবী মেনে নিয়ে ‘কওমী মাতা’ উপাধী অর্জন করেছে। জামায়াত এর ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে।
অর্থাৎ আওয়ামীলীগের সাথে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী অপশক্তির দর্শনগত বিরোধ নেই। যেমন নেই শাসকগোষ্ঠীর অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির। কারণ শ্রেণি চরিত্রের জায়গা থেকে এরা অভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। মূলগতভাবে এরা লুটেরা বুর্জোয়া। এই শ্রেণির রাজনৈতিক দলসমুহের নীতি-নৈতিকার কোন অস্তিত্ব থাকেনা।
ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাট-গুন্ডাতন্ত্র এদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তারজন্য যেকোন প্রকারে ক্ষমতায় যাওয়া ও টিকে থাকার লক্ষ্যে সকল ধরনের অপশক্তির সাথে আপোস করতে এরা দ্বিধা করেনা। বাংলাদেশের গত ৫৩ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস সেটারই সাক্ষ্য দেয়।
আওয়ামীলীগকে আমাদের বামপন্থীদের একটি অংশ সেকুলার রাজনৈতিক দল মনে করে। সেজন্য তারা সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী রাজনীতি মোকাবেলা করার জন্য নিজেদের হাত শক্তিশালী করার পরিবর্তে আওয়ামীলীগের হাতকে শক্তিশালী করাটাকেই তাদের প্রধান ব্রত মনে করে থাকে।
অথচ এই কাজটি করতে যেয়ে তারা একটি ফ্যাসিষ্ট শাসন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করছেন। যা এখানে জনগণের সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক সংগ্রাম গড়ে তুলতে চরমভাবে বাধাগ্রস্থ করছে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলেন,‘রাজনীতির মাঠে কথা আছে, আওয়ামী লীগ জামায়াতকে বিভিন্ন নামে কিছু সিট (আসন) দেবে। আমাদেরও কিছু সিট দেবে। আমাদের বলা হয়, আপনারা আরও সংগঠিত হোন, আরও বেশি সিট দেব।’ আমি আমার সেই সমস্ত বন্ধুদের কাছে জানতে চাই এই আপনাদের সেকুলার বন্ধু আওয়ামীলীগ! যে “ইসলাম”কে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে বহাল রেখে সেকুলারিজম চর্চা করছে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে জামাত, হেফাজত, ওলামালীগ, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন সকলকেই পকেটস্থ করার জোর প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার। লুটেরা ধনীক শ্রেণির এই রাজনৈতিক দলগুলি তাদের স্বার্থে দশকের পর দশক এই পরগাছাগুলোকে (সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদ) জীবিত রাখবে। কারণ এরা জীবিত না থাকলে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (সাজানো) বলে কিছু থাকবেনা যাদেরকে দমন করার কথা বলে তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করবে।
এ এক ভংয়ঙ্কর খেলা। কারণ এখানকার লুটেরা ধণীক শ্রেনীর রাজনৈতিকদল যে অপশক্তিকে ব্যবহার করে এই ক্ষমতা কাঠামো চর্চা করছে, তারা সুযোগ পেলেই উল্টা ছোবল মারবে। আজ অথবা কাল ফ্রাঙ্কেষ্টাইন হয়ে গিলে খাবে।
সাম্রাজ্যবাদ মানে শুধুই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ভ্রান্ত চিন্তা থেকে বের হয়ে আসুন। আমাদের এই দেশকে ঘিরে অপরাপর অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কথা বলুন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গালি দিলেই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী হওয়া যায় না।
যেসমস্ত বন্ধুরা (যারা নিজেদেরকে বামপন্থী মনে করেন) ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরে থাকা এই লুটেরা রাজনৈতিক দলসমুহকে শক্তিশালী করে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন, তাদেরকে বলবো এই ভ্রান্ত পথ পরিত্যাগ করুন।