ডেস্ক রিপোর্ট

২৫ মার্চ ২০২৩, ৭:২৭ অপরাহ্ণ

আত্মহত্যা সামাজিক ব্যাধির চূড়ান্তরূপ

আপডেট টাইম : মার্চ ২৫, ২০২৩ ৭:২৭ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক::

“দু’হাতে ইচ্ছামৃত্যুর তাজা ফুল নিয়ে,/প্রতিশ্রুতির স্ট্যাম্প পেপারে আমার একটা জীবন/ লিখে দিব-মৃত্যুর নামে।/ তারপর মৃত্যুর অবিশ্বাস্য ভালোবাসায়/ আমি ভুলে যাবো সমস্ত জাগতিক অভিলাষ।” কবিতাংশটুকু একটি অল্প বয়সী মেয়ের,যে সুইসাইড করার পূর্বে এটি লিখেছিলো। আত্মহত্যা কি শুধুই ব্যক্তিকেন্দ্রীক মানসিক সমস্যা? না-কি এর প্রধান কারণ সামাজিক ব্যাধি? যার জন্য প্রধানত দায়ী রাজনীতি আর অর্থনীতি।

বিবিএস এর সর্বশেষ জরিপ অনুসারে, ২০২০ সালে সারাদেশে মোট ১৩ হাজার ৮১৪ জন আত্মহত্যা করেছেন। ২০১৯ সালে এই সংখ্যাটি ছিলো ১২ হাজার ৯৫৮। আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যনুসারে, ২০২১ সালে আত্মহত্যা করেন ১৪ হাজার ৪৩৬ জন। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২২ সালে সারাদেশে ৪৪৬ জন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রী, আর বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষার্থী ৮৬ জন, মোট ৫৩২ জন শিক্ষার্থী সুইসাইড করেন।

আত্মহত্যার পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে, আমরা একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যনুসারে ২০২১ সালে হত্যাকান্ড ঘটেছে ৩ হাজার ৪৫৮ টি। অর্থাত খুণের চারগুণ বেশি আত্মহত্যা ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি এলার্মিং বিষয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আত্মহত্যা সংঘটনের ক্ষেত্রে দুইটি বিষয় সামনে আসে। একটি সাইকোলজিক্যাল অন্যটি সামাজিক কারণ। আমরা আলোচনা করবো, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঠিক কোন কারণে আত্মহত্যা ক্রমান্বয়ে ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বলা হয়, ৯০ শতাংশ আত্মহত্যাকারীর কোন না কোন মানসিক অসুস্থতা থাকে। এসবের মধ্যে রয়েছে সিচুয়েশনাল অথবা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার, ব্যক্তিত্বের ত্রুটি, মাদকাসক্তি, উদ্বেগজনিত রোগ। উল্লেখিত অধিকাংশ রোগগুলিতে আক্রান্ত হওয়ার জন্য সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক কারণ প্রভাবক হিসাবে ভূমিকা পালন করে।

আত্মহত্যা প্রকৃতঅর্থে কোন দেশের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের মনোসামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। আত্মহত্যা সংঘঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রীক দায় যতোটুকু তার চাইতে অনেকগুণ বেশি দায় সমাজ-রাষ্ট্রের।

আমাদের চারপাশে যখন কেউ আত্মহত্যা করে আমরা তার সম্পর্কে নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করি। স্বার্থপর, কাপুরুষ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন এই কয়েকটি নেতিবাচক শব্দ সবচেয়ে বেশি, এর সাথে আরো বিভিন্ন নেতিবাচক শব্দের প্রয়োগ ঘটায়। দার্শনিক ডেভিড হিউম তাঁর আত্মহত্যা বিষয়ক প্রবন্ধে বলেন,‘আমি বিশ্বাস করি কোন মানুষ কখনোই তার জীবনকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই জীবনটা তার কাছে মূল্যবান থাকে’।

আমরা আসলে দুর থেকে কখনওই কোন ব্যক্তি সে তার নিজের জীবন কেন কেড়ে নেয়, তা আমরা জানতে পারিনা। আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়না একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিচার বিবেচনা এবং যুক্তি ঠিক ওই সময় অর্থাত আত্মহত্যার আগের মুহুর্তে কী থাকে। আমরা না বুঝেই তাদের সম্পর্কে ঢালাও নেতিবাচক মন্তব্য করি।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী David Emile Durkheim তাঁর বই Suicide: A study In Sociology তে বলেন,‘ Suicide is not a personal act. It is caused by a power beyond the individual or the super individual. We know the consequence of all kind of deaths, either directly or indirectly, resulting from the victim’s own positive or negative behavior. The power to drive suicide is social rather than psychological. Suicide results from social turmoil or lack of social integration or social solidarity.’

ডুর্খেইম তাঁর লেখায় চার ধরনের আত্মহত্যার কথা বলেছেন। প্রথমটি ‘ইগোয়িস্টিক’ সুইসাইড। এধরনের আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে বলেন, সমাজে অন্তর্ভূক্ত হতে না পারার ব্যর্থতা থেকে বিচ্ছিন্নতাবোধ তাকে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়। বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় বিচ্ছিনতাবোধ প্রবল আকার ধারন করেছে সমগ্র বিশ্বব্যাপি।

দ্বিতীয় ধরন বলেছেন ‘অল্ট্রয়িস্টিক’ সুইসাইড। এটি একটি সমন্বিত সমাজে ঘটে থাকে। যেখানে ব্যক্তির চাহিদা সামগ্রিকভাবে সমাজের চাহিদার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

ডুর্খেইম তৃতীয় ধরনের আত্মহত্যাকে অভিহিত করেছেন ‘অ্যানোমি’ সুইসাইড বলে। ব্যক্তি যখন সমাজের সার্বিক অস্থিরতার সাথে তাল মেলাতে পারে না তখন সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। মূলত সমাজে যখন বিভিন্ন কারণে ভারসাম্য নষ্ট হয় তখনই এ ধরনের আত্মহত্যার হার বাড়তে থাকে।

সর্বশেষ বলেছেন ‘ফেটালিস্টিক’ সুইসাইড। যখন ব্যক্তিকে অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তার ভবিষ্যৎ ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত হয় এবং দমনমূলক শৃঙ্খলা সমস্ত ধরনের আবেগকে জোর করে অবদমন করে, তাকে বলতে বাঁধা দেওয়া হয় তখন এ ধরনের আত্মহত্যা ঘটে। যা একটি নিপীড়ক সমাজ ব্যবস্থায় ঘটে যেখানে এর বাসিন্দারা বাঁচার চেয়ে মরতে চায় বেশি।

এই ছিলো ডুর্খেইম উল্লেখিত চার ধরনের আত্মহত্যা। প্রথমে সর্বশেষটির ধরনের সাথে আমাদের দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যদি মিলিয়ে দেখি, তাহলে দেখবো তাঁর এই তত্ত্ব এখানে শতভাগ ক্রিয়াশীল।

আমরা এমন এক রাষ্ট্রে-সমাজে বাস করছি যেখানে রাষ্ট্র অতিমাত্রায় ব্যক্তির স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ আইন দ্বারা দমন করা হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি, চিন্তা অবদমিত হচ্ছে। সমাজটি এককথায় হয়ে উঠেছে নিপীড়নমূলক। সেই সমাজে আত্মহত্যা বৃদ্ধি পাবে সেটাই স্বাভাবিক। এই সকল ধরনের আত্মহত্যার জন্য সামাজিক দায়টিই প্রধান।

আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া আত্মহত্যাগুলির সাথে প্রথম বা তৃতীয় ধরনেরও যথেষ্ঠ সাদৃশ্য দৃশ্যমান। সমাজে চরম অস্থিরতা বিরাজমান। বাংলাদেশ সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে লুটেরা ধনীক শ্রেণির শাসকগোষ্ঠী কখনো সামরিক কখনো বেসামরিক স্বৈরতান্ত্রিক-ফ্যসিবাদী শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে গত ৫২ বছর ধরে। ফলে সমাজের অভ্যন্তরে সীমাহীন বৈষম্য, বিচ্ছিন্নতাবোধ, আত্মকেন্দ্রীকতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, অসহিষ্ণুতা, নিরাপত্তাহীনতা, অমানবিকতা, শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন, বাকস্বাধীনতা না থাকা, ভয়ের সংস্কৃতি সবকিছু মিলিয়ে এ ভয়াবহ অস্থিরতা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ি, মাথাপিছু আয় আর ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে গেছে। অন্যদিকে আত্মহত্যার প্রবণতা শুধু বাড়ছেই না, যা ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ভেতর থেকে যে ধসে যাচ্ছে ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার ঘটনার মধ্যে দিয়ে সেটির উপসর্গগুলিই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ডুর্খেইম বলেছেন, ‘Serious fault in social structure lead to and increase in the suicide rates’. অর্থাৎ সমাজ কাঠামোতে যখন ত্রুটি দেখা দেয় তখনই আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়তে থাকে। বাংলাদেশে বর্তমানে আত্মহত্যার মনস্তাত্ত্বিক উপাদানের চাইতে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক উপাদানকে অধিকমাত্রায় গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসে গেছে।

আমাদের লুটেরা শাসকগোষ্ঠীর এ বিষয়ে কোন নজর নেই। না থাকাটাই অবশ্য স্বাভাবিক। উন্নয়নের নামে অবাধ লুটপাট আর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে তারা আমাদেরকে এমন এক সমাজ ব্যবস্থা উপহার দিয়েছে যেখানে সেচের পানি না পেয়ে কৃষককে আত্মহত্যা করতে হয়।

মানসিক সুস্থতা রক্ষার জন্য ব্যক্তি প্রচেষ্টা রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তারচেয়েও আরো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সম্মিলিত প্রচেষ্টা গ্রহণ। রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে সমাজের অভ্যন্তরের অস্থিরতা কমিয়ে আনা। সমাজ অসুস্থ থাকবে আর সেই সমাজের মানুষ মানসিকভাবে সুস্থ্য থাকবে এটা ভাবা হাস্যকর একটি বিষয়!

রোগাক্রান্ত হওয়ার উৎসমূল খুঁজতে হবে। রোগ সারাবার পাশাপাশি যদি কারণ অনুসন্ধান করা না হয় তবে সেই রোগের প্রার্দুভাব ঘটে। বাংলাদেশে আত্মহত্যা এখন সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে। অধিকাংশই ইঁদুর দৌঁড় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই প্রতিযোগিতা, সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য আমাদের মধ্যে হতাশা, বিচ্ছিন্নতাবোধ আর বিষণ্নতার অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখছে। যা আমাদের সৃজনশীলতা, স্বাভাবিক জীবনবোধকে নষ্ট করে দিচ্ছে। সমাজের অভ্যন্তরে লড়াই করার শেষ শক্তিটুকু ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় আত্মহত্যাকে এখন কাঠামোগত হত্যাকান্ড হিসাবে বিবেচনা করার প্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে। ‘আত্মহত্যা’ নামক এই কাঠামোগত হত্যাকান্ড বন্ধ করার জন্য সর্বাগ্রে চাই একটি সুস্থ সমাজব্যবস্থা।

সুস্থ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, যেটি বাংলাদেশে অনুপস্থিত। এই মুহুর্তের আশু করণীয় সুস্থ সমাজ কাঠামো বিনির্মানের জন্য একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করা যার যার অবস্থান থেকে।

লেখক: উন্নয়ন কর্মী

শেয়ার করুন