ডেস্ক রিপোর্ট

১০ জুন ২০২৩, ১১:২৩ অপরাহ্ণ

বাসদ এবং ছাত্র ফ্রন্ট সম্পর্কে উত্থাপিত শোভন রহমানের বক্তব্য প্রসঙ্গে ছাত্র ফ্রন্টের বিবৃতি

আপডেট টাইম : জুন ১০, ২০২৩ ১১:২৩ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

অধিকার ডেস্ক: বিগত কিছুদিন যাবত সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এর সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক শোভন রহমান এর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে বির্তক শুরু হয়েছে। শোভন রহমান তাঁর দেওয়া পোস্টে বাসদের দুই নেতার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনেন। শোভন রহমানের পোস্ট পরবর্তী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সেই প্রেক্ষিতে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটি এক বিবৃতির মাধ্যমে সংগঠনের বক্তব্য তুলে ধরেছে। নিম্নে বিবৃতিটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

ছাত্র ফ্রন্টের বিবৃতি
গত ৭ জুন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এর সাধারণ সম্পাদক শোভন রহমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের দল বাসদ এর নাম জড়িয়ে একটি বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি ঢালাওভাবে কিছু কথা বলেন যা বিদ্বেষপ্রসূত এবং তার মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত পড়লে যে কোন মানুষ তার অসংলগ্নতা বুঝতে পারবেন। আমরা খেয়াল করেছি এই বক্তব্য শোভন রহমান ফেসবুকে পোষ্ট দেয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী নগ্নভাবে আমাদের দলের বিরুদ্ধে এক ধরণের অপপ্রচারে সামিল হয়েছেন। তাদের উৎসাহ এবং আক্রমণের ধারা দেখে মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক যেন তারা বাসদ নামক রাজনৈতিক দলটির উপর আক্রমণের সুযোগ পেলেই তারা ঝাপিয়ে পড়বেন। ৭ জুন শোভন রহমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই পোস্ট করার পর বিষয়টিকে নিয়ে আরও বেশি জল ঘোলা করা হয়। যারা এত তদন্ত, বিচারের কথা নানা দিক থেকে বলেন তার প্রত্যেকেই এমন একটা মব ট্রায়ালের অংশ হয়ে গেলেন। একবারের জন্যও সংগঠন বা দলের কারো সাথে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করলেন না। নানা সময় বিভিন্ন কারণে যারা দলের সাথে বিরোধ করে দলত্যাগ করেছেন তারা এটিকে হাতিয়ার বানিয়ে দল এবং নেতৃত্বের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালাতে থাকল। দলের নারী কর্মীদের ইনবক্সে নানা রকম মেসেজ পাঠিয়ে হেনস্থা করা শুরু করে। শোভন রহমানের সাথে আলাপ আলোচনার পরিবেশটা যেন অক্ষুন্ন থাকে সেই লক্ষ্যে আমরা নির্দিষ্ট ফোরামের বাইরে কোন রকম বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকি। কিন্তু ফেসবুকে বিভিন্নজন দল ও দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অর্কেষ্ট্রেটেড কুৎসা ও মানহানিকর বক্তব্য ক্রমাগত দিতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে শোভন রহমানের উত্থাপিত বক্তব্য সম্পর্কে আমরা সংগঠনের একটা প্রাথমিক বক্তব্য এখানে হাজির করলাম।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শোভন রহমান ৭টি পয়েন্ট সংবলিত একটা বক্তব্য আমাদের দলের কাছে হস্তান্তর করে। সেখানে আদর্শিক-সাংগঠনিক, কর্মপদ্ধতি ও কর্মকৌশলের সীমাবদ্ধতা, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, যৌন নিপীড়ন সম্পর্কিত তার কিছু দৃষ্টিভঙ্গী ও কিছু জিজ্ঞাসা ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়। তার চিঠির প্রথম ৫ টা পয়েন্টে নানা আদর্শিক-সাংগঠনিক বিষয়ে উল্লেখ করে শেষ দুইটি পয়েন্টে যৌন নিপীড়নের বিষয় বললেও ৭ তারিখে দেয়া তার ফেসবুক পোস্টে অন্যান্য বিষয়গুলো বেমালুম চেপে গিয়ে শুধু দল এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ এবং ইমরান হাবিব রুমনের বিরুদ্ধে কিছু প্রসঙ্গেই তিনি লিখলেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখলেন কমরেড ফিরোজের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে প্রায় ৯ মাস আগে, ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে। কার কাছে কী অভিযোগ কীভাবে করলেন তার কিছুই তিনি উল্লেখ করলেন না। আসলে কোন অভিযোগই করা হয়নি। ইডেন কলেজের এক কর্মী গত সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা নগরের কোন এক সাংগঠনিক মিটিং এ মতপার্থক্য হওয়ায় সভাস্থল ত্যাগ করেন। এবং ব্যক্তিগতভাবে আহত হয়ে নানা জনের কাছে সে তার বছর দেড়-দুই আগের কিছু প্রসঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের সাথে চালাচালি করতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতির দৃষ্টিগোচর হলে সে শোভনসহ দলের সাধারণ সম্পাদকের কাছে গিয়ে বিষয়গুলো তাকে জানান। কমরেড ফিরোজ ঐ কর্মীকে নিয়ে এসে ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি সাধারণ সম্পাদকের উপস্হিতিতে সামনা সামনি আলোচনা করার জন্য বলেন। কিন্তু বারবার চেষ্টা করলেও ঐ কর্মী দলের সাধারণ সম্পাদকের মুখোমুখি হতে অস্বীকৃতি জানায়। এর মধ্যে সে দলের অফিসেও আসলে তাকে সাধারণ সম্পাদকের সাথে কথা বলতে বলার পরেও সে রাজি হয়নি। বরং দলের সহকারি সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতনের সাথে দেখা করে সে বলে, ‘আমি কিছু কথা বললাম। আমার কোন অভিযোগ নেই, আমি কোন বিচার চাই না। আমি চাই দলের মধ্যে এমন পরিবেশ থাকুক যেখানে সবাই একত্রে মিলে কাজ করতে পারি’। এক্ষেত্রে তার আলোচনার ভরকেন্দ্র যতখানি ছিল তার চাইতেও কিছু মানুষের সংগঠনকে বিতর্কিত করবার অতি উৎসাহ আমাদের বিস্মিত করেছে। এরপরেও দল তার এই বক্তব্যকে বিবেচনায় নিয়ে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির ঢাকাস্থ সদস্যবৃন্দকে নিয়ে সভা আহ্বান করা হয় এই বিষয়ে আলোচনার জন্য।

ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস জুড়ে এরকম তিনটি মিটিং হয়। ছাত্র নেতৃবৃন্দের কারো রিহার্সেল, কারো পরীক্ষা ইত্যাদি কারণে দলের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বসতে চাইলেও সেটা সম্ভব হয় না। সেখানে সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ সভাপতি যাকে ইডেন এর ওই কর্মী সরাসরি বিষয়গুলো বলেছে সে তার পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করে। এবং সেখানে এই সকল বিষয় নিয়ে নানা দিক থেকে আলোচনা হয়। সেই সভা শেষে শোভন বলেন, কমরেড ফিরোজ এর বিষয়ে আনীত আলোচনার বিষয়ে সে সন্তুষ্ট হলেও তার অন্যান্য আরও কিছু বিষয় নিয়ে বক্তব্য আছে। যে বিষয়গুলো তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ইউনিটের কমরেডদের সাথেও আলোচনা করেছেন। যেটা আমরা পরে অবগত হই। উল্লেখিত নারী কর্মীর প্রতি তার একটা ব্যক্তিগত আবেগের সম্পর্ক অনুভব করছেন বলেও সে সেই সভায় সংগঠনকে অবহিত করেন। এরপর থেকেই অজানা কারণে সে সংগঠনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে। নানাভাবে চেষ্টা করেও তার সাথে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না।

গত ৪-৬ জুন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত হয়ে তার বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য তাকে বারবার বলা হয়। কিন্তু সে সভায় উপস্থিত থাকেনি। কেন্দ্রীয় কমিটির সভাতে দলের কাছে দেয়া ৭ পয়েন্টের ওই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উল্লিখিত নারী কর্মী যে বয়ান দিয়েছেন তাকে উপস্থাপন করে, ঘটনা পরম্পরা বিশ্লেষণ এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, যে আলোচনা বা অভিযোগগুলোর কথা বলা হচ্ছে তা সর্বৈব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একই সাথে পার্টির পক্ষ থেকে জানানো হয় ইমরান হাবিব রুমনের বিরুদ্ধে দলের নৈতিক অবস্থান বিরোধী কিছু বিষয় সামনে আসায় তার বিরুদ্ধে গৃহীত সাংগঠনিক পদক্ষেপসমূহ উল্লেখ করা হয়। তাকে দলের সমস্ত কার্যক্রম থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এখনো বিষয়টি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আলোচনাধীন আছে যা পরে দলের সদস্যদের অবহিত করা হবে বলেও জানানো হয়। একই সাথে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয় এই সভায়। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের কাজে অনুপস্থিতি ও তার কারণ হিসেবে কোনো জবাব না থাকার দরুণ সাধারণ সভা থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সুস্মিতা মরিয়মকে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়।
এর পরদিনই শোভন এই কুরুচিপূর্ণ পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমে পোস্ট করে। দলের সকল নেতা কর্মীকে সামাজিক মাধ্যমে ব্লক করে দিয়ে এই পোস্ট করা পলায়নবৃত্তি ছাড়া আর কিছুই নয় বলেই সংগঠন মনে করে। সংগঠন সারা দেশের সকল নেতা-কর্মী এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানায়, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এদেশের ছাত্র আন্দোলনের একটি অন্যতম লড়াকু সংগঠন। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের প্রতিটি ছাত্র আন্দোলনে সংগঠন নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা পালন করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটাতে সে সময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মানিকের বিরুদ্ধে প্রথম মিছিল করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট। এ কথা সর্বজনবিদীত। আন্দোলনের অপরাধে সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হয়। বুয়েটে সন্ত্রাস বিরোধী বুয়েট ছাত্র ঐক্যের আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্যাতন বিরোধী ছাত্র ঐক্যের আন্দোলন এসকল মাইলফলক আন্দোলনের অন্যতম মূল শক্তি ছিল সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট। দেশের প্রতিটি ক্যাম্পাসে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট একটি আপোসহীন লড়াকু শক্তির নাম। আজ যারা সংগঠনকে কালিমালিপ্ত করার অপপ্রয়াসে নেমেছেন, সংগঠনের লড়াকু নারী কর্মীদের চরিত্র হননে ব্যাপৃত হয়েছেন তারা কেবল নিজেদের মর্যাদাকেই ক্রমাগত নিম্নগামী করছেন। এর ভিন্ন কিছু করার সামর্থ্য তাদের নেই। আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে দল ও নেতৃত্ব বিরোধী মন্তব্য করছেন তাদেরকে এহেন ঘৃণ্য কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করছি।

শুভেচ্ছাসহ
মুক্তা বাড়ৈ
সভাপতি
সুস্মিতা মরিয়ম
সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)

শেয়ার করুন