ডেস্ক রিপোর্ট
১০ এপ্রিল ২০২৩, ১:৪৯ অপরাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক: নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো নিবন্ধের সব শর্ত মেনে চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত থেকে হঠাৎ সরে এসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর আগে ইসি জাতীয় নির্বাচনের আগে দলগুলোর নিবন্ধনের শর্ত পূরণের বিষয় খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ব্যাপারে ইসির সূত্রগুলো বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির আশঙ্কার কথা বলছে। ইসির সূত্র বলছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের শর্ত যাচাই করতে গেলে বিতর্ক তৈরি হতে পারে—মূলত এমন আশঙ্কা থেকেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত বছরের সেপ্টেম্বরে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। সেখানে ইসি নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত দলগুলোর শর্ত পূরণের বিষয় নিরীক্ষার কথা বলেছিল। তাদের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, নিবন্ধনের জন্য পাওয়া আবেদন বিবেচনা এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো নিবন্ধনের শর্ত যথাযথভাবে প্রতিপালন করছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
যদিও ইসি তাদের সিদ্ধান্ত আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিল, এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার বিষয়ে ইসি থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তবে দুজন নির্বাচন কমিশনার আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা অবশ্য এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ইসির অন্য একাধিক সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশনারদের কেউ কেউ রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের শর্ত পূরণের বিষয় খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পক্ষে থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এটি বাস্তবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে নিবন্ধিত দলগুলোর নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত থেকে ইসি সরে এলেও নতুন দল নিবন্ধনের কার্যক্রম চলবে।
জাতীয় নির্বাচন–সম্পর্কিত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে দেওয়া ক্ষমতাবলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধ দেয় ইসি। নিবন্ধিত দলগুলোই কেবল নিজেদের দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। এখন ইসিতে নিবন্ধিত দল ৩৯টি। এর বাইরে আদালতের নির্দেশে তৃণমূল বিএনপিকেও নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনটি শর্তের যেকোনো একটি পূরণ করলে কোনো দলকে নিবন্ধন দেওয়া হয়।
শর্তগুলো হলো:
১. বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অনুষ্ঠিত যেকোনো সংসদ নির্বাচনে দলীয় নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে কমপক্ষে একটি আসনে জয়ী হওয়ার রেকর্ড থাকতে হবে।
২. যেকোনো একটি আসনে দলীয় প্রার্থীকে মোট প্রদত্ত ভোটের ৫ শতাংশ ভোট পেতে হবে।
৩. কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একটি কেন্দ্রীয় কার্যালয়, অন্তত এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর জেলা কার্যালয়, অন্তত ১০০টি উপজেলায় কার্যালয় এবং প্রতিটিতে সদস্য হিসেবে অন্তত ২০০ জন ভোটারের তালিকাভুক্তি থাকতে হবে।
এসব শর্তের পাশাপাশি আইনে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব পর্যায়ে কমিটি নির্বাচন, দলের সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব অর্জন, ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনকে অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন হিসেবে রাখা এবং বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থিতার জন্য তৃণমূলের ভোটে প্যানেল প্রস্তুত করার কথা বলা আছে।
শর্ত মানার তাগিদ নেই
ইসির সূত্র জানায়, বড় দলগুলোর কোনোটাই এখন পর্যন্ত ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি। সব কটি দল সব শর্ত পালন করছে কি না, তা যাচাইয়ে একদিকে সময় প্রয়োজন, অন্যদিকে ভোটের আগে কারও নিবন্ধন বাতিল করতে গেলে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। এসব চিন্তা থেকে কমিশন শর্ত পালন করছে কি না, তা যাচাই করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন থেকে আপাতত সরে এসেছে।
এর আগে কে এম নূরুল হুদা কমিশন দলগুলো শর্ত পালন করছে কি না, তা যাচাই করেছিল। শর্ত মেনে না চলায় গত জাতীয় নির্বাচনের আগে ২০১৮ সালে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন এবং এরপর ২০২০ সালে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি (পিডিপি) ও ২০২১ সালে জাগপার নিবন্ধন বাতিল করেছিল। আর ২০১৩ সালে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন আদালত। আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইসি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের উদ্দেশ্য ছিল দলগুলোকে একটি নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে আনা। কিন্তু দলগুলো অনেক বিধানই মানছে না। ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনকে অঙ্গসংগঠন হিসেবে রাখা যাবে না, বিদেশে দলের কোনো শাখা করা যাবে না—এমন বিধান থাকলেও দলগুলো তা মানছে না। তৃণমূলের মতামত বিবেচনায় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া, নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করা—এসবও উপেক্ষিত। ইসির এসব দেখা উচিত।
বদিউল আলম মজুমদার প্রশ্ন করেন, দলগুলোর শর্ত মানার বিষয় যাচাই করার কর্মপরিকল্পনায় ঘোষণা করার পর কমিশন এখন পিছু হটছে, তাহলে তারা কর্মপরিকল্পনা দিয়েছিল কেন?